প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

রাজশাহী সেনানিবাসে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সদাজাগ্রত থাকার আহ্বান

মো. শহীদ উল্যাহ
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গত ৩ মার্চ রাজশাহী সেনানিবাসে ৭, ৮, ৯ ও ১০ বীর-এর ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৭, ৮, ৯ ও ১০ বীরের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করেন।
এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সেনাসদস্যদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সদাজাগ্রত থাকার আহ্বান জানান।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী সেনানিবাসের প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং রাজশাহী সেনানিবাসের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার এবং বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। প্রধানমন্ত্রী একটি খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন। এ সময় সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান, সাবেক সেনাপ্রধান, বিদেশি কূটনীতিক এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সেনাসদস্যদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রায় সেনাবাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং বিভিন্ন বৈদেশিক মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আত্মত্যাগ, কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে দেশের জন্য বয়ে আনছেন সম্মান ও মর্যাদা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আধুনিক ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধপরিকর। এজন্য ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন পদাতিক ডিভিশন, ব্রিগেড, ইউনিট ও প্রশিণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা সেনাবাহিনীতে ৩টি নতুন ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, পতাকার মান রা করা সকল সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব। পতাকা হলো জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। জাতীয় পতাকা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যেকোনো ইউনিটের জন্য একটি বিরল সম্মান ও গৌরবের বিষয়। আজ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় পতাকা আপনাদের হাতে তুলে দেয়া হলো।
এ সম্মান ও গৌরব অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী ৭, ৮, ৯ ও ১০ বীরদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, কর্মদতা, কঠোর অনুশীলন ও কর্তব্যনিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে যে পতাকা আজ আপনারা পেলেন, তার মর্যাদা রার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আপনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্যারাকমান্ডো ব্রিগেড গঠন করা হয়েছে। দেশের আকাশ প্রতিরাকে আরও সুসংহত করতে সংযোজিত হয়েছে এমএলআরএস এবং মিসাইল রেজিমেন্ট। আধুনিক বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, হেলিকপ্টার, আর্টিলারি গান এবং মডার্ন ইনফ্যান্ট্রি গেজেট সংযোজন করে সেনাবাহিনীর আভিযানিক সমতাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের চিকিৎসাসেবা ও আবাসনসহ কল্যাণমূলক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা উন্নত ও বৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনা সদস্যদের রেশন স্কেল বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেনাবাহিনীর জেসিও পদকে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণি এবং সার্জেন্ট পদকে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়াও কল্যাণমুখী কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহিলা পাইলট সংযোজন একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ শন্তিরা মিশনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী অফিসার, প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন। আমরা নারীর মতায়নে উল্লেখযোগ্য পদপে গ্রহণ করেছি। সেনাবাহিনীতে ২০১০ সালে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের একজন নারী কর্মকর্তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের নারী কর্মকর্তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি ও ইউনিট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সম্পদ, দেশের মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক। তাই পেশাদারিত্বের কাক্সিক্ষত মান অর্জনের জন্য আপনাদের সকলকে দ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ এবং মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এজন্য তিনি তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, চতুর্থবারের মতো এবং একটানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করার সুযোগ পাওয়ায় দেশবাসীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার নির্দেশে ১৯৭২ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি। তার সুদূরপ্রসারী প্রতিরা নির্দেশনার আলোকেই সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশ ও দেশের বাইরে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদাতিক বাহিনীর গতিশীলতা বৃদ্ধির ল্েযই দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাশাপাশি পদাতিক বাহিনীর দ্বিতীয় রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আমরাই প্রথম উপলব্ধি করেছি। ১৯৯৯ সালে আমি বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট গঠনের ব্যাপারে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করি। ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের পতাকা উত্তোলন করি। ২০১১ সালে আমি এ রেজিমেন্টকে মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পতাকা প্রদান করি।
এই রেজিমেন্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত একমাত্র রেজিমেন্ট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এ রেজিমেন্টে দুটি প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়নসহ ৪৩টি ইউনিট রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনী তার মূল কার্যক্রমের পাশাপাশি সবসময় জাতির গঠনমূলক কর্মকা-ে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। দীর্ঘ প্রত্যাশিত পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ তদারকি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রকল্প, ফেনী জেলার মহিপাল ফাইওভারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার আপনাদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।