প্রতিবেদন

রোহিঙ্গাদের সংস্পর্শে এইডস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্পূর্ণ মানবিক কারণে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে এদেশবাসীই তাদের নিয়ে এখন নানা সংকটে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া এখন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের কারণে স্থানীয়রা উল্টো নানা চাপে রয়েছে।
ইতোমধ্যে রোহিঙ্গারা নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে, স্থানীয় বনাঞ্চল ধ্বংস করছে এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এর মধ্যে সারাদেশে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে মারণব্যাধি এইডস সংক্রমণকে কেন্দ্র করে।
কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। এ পর্যন্ত এইচআইভি-এইডসে আক্রান্ত ৩১৯ জন রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭৭ জন চিকিৎসার আওতায় রয়েছে। তাছাড়া অনেক রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে নানা কৌশলে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সারাদেশই এখন এইডস আতঙ্কে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশে ক্রমেই এইডস ঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের শিবিরগুলোয় প্রায় ৯ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে গত ফেব্র“য়ারিতে এইডসে আক্রান্ত ৪ পুরুষ ও ৫ নারীকে চিহ্নিত করা হয়। একই সময়ে এ রোগে ২ নারী ও ১ পুরুষ মারা যান। তবে ফেব্র“য়ারিতে কক্সবাজারের স্থানীয়দের মধ্যে এইডস আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। তবুও আতঙ্ক ও আশঙ্কা থেকেই যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস-এসটিডি কর্মসূচি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফ হাসপাতালে এইচআইভি-এইডস শনাক্তকরণ সংক্রান্ত কাউন্সিলিং ও টেস্ট করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাদের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস পাওয়া যায় তাদের কক্সবাজার হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। গত ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত এইডসে আক্রান্ত ৪৪৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৯ জন রোহিঙ্গা এবং ১২৯ বাংলাদেশি রয়েছে।
আক্রান্তদের মধ্যে ২৭৭ জন রোহিঙ্গা এবং ৭২ বাংলাদেশিকে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে। এইডসে আক্রান্ত ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন রোহিঙ্গা এবং ৪৪ জন বাংলাদেশি। আক্রান্ত ও মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি।
জানা যায়, কক্সবাজার এলাকার এইডসে আক্রান্তদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা দেয়া হয় জেলা হাসপাতালের মাধ্যমে। তবে এ রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে হাসপাতালে আনা-নেয়ার েেত্র নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে উখিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এইডসে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী ৮৪ রোহিঙ্গাকে উখিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকিদের পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা হবে।
জানা গেছে, এশিয়ার মধ্যে যে ক’টি দেশ এইচআইভির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তার মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম। জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের তথ্য মতে, দেশটিতে বর্তমানে ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার এইডস আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দশমিক ৮ ভাগ এইডসে আক্রান্ত। এছাড়া শিরায় ইনজেকশন গ্রহণকারীদের মধ্যে ২৩ শতাংশ, নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সমকামীদের মধ্যে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। সেই হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২ থেকে আড়াই হাজার এইডস রোগী থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস-এসটিডি কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গারা যদি আমাদের দেশের লোকদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়, তা হলে এ রোগ ছড়াতে পারে। তাই রোহিঙ্গারা যেন কক্সবাজারে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ক্যাম্পে রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে। যাদের এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে তাদের একা বা স্বজনের সঙ্গে কক্সবাজার হাসপাতালে আসতে দেয়া হয় না। আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার হাসপাতালে নিয়ে যান আইএমও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জানা যায়, প্রতি বছর দেশে এইডসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এইডসে আক্রান্ত রোহিঙ্গারা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রক্ত পরীার মাধ্যমে তাদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে এই জনগোষ্ঠী হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
বিষয়টি স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর স্বদেশ খবরকে বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭৮ জন তাদের দেশেই এইডসের ওষুধ সেবন করত। অনেকে এইডসে আক্রান্ত থাকলেও তা গোপন ছিল। ফলে শরণার্থী শিবিরে এইডস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এটি যাতে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সর্বদা সজাগ আছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণের হার এখনও শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ শতাংশেরও কম।
সে হিসাবে এতদিন এইডসের দিক দিয়ে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত থাকলেও রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের দিকে চলে যেতে পারে। বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সবাইকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে সতর্ক থাকলেও এইডস এমন একটি রোগ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যৌন কর্মকা-ের মাধ্যমে ছড়ায়। আর এই প্রবণতা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রবল হওয়ায় তাদের মাধ্যমে এইডস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বেশ উদ্বিগ্ন এখন বাংলাদেশ।