প্রতিবেদন

রেলওয়ের তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগে খুশি যাত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর ফলে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন থেকে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট যাত্রীর যাবতীয় তথ্য নিবন্ধনের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। নিবন্ধন করতে লাগবে যাত্রীর নাম, ফোন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মসনদ নম্বর। এমনকি এসব তথ্য ট্রেনের টিকিটে প্রদর্শিত হবে। ঢাকা থেকে সারাদেশে চলাচলকারী ৩৩টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৮টি আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন নিয়মে টিকিট বিক্রি ১০ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। যারা টিকিট কিনবেন তাদের যাত্রার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২০ মার্চ থেকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, কালোবাজারি রোধে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে গত ১ জানুয়ারি সোনার বাংলা ট্রেনে এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। এখন সোনার বাংলা ট্রেনের সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সুবর্ণ, মহানগর গোধূলি, মহানগর প্রভাতী, পদ্মা, চিত্রা, পারাবাত ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস।
একটি এনআইডি নম্বরে সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট কেনা যাবে। তবে একবার নাম নিবন্ধন করলে পরবর্তীতে আর নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট/ই সেবায়, মোবাইল অ্যাপ ও স্টেশন কাউন্টারে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করা যাবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের দফতর থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, এসব ট্রেনের ১ম সিট/ ১ম বার্থ, এসি সিট/এসি বার্থ ও স্নিগ্ধার টিকিট কেনার েেত্র নিবন্ধন প্রয়োজন হবে। শোভন শ্রেণির টিকিটের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই চিঠিতে। তবে এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম জানিয়েছেন, শোভন শ্রেণির টিকিটের েেত্রও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
সূত্র জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতে টিকিটে নাম লেখা পদ্ধতি চালু রয়েছে। সেখানে যিনি ভ্রমণ করবেন তার নামেই টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। অন্যজনের টিকিট দিয়ে ভ্রমণ করার কোনো সুযোগ নেই। ট্রেনে আলাদা চেকিং হয়, গরমিল হলেই যাত্রীদের আটক করা হয়।
জানা যায়, গত ১ জানয়ারি থেকে নিবন্ধনের মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হলে প্রথমদিকে কিছু সমস্যা হলেও পরবর্তীতে এর সুফল মেলে।
এ কারণেই গত ১৩ ফেব্রয়ারি রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে রেলভবনে রেলওয়ের টিকিট সংক্রান্ত সভায় নতুন এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এজন্য যারা টিকিট বিক্রি করবেন (বুকিং সহকারী), তাদেরকে প্রশিণ দেয়া হবে। যাতে তারা যাত্রীর নাম সঠিক বানানসহ লিখে দ্রুততার সঙ্গে টিকিট বিক্রি করতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্তী বলেন, সোনার বাংলায় এনআইডি চালু করায় সুফল পাওয়া গেছে। এমনকি নতুন ব্যবস্থাপনায় টিকিট নিতে যাত্রীদের কোনো ধরনের ভোগান্তি হবে না। কারণ একবার নিবন্ধন করলে দ্বিতীয়বার আর নিবন্ধন করতে হবে না। পরবর্তীতে যাত্রীর মোবাইল নম্বর সার্চ দিলেই সব তথ্য চলে আসবে। ফলে নিয়মিত যাত্রীদের ক্ষেত্রে এটি অনেক সুবিধাজনক হবে।
উল্লেখ্য, এ পদ্ধতিতে যে কাউন্টার থেকে টিকিট দেয়া হয়, সেই কাউন্টার থেকেই নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ করে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।
এদিকে রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন গত ১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের অগ্রগতি পরিদর্শন করতে গিয়ে বলেন, ১৯৬৫ সালের আগে ভারতের সঙ্গে যে ৮টি রেলপথ ছিল সেগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধির জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথসহ দেশের সবকটি মিটার গেজ লাইনকে পর্যায়ক্রমে ব্রডগেজ লাইনে রূপান্তর করা হবে বলে জানান তিনি। সেইসঙ্গে আগামী জুন মাসের মধ্যে রেলের জন্য বিদেশ থেকে ২০০ কোচ আনা হচ্ছে বলেও জানান রেলপথ মন্ত্রী। চাহিদা অনুযায়ী চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসব কোচ ট্রেনে সংযোগ করা হবে।
নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েলগেজ রেলপথের নির্মাণকাজ শেষ হবে। ফলে ট্রেনের ক্রসিং সংখ্যা কমবে এবং যাত্রীসেবার মান অনেক বাড়বে।
জানা গেছে, সড়ক পথের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নে এবং ট্রেনে চলাচলের ক্ষেত্রে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রেলপথকে আলাদা মন্ত্রণালয় করার পাশাপাশি এ খাতে অতীতের তুলনায় বাজেট বরাদ্দ অনেক বাড়িয়েছে সরকার। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রাথমিক অবস্থায় ৮টি ট্রেনে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন প্রথা চালু করা হলেও পর্যায়ক্রমে ৩৩টি আন্তঃনগর ট্রেনেই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা যায়, রেলওয়ের নতুন এ সিদ্ধান্তে বেশ খুশি যাত্রী সাধারণ। তবে কিছু যাত্রীর মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধও আছে। তাদের কথা হলো এমনিতেই ট্রেনের টিকিট কিনতে লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এর ওপর নিবন্ধনকৃত টিকিট কিনতে স্বাভাবিকভাবেই আরো বেশি সময় লাগবে। ফলে লাইন আরো দীর্ঘ হবে। রেলের প্রতি যাত্রীদের বিরক্তি আরো বেড়ে যাবে।
নিবন্ধনযুক্ত টিকিট বিক্রি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ঢাকা (কমলাপুর) রেলওয়ে স্টেশনে সিলেটগামী পারাবত ট্রেনের টিকিট কিনতে আসা একজন যাত্রী নুরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, তিনি নিবন্ধনের মাধ্যমে ২২ মার্চে যাত্রার জন্য ৩টি টিকিট কিনেছেন। এতে তার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লেগেছে। তবে তিনি খুশি এ জন্যই যে, তাকে কালোবাজার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়নি।
আরেকজন যাত্রী জামাল উদ্দিন রুবেল বলেন, নিবন্ধনযুক্ত টিকিট বিক্রি করলেই কালোবাজারি বন্ধ হয়ে যাবে Ñ এটা মনে করা ঠিক নয়। টিকিট কালোবাজারিদের সঙ্গে বুকিং সহকারী থেকে শুরু করে স্টেশন মাস্টারসহ অনেকেই জড়িত। এরা কমিশনের বিনিময়ে কালোবাজারিদের হাতে টিকিট তুলে না দিলে তারা কিছুতেই টিকিট পায় না। সুতরাং ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে এর সাথে জড়িত সবাইকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা গেলে যাত্রীরা কাউন্টার থেকেই নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট সংগ্রহ করতে পারবে।