প্রতিবেদন

শেষ হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা

রুবেল হোসেন
অমর একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে মেলা কর্তৃপক্ষ দুইদিন সময় বাড়ানোর কারণে এবারের একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হয়েছে ২ মার্চ।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা দেশে বইকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় আয়োজন। কালক্রমে আয়োজনটি বঙ্গ সংস্কৃতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি এ মেলার আয়োজন করে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১ ফেব্র“য়ারি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দেশের প্রায় সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এ মেলায় অংশ নেয়। প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট জায়গার এ মেলায় শুধু একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিল ১০৪ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তারুণ্যের প্ল্যাটফর্ম লিটল ম্যাগাজিন চত্বরও ছিল এ অংশে।
মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। চার চত্বরে বিন্যস্ত উদ্যানে ৩৯৫ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজায়। বাংলা একাডেমিসহ ২৪ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় ২৪ প্যাভিলিয়ন। সব মিলিয়ে এবার মেলায় অংশ নেয় ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বরাদ্দ দেয়া হয় ৭৭০ ইউনিট।
রেকর্ড পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে এবারের বইমেলায়। সুন্দর ছিমছাম পাঠকবান্ধব বইমেলা আয়োজনের কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে বলে অনেকের অভিমত। মেলায় এবার ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছরের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার। ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছিল।
নতুন বই প্রকাশের েেত্র অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার ৪ হাজার ৮৩৪টি নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা একাডেমির পর্যালোচনায় এসব বইয়ের মধ্য থেকে ১ হাজার ১৫১টি বইকে মানসম্পন্ন বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারও মেলায় প্রতিদিন এসেছে নতুন নতুন বই। সংখ্যায় বেশি ছিল উপন্যাস। গল্প-কবিতাও এসেছে প্রচুর। ইতিহাস প্রবন্ধ মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে গবেষণামূলক বই প্রকাশিত হলেও সংখ্যায় ছিল খুবই কম। মেলার সদস্য-সচিব ড. জালাল আহমেদ জানান, ৩০ দিনে মেলায় নতুন বই আসে ৪ হাজার ৮৩৪।
মেলায় কত বই বিক্রি হয়েছে তার পরিসংখ্যান প্রকাশকরা একদমই দিতে চান না। তবে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বইয়ের হিসাব থেকে অন্যদের বিক্রি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। জালাল আহমেদ জানান, ১ মার্চ পর্যন্ত শুধু বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছে প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বই। অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও এবার বেড়েছে বলে মত দেন তিনি। এবার মোট বিক্রি গত বছরের তুলনায় ১০ ভাগ বেড়েছে। বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেণের আলোকে তিনি জানান, মেলায় সব মিলিয়ে ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে।
অবশ্য প্রকাশকরা একাডেমির দেয়া বিক্রির হিসাব মানতে নারাজ। এ সম্পর্কে প্রকাশক নেতা ও অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, মেলায় ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হওয়ার তথ্য অবাস্তব। এমনকি উদ্যানের একেবারে শেষ প্রান্তে জায়গা হওয়ায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের বিক্রি গতবারের চেয়ে ১৫ ভাগ কম হয়েছে। গত বছর একাডেমি জানিয়েছিল, ৭০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। ১ বছরের ব্যবধানে ১০ কোটি টাকা বেড়ে গেল, এটা কি সম্ভব? প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অ্যাডর্নের কর্ণধার সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, মেলায় বই বিক্রি মূল উদ্দেশ্য নয়। এখানে বইয়ের সুন্দর একটি প্রদর্শনী হয়, এবারও হয়েছে। তবে বিক্রির যে হিসাব একাডেমি দিয়েছে সেটি একেবারেই সত্য নয়। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এমন হিসাব দেয়া অনুচিত।
অবশ্য অনেক প্রতিষ্ঠানই মেলার বিক্রিতে খুশি। যুবজাগরণ নামে একটি স্টলে মাত্র কয়েকটি বই রাখা হয়েছিল। ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিষয়ে লেখা বই হওয়ায় ভালো বিক্রি হয়েছে। স্টলটি থেকে জানানো হয়, মেলায় তারা প্রায় ১২ লাখ টাকার বই বিক্রি করেছেন।
এবারও মেলায় পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত লেখক বিশেষ করে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বই ছিল মূল আকর্ষণ হয়ে। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নাসরিন জাহানের নতুন বই এসেছে। জনপ্রিয় ধারার রচনাসম্ভার নিয়ে মেলায় ছিলেন ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সুমন্ত আসলাম, সাদাত হোসাইনসহ কয়েকজন। আর ছোটরা ঘিরে রেখেছিল তাদের সবচেয়ে প্রিয় সায়েন্স ফিকশন লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। কিশোরদের আরেক প্রিয় লেখক মোশতাক আহমেদ। তার কল্পবিজ্ঞানও পড়ছে ছোটরা। ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে লেখা মুনতাসীর মামুনের বই মেলাকে সমৃদ্ধ করেছে। এসেছে বিশিষ্টজনদের লেখা স্মৃতি কথা। আবার তাদের নিয়ে অন্যদের লেখা বইও আলোচনায় এসেছে। চিরায়ত সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল সবসময়ের মতোই। প্রয়াত লেখকদের বিখ্যাত রচনাগুলোও সংগ্রহ করেছেন নবীন পাঠকেরা।
তবে চোখের সামনে বেশি ঘুরঘুর করেছেন মৌসুমি লেখকরা। তাদের অস্বস্তিকর প্রচার চোখে পড়েছে প্রতিদিনই। কিন্তু সাহিত্যমান ও বিক্রির জায়গা থেকে এ অংশটির অবদান শূন্যের কোটায় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। নাম প্রচারে ব্যস্ত লেখকেরা বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর েেত্র বড় ভূমিকা রাখলেও মানের দিক থেকে ছিলেন পিছিয়ে। এ কারণে মেলায় আসা মোট বইয়ের তুলনায় মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা অনেক কম। বাংলা একাডেমি মানসম্পন্ন বই খুঁজে দেখার একটি চেষ্টা করেছে। তাতে দেখা যায়, মেলার ২৮ দিনে মানসম্পন্ন বই এসেছে মাত্র ১ হাজার ১৫১টি।
মৌসুমি লেখকদের মতো মেলায় ছিলেন মৌসুমি প্রকাশকরাও। দোকানদারিটাই শুধু করেছেন তারা। মেলার নীতিমালা ভঙ্গের অপরাধে এ ধরনের ১১ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেয় বাংলা একাডেমি।
মৌসুমি প্রকাশকদের নিয়ে ভালো ঝক্কিতে আছে বাংলা একাডেমিও। এদের কারণে মেলার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। তেমনি কমছে বইয়ের মান। এবারও মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় অসন্তুষ্ট বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লা সিরাজী। তিনি বলেন, মেলায় প্রচুর বই আসছে। আমরাও চাই, আসুক। কিন্তু মান বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি।
এ জন্য মৌসুমি লেখক ও প্রকাশকদের দায়ী করা হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, খ্যাতি অর্জনের নেশায় বই লিখে কিছু পাওয়া যায় না। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাথায় রাখতে হবে, এটা দোকানদারি নয়।
অন্য সমালোচনার মধ্যে ছিল গাড়ির উৎপাত। এবারই প্রথম মেলা প্রাঙ্গণে গাড়ি ঢুকতে দেখা যায়। একেবারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাড়ি নিয়ে ঢুকে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন একজন প্রতিমন্ত্রী। পেটমোটা গাড়ি নিয়ে প্রতিদিনই মেলায় প্রবেশ করতে দেখা যায় সরকারের বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরের বড় কর্তাদের। পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা যেমন খুশি গাড়ি হাঁকিয়েছেন। অনেক প্রকাশকও গাড়ি নিয়ে মেলায় প্রবেশ করেছেন। আগে কোনোদিন এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। এর ফলে দুর্ভোগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের। দুর্ঘটনারও শঙ্কা ছিল। অনেকে বলছেন, বাংলা একাডেমির অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই এবার এমনটি হয়েছে।
একে আর বাড়তে না দেয়ার পে মত দিয়ে বইপ্রেমীরা বলেছেন, অল্প জায়গা হেঁটে পার হতে না পারলে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা আছে। এরপরও মতার দাপট দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হলে একুশের মেলার সৌন্দর্য ও ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হবে।
এরপরও ভালো বই প্রকাশিত হওয়া এবং মেলার সুন্দর ছিমছাম পরিবেশের কারণেই রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয়েছে বলে মত দেন লেখক-প্রকাশক ও পাঠকরা। বিশাল পরিসরের মেলায় আগতদের মধ্যে স্বস্তি ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল পরিসরে মানুষ বইমেলায় এসেছে। স্বস্তিতে বই কেনার পরিবেশ পেয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার বিস্তৃতি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ বছর মেলার বিস্তৃতি বাড়িয়ে নান্দনিক বিন্যাসের কারণে ছিমছাম মেলা উপহার দিতে পেরেছে বাংলা একাডেমি। আগামীতে স্টল বিন্যাসকে আরো আধুনিক মানের আরো সুন্দর ও দর্শনার্থীদের উপযোগী করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পর্দা নেমেছে মাসব্যাপী বইমেলার।
শেষ সময়ে দু’দিন মেলার সময় বাড়ানোতে প্রকাশকরা বেশ খুশি। তেমনি খুশি পাঠক ও দর্শনার্থীরাও। এতে মেলার আনন্দ যেন আরও বেড়ে গিয়েছিল। মেলায় এবার নিরাপত্তা কাজে বিভিন্ন বাহিনীর ১ হাজার ২০০ সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে ১ মাস ২ দিনে ৮২৪টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এতে ৩ হাজারেরও বেশি অতিথি অংশ নেন। ৩০ দিনে লেখক বলছি মঞ্চে ৩১০ জন প্রবীণ, নবীন, তরুণ লেখক, প্রকাশক ও সাহিত্যিক তাদের নতুন বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন।
মেলা উপলে গঠিত টাস্কফোর্স মেলায় অভিযান পরিচালনা করে ২২টি প্রতিষ্ঠানকে নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান নোটিশের জবাব না দেয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের স্টলটি একদিন বন্ধ রাখার শাস্তি প্রদান করা হয়।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, এবার মেলা ছিল অসাধারণ। মেলার মূল থিম ‘বিজয় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১: নবপর্যায়’কে কেন্দ্র করে মেলা ছিল নান্দনিকতায় ভরপুর। স্টল, প্যাভিলিয়ন ও মেলার পরিবেশ ছিল অন্যান্য বারের চেয়ে নান্দনিক ও শোভিত। অন্যান্য সব ব্যবস্থা ছিল লণীয়। নতুন আয়োজনও ছিল অনেক।
দুইদিনের বর্ধিত সময়ে এসে একেবারেই অন্য চেহারা দেখা যায় একুশে গ্রন্থমেলাকে। পুলিশ সদস্যদের বড় অংশটিকে আগেই সরিয়ে নেয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। বিশৃঙ্খল একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত রাস্তাটি রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহনের জন্য খুলে দেয়া হয়। ফলে মেলায় আগত হাজার হাজার মানুষ মহাদুর্ভোগের শিকার হন। উভয় দিনই কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটে এ রাস্তায়। একই সঙ্গে রাস্তাটিতে চলে বারোয়ারি মেলা। এমন বিশৃঙ্খলা মেলার গাম্ভীর্যকে যথেষ্ট ম্লান করেছে।
মেলার নির্বাচিত বই নিয়ে এবার প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় ‘লেখক বলছি’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। এই মঞ্চে প্রতিদিন ৫ জন লেখক তাদের বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন। প্রত্যেক লেখক নিজের বই সম্পর্কে আলোচনা করেন। প্রশ্নের উত্তর দেন।
মেলার দ্বিতীয় দিন থেকে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে হয় সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। চলে আলোচনা। একই সঙ্গে বিশিষ্ট বাঙালি মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবার নতুন যোগ হয় কবিতা। প্রতিদিনই ছিল কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ এবং আবৃত্তি। শিশু কিশোরদের জন্যও ছিল নানা আয়োজন। চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান, উপস্থিত বক্তৃতা এবং সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তারা। এভাবে পুরো ১ মাস দারুণ মুখরিত ছিল একুশে গ্রন্থমেলা।