প্রতিবেদন

রাজধানীর সুপারশপগুলোতে ভেজাল পণ্য বিক্রিতে উদ্বিগ্ন ক্রেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর সুপারশপগুলোয় ভেজাল পণ্য বিক্রি হয় Ñ এমন অভিযোগ বেশ পুরনো। এর আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেজাল পণ্য বিক্রির দায়ে এমন অনেক সুপারশপকে জরিমানা করেছে, যাদের প্রধান ক্রেতা উচ্চবিত্তরা। বাজার ঘুরে ঘুরে যাচাই-বাছাই ও দামাদামি করে পণ্য কেনার সময় যাদের নেই, এ ধরনের কর্মব্যস্ত ভিআইপি টাইপের লোকেরাই সব পণ্য এক জায়গা থেকে কেনার জন্য সুপারশপে ছুটে যান।
বাহ্যিক চাকচিক্য, সুপরিসর স্পেস, এসি ব্যবস্থা, মোড়কজাত পণ্য বিক্রি, পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকা ইত্যাদি কারণে রাজধানীতে সুপারশপের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর ক্রেতাও। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে কিছু অসৎ সুপারশপ মালিক। তারা খাওয়ার অনুপযোগী পণ্যও ভোক্তার হাতে তুলে দিচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ক্রেতারা।
সম্প্রতি আমদানি করা ২ হাজার কেজির বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ গরু, মহিষ, মুরগি ও দুম্বার মাংস জব্দ করা হয়েছে। এসব মাংস বিভিন্ন সুপারশপ ও হোটেলে বিক্রি হতো বলে প্রমাণ মিলেছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস সংরণের দায়ে অভিযুক্ত দেশি সুপার অ্যাগ্রো লিমিটেডের একটি চালানপত্রে দেখা গেছে, তাদের আমদানিকৃত মাংসের নিয়মিত ক্রেতা ডেইলি শপিং, মীনা বাজার, দেশি সুপারশপের মতো আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এ তালিকায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও মাংসের দোকানও রয়েছে।
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্র“য়ারি রাজধানীতে র‌্যাব ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস সংরণের দায়ে ১১টি হিমাগার ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয় এবং ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো শিকাজু ইঞ্জিনিয়ারিং, প্যারামাউন্ট কোল্ড স্টোরেজ, দেশি সুপার অ্যাগ্রো লিমিটেড, ফার্মা অ্যান্ড ফার্মা, মীম এন্টারপ্রাইজ, সেন্টমার্টিন ফিশারিজ লিমিটেড, প্যারামাউন্ট কোল্ড স্টোরেজ, সেফ অ্যান্ড ফ্রেশ ফুড লিমিটেড, সেভি ফুড লিমিটেড, ফুড চেইন এশিয়া লিমিটেড ও মামুন ইন্টারন্যাশনাল।
হিমাগারগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিজেরাও আমদানিকারক। তারা সুপারশপ, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ মোট ২৬৮টি প্রতিষ্ঠানে মাংস সরবরাহ করে।
ক্রেতা হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রামপুরার আল্লাহর দান হোটেল, আবুল হোটেল ক্যাফে, জুরাইনের আল্লাহর দান গোশত বিতান, ৭১ হোটেল, আল নূর রেস্টুরেন্ট, বিরিয়ানি বাড়ির কয়েকটি আউটলেট, বনানীর আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে ৫২, সৌদিয়া হোটেল, লন্ডন পার্ক রেস্টুরেন্ট, কেন্দ্রীয় পুলিশ হসপিটাল ক্যান্টিন, কাপ্তান বাজারের শাহ চন্দ্রপুরী হোটেল, প্রিন্স হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, প্রিয়জন-২, পীর ইয়ামেনি রেস্টুরেন্ট, উত্তরার জোনাকি রেস্টুরেন্ট ও নিউ মার্কেটের ফুড কর্নার।
দেশি সুপার অ্যাগ্রোর বিক্রির চালানপত্র থেকে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসজুড়ে এবং ফেব্র“য়ারির ২৩ তারিখে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে মাংস কিনেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির জব্দ করা মাংসের মধ্যে পাওয়া গেছে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়া গরুর মাংস, ২০১৫ সালের জানুয়ারি এবং ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিলে মেয়াদ শেষ হওয়া মুরগির মাংস, গত বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়া দুম্বার মাংস। এ ছাড়া গত বছর মেয়াদ শেষ হওয়া খেজুর, ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া কিশমিশ, গত ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়া চকোলেট ও চকোলেট মিল্কও পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান ইথিওপিয়া থেকে দুম্বার মাংস, ভারত থেকে মহিষের মাংস, ইরাক থেকে খেজুর, অস্ট্রেলিয়া থেকে ভেড়ার মাংস, ব্রাজিল থেকে মুরগির মাংস এবং ভিয়েতনাম থেকে মাছ আমদানি করে।
দেশি সুপার অ্যাগ্রোর চালানপত্রে স্পষ্ট করে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই দাবি করেছে, তারা কখনো এসব মাংস কেনেনি। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটির ২১ ফেব্র“য়ারির একটি চালানপত্রে দেখা গেছে, কাঁঠালবাগানে অবস্থিত ডেইলি শপিং সুপারশপ তাদের কাছ থেকে ৬২০ টাকা কেজি দরে ৩ কেজি দুম্বার মাংস কিনেছে। অথচ সুপারশপটির এই শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিব হাসান বলেন, আমরা কখনো দুম্বার মাংস বিক্রি করিনি। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কিনিওনি।
তবে মীনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহীন খান দুম্বার মাংস বিক্রির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের (দেশি সুপার অ্যাগ্রো) কাছ থেকে আমরা প্রতারিত হয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব। কারণ এতে আমাদের সুনাম ুণœ হয়েছে। ইতোমধ্যে মীনা বাজারের ফেসবুক পেইজে এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত ৪টি অভিযানে আমদানি করা মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য জব্দ করা হয়। অভিযানে অংশ নেয়া প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ডা. মো. এমদাদুল হক বলেন, কম দামের মহিষের মাংস গরুর কালাভুনা ও বিরিয়ানিতে নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে। মাংস আমদানির অনুমোদন নেই। বিশেষ েেত্র কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বা মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ যে মাংস জব্দ করা হয়েছে সেগুলো অবৈধভাবে আমদানি করা।
ইথিওপিয়া থেকে অবৈধভাবে আনা দুম্বার মাংসের মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও ৫ মাস আগে। ভারত থেকে আনা মহিষের মাংসেরও মেয়াদ শেষ ৫ মাস আগে। তারপরও গ্রাহকের হাতে তুলে দেয়া হতো খাওয়ার অনুপযোগী এসব মাংস। চেইনশপ স্বপ্ন, মীনাবাজার ও ডেইলি শপিংসহ নানা সুপারশপ এসব মাংস নির্দ্বিধায় তুলে দিত গ্রাহকের হাতে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, এটি জঘণ্যতম অপরাধ। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে নজরদারি। ভোক্তা হিসেবে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।