প্রতিবেদন

রাজধানীকে ঘিরে চার নদীকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদী নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা এবার আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। ওই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে নদী দখলকারীদের উচ্ছেদ অভিযানের সময় এবার রেহাই পাননি প্রভাবশালীরাও। স্থানীয় অবৈধ দখলদারদের কোনো অজুহাতই আমলে নেয়া হয়নি। সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনও মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্ছেদের পর শুরু হবে চার নদী ঘিরে সরকারের মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন। তারই প্রাথমিক পদপে হিসেবে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এরপরই দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করা হবে।
সরকারের মহাপরিকল্পনায় গত ২৯ জানুয়ারি থেকে নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে চলছে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে দুই দফা অভিযান চালানো হয়েছে। এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে তৃতীয় দফায় অভিযান। বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, দুই দফায় নদীতীর দখল করে গড়ে তোলা প্রায় ৩ হাজার স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে যেমন রয়েছে বহুতল ভবন, তেমনি পাকা আধাপাকাসহ নানাভাবে নদী দখল করে রাখা স্থাপনা।
এই অভিযানকালেও প্রভাবশালীরা তাদের দখল বজায় রাখতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। কখনও জমির দলিল নিয়ে হাজির হয়ে দাবি করা হয়েছে এটা তাদের নিজস্ব জমি। আবার কখনও আদালতের নিষেধাজ্ঞার অজুহাত দেয়া হয়েছে। আবার কেউ অভিযোগ করেছে তাদের নোটিশ না দিয়েই উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন তাদের মাথাগোঁজার কোনো ঠাঁই পর্যন্ত নেই।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু নদী দখল করে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল সেগুলোই কেবল উচ্ছেদ করা হয়েছে। এক পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযানে সাধারণ মানুষ সহায়তা করেছে। অনেক এলাকায় আবার অবৈধ দখলদার দখল ছেড়ে নিজেরাই চলে গেছে।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্ছেদ অভিযানের আগেই এসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নোটিশ দেয়া হয়েছিল। ব্যক্তি উদ্যোগে সরে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু বারবার নোটিশ দেয়ার পরও অনেকেই দখল ছেড়ে দেয়নি। এখন উচ্ছেদের সময় তারা নানাভাবে প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। বলছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কেউ বলছে, আগে থেকে নোটিশ দেয়নি।
এভাবেই এক শ্রেণির দখলদার বছরের পর বছর নদীর দখল উচ্ছেদে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু এবার তারা কোনোভাবেই পার পায়নি; বরং এবার উচ্ছেদের পর নতুন করে কেউ নদী দখল করতে সাহস পায়নি। এমনকি ভবন ভেঙে দেয়ার পর সেগুলো নিজ উদ্যোগে অনেকেই সরিয়ে নিচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের নদী ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দূষণ বন্ধ ও নাব্য ফিরিয়ে এনে নদী রায় টাস্কফোর্স গঠন করে দেন। তারই ধারাবাহিকতায় এ উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে। এখন চার নদী ঘিরে সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই এই উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। এ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপরে (বিআইডব্লিউটিএ) তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি গত জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ জানায়, দখলদার উচ্ছেদের পর ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতল্যা নদীর সীমানা চিহ্নিত করে ১০ হাজার পিলার স্থাপন করা হবে। এর আগে ২০১১ সালে চার নদীতে সীমানা নির্ধারণের জন্য ৯ হাজার ৫৭৭ পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ পিলার নিয়ে আপত্তি ওঠায় এই পিলার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়াও নৌদুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ফতুল্লা থেকে শুরু করে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত ব্যাপক উন্নয়নকাজ হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপ।
ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত ও নদীর পাড়ের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নদীর দুই তীরে ৫২ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে থাকছে ৩টি ইকোপার্ক, সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে, আরসিসি ওয়াল, স্টেপিং, পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের সৌন্দর্যবর্ধন কর্মযজ্ঞ। প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতল্যা ও বালুনদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প।
বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে দুদফায় অভিযানে কামরাঙ্গীরচর, ছাতামসজিদ, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল, কিল্লার মোড়, শ্মশানঘাট এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। নদীর জায়গা দখল করে পুনরায় গড়ে তোলা টিনের ঘর, আধাপাকা, পাকা বহুতল ভবন, বিভিন্ন স মিল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা স্বদেশ খবরকে জানান, উচ্ছেদ অভিযানের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরই দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীকেন্দ্রিক সরকারি মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং এক্ষেত্রে কোনোরূপ আপস করা হবে না।