প্রতিবেদন

সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে অধিকাংশ ব্যাংক: উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার মান ও গ্রাহক সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে অনেকগুণ। তবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাবে দেশ-বিদেশে ব্যাংকিং সেক্টর অনেকটা ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ আধুনিক প্রযুক্তিকে নেতিবাচক উপায়ে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল দেশ-বিদেশে ব্যাংকিং সেক্টরের ইমেজ ুণœ করছে। এ রকমই এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক তাদের সাইবার নিরাপত্তায় নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়্যাল (এনজিএফডব্লিউ) সফটওয়্যার স্থাপনে সম হয়েছে। এছাড়া ৩৫ শতাংশ ব্যাংকে আংশিক এবং ১৫ শতাংশ ব্যাংকে এটি স্থাপন অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আংশিক এবং অনুমোদন পর্যায়ে থাকা এই ৫০ শতাংশ ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় এগুলো সাইবার হামলার সম্মুখীন হতে পারে।
সাইবার হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল অংকের অর্থ চুরি যাওয়ার পর ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। এখন প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে Ñ এমন তথ্য প্রকাশ পেলে তা অনেককেই উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিশেষ করে প্রচুর মানুষ এখন ব্যাংকের এটিএম কার্ডের পাশাপাশি মোবাইল ফোনে বিকাশ, রকেট, শিওর ক্যাশ ও নগদ ইত্যাদির মাধ্যমে লেনদেন করায় তাদের উদ্বেগ আরো বেশি। অনেক গ্রাহক বলছেন, ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রায় পুরোটাই এখন অনলাইন মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে ব্যাংকগুলো এক মুহূর্তের জন্যও নিরাপদ নয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চেয়ে গ্রাহকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি। কারণ, শেষ পর্যন্ত টাকাটা যায় গ্রাহকেরই।
গত ১ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটরিয়ামে ‘আইটি অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক এক কর্মশালায় উপরোক্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিআইবিএমের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবদুর রহিম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের ব্যাংকে আইটি বিষয়ে দ জনবলের অভাব রয়েছে। তাই আমাদের এ বিষয়ে প্রস্তুতি রাখতে হবে, যেন বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা রোধ করতে পারি। এজন্য টেকনোলজি উন্নতি করতে হবে। শুধু ভালো সফটওয়্যার কিনলেই হবে না। এগুলো যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য দ কর্মীও তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের আইটি প্রশিণে জোর দিতে হবে।
ডা”-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বলেন, হ্যাকিং বিভিন্ন মাধ্যমে হয়ে থাকে। বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাংক আইটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের সতর্ক হওয়া এবং আইটি নিরাপত্তা জোরদারে মনোযোগী হতে হবে। আমি মনে করি, আইটি বিভাগ ও আইটি সিকিউরিটি বিভাগ আলাদা হওয়া উচিত। বিশেষ করে আইটি সিকিউরিটি বিভাগ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর অধীনে রাখা উচিত। ক্যাশলেস ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, আইটি খাতে অধিকাংশ ম্যানেজমেন্টের নজর কম। তারা শুধু ডে টু ডে ব্যবসা বোঝে। এতে ব্যাংকিং ব্যবসা অনেকটা দোকানদারিতে পরিণত হয়েছে। শর্টটাইম লাভ-লোকসানের চিন্তার কারণে এটি হয়েছে। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইটি খাতে নজর ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই ব্যাংকিং সেবা পেতে চায়। আমাদেরকে সেদিকে যেতে হবে। এছাড়া এখনও ৫০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে। এদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে হবে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটি করতে হবে। প্রতিটি গ্রামে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে হবে।
বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে আইটিকে পৃথক করার কিছু নেই। তাই সব কর্মকর্তাকেই আইটি বিষয়ে দতা অর্জন করতে হবে। কারণ আইটি না জানলে ওপরে ওঠা যাবে না। এছাড়া প্রত্যেকটা অডিট টিমে আইটির লোক থাকতে হবে। জাল-জালিয়াতি ধরার জন্যই এটি দরকার।
বিআইবিএমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, কয়েকটি দুর্ঘটনার পর আইটি সিকিউরিটির বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। ব্যাংকিং খাতে এটি খুবই জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, আইটি বিষয়ে সব কর্মকর্তাদের জ্ঞান থাকতে হবে। এটি শুধু আইটি বিভাগের কর্মকর্তাদের থাকলে চলবে না।
প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতের আইটি বিভাগে কর্মরত জনবলের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে আইটি বিভাগে কর্মরত জনবলের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার ২১৩ জন। অর্থাৎ গড়ে আইটি বিভাগে ৫৭ জন কর্মরত। এর মধ্যে সর্বনিম্ন জনবল ৬ জন ও সর্বোচ্চ ৩৭৪ জন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সর্বোচ্চ ১১৬ এবং সর্বনিম্ন ৪১ জন নন-আইটি কর্মকর্তার জন্য মাত্র ১ জন, বিশেষায়িত ব্যাংকে সর্বোচ্চ ২৬৯ সর্বনিম্ন ১৫১ জন কর্মকর্তার জন্য ১ জন, বেসরকারি ব্যাংকে সর্বোচ্চ ৯১ এবং সর্বনিম্ন ১৪ জনের জন্য ১ জন, বিদেশি ব্যাংকে সর্বোচ্চ ৪৫ এবং সর্বনিম্ন ১৪ জনের জন্য ১ জন আইটি কর্মকর্তা রয়েছেন।
গড়ে কতটি শাখায় ১ জন আইটি কর্মকর্তাকে সেবা দিতে হয় সেই চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সর্বোচ্চ ৮ শাখার জন্য ১ জন, বিশেষায়িত ব্যাংকে ২৯ শাখার জন্য ১ জন, বেসরকারি ব্যাংকে ৪.৫ শাখার জন্য ১ জন এবং বিদেশি ব্যাংকে ২.২ শাখার জন্য ১ জন আইটি কর্মকর্তাকে কাজ করতে হয়েছে।
প্রতিবেদনে আইটি খাতে ব্যংকের একটি ব্যয়ের চিত্র দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৯৬৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত আইটি খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর মোট খরচ হয়েছে ৩৮ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৮ সালে হয়েছে ২ হাজার ২১ কোটি টাকা। আইটি খাতে যে ব্যয় হয়, তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশই আইটি হার্ডওয়্যারের পেছনে। এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৬০ শতাংশ আইটি নেটওয়ার্কে।