কলাম

স্মৃতিময় বইমেলা, অন্যরকম আয়োজন

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস
২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় যে বারিবর্ষণ শুরু হয় তা স্থায়ী হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। বিকেলে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বইমেলায় উপস্থিত হয়েছিলাম। কিন্তু থেমে থেমে বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ায় বন্দি হয়ে থাকতে হলো বাংলা একাডেমির মূল প্রাঙ্গণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে। সেখানেও প্রবল ধারার জলরাশি ধেয়ে এসেছে। যারা মেলার শেষ দু’দিনে বই কিনবেন বলে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, তাদের আশালতা তখন ফাগুনের অকাল বর্ষণে সিক্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত।
সে রাতে কোনো রকমে বের হয়ে এসে পরের দিন পুনরায় মেলাতে উপস্থিত হই। শেষ দিন ভেবে যারা সেদিন স্টলে স্টলে ভিড় করে বই কিনতে বিপুল উৎসাহে ঘুরছেন এবং বইমেলা শেষ হচ্ছে বলে এক ধরনের ম্লানতা এসে সমস্ত চত্বরকে যখন ভারাক্রান্ত করে তুলেছে ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে বইমেলা আরো দুদিন অর্থাৎ ১ ও ২ মার্চ চলবে বলে সিদ্ধান্তের ঘোষণা জানানো হয়। মেলা থেকে স্মৃতিময় একটি মাসের বিচিত্র ঘটনা স্মরণ করতে করতে ফিরে আসার সময় এই আনন্দ সংবাদে মনটা ভালো হয়ে গেল। আসলে এটি ছিল এবারের বইমেলার অন্যরকম চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৃষ্টি ও দমকা হাওয়াসহ বৈরী আবহাওয়া বইমেলার লেখক-প্রকাশকদের বেশ ভুগিয়েছে। তাইতো সরকার তাদের কথা মাথায় রেখে মেলার সময় ২ দিন বাড়িয়েছিল, যা অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল ২০১৯ সালের বইমেলায়।
এছাড়া উদ্বোধনের দিন থেকেই এবারের বইমেলার যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হলো স্টল বিন্যাস। ২০১৮ সালের চেয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে এবারের বইমেলায় স্টল বিন্যাস বেশ সাজানো-গোছানো ছিল। মেলার পরিসরও বাড়ানো হয়েছিল। অন্যদিকে অন্য বছরের তুলনায় এবছর শুরু থেকেই বইপ্রেমী পাঠকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শুরুর কিছুদিন ধূলা উড়তে দেখা গেলেও শেষের দিকে তা কর্তৃপরে নির্দেশনায় নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রতিটি স্টলের সামনে ক্রেতাদের দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল। কিন্তু বৃষ্টিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রার জন্য শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল না। এটি প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের বেশ ভুগিয়েছে। তবে কোনো অঘটন ছাড়াই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে মেলার সমাপ্তি ঘটেছে।
এবারের মেলায় ১ মাস ২ দিনে সর্বমোট ৪ হাজার ৮৩৪টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের মেলায় মোট নতুন বই প্রকাশ পেয়েছিল ৪ হাজার ৫৯০টি। এবছর নতুন বইয়ের সংখ্যা ২৪৪টি বেড়েছে। অন্যদিকে মেলায় এবার ১ মাস ২ দিনে ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছরের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকার। গত বছরের মেলার চেয়ে এবার সাড়ে ৭ কোটি টাকা বিক্রি বেড়েছে।
২.
১৯৮৪ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের সূচনা। তবে ১৯৮৪ সালের আগেও এই বইমেলার কিছু ধারাবাহিকতা আছে। অবশ্য এবারই প্রথম বেশকিছু বৈচিত্র্য এসেছে গ্রন্থমেলায়। ইতঃপূর্বে মেলার কোনো ‘থিম’ নির্দিষ্ট ছিল না। ২০১৯ সালের গ্রন্থমেলার মূল থিম নির্ধারণ করা হয় ‘বিজয়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, নবপর্যায়’। বাংলা একাডেমির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্বয়ং বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও আবেগের এই দুটি সময়কে এবার বই মেলায় থিম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি অবশ্যই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
বরাবরের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। এবার নিয়ে ১৬ বার বইমেলা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গবাসী বাংলা ভাষার অন্যতম কবি শঙ্খ ঘোষ, শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা ‘শেখ হাসিনা: যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ শীর্ষক গ্রন্থের মিসরীয় লেখক-সাংবাদিক মোহসেন আল-আরিশি। বইটির অনুবাদ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। লেখকের উপস্থিতিতে বইটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়া হয়। সেইসঙ্গে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া ৪ গুণীজনের হাতেও একই মঞ্চে পুরস্কার প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কারবিজয়ীরা হচ্ছেন কাজী রোজী (কবিতা), মোহিত কামাল (কথাসাহিত্য), সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ (প্রবন্ধ ও গবেষণা) এবং আফসান চৌধুরী (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা)।
গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিনই আমরা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সমৃদ্ধ ভুবনের কথা শুনেছি। শুনেছি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ইতিবৃত্ত। ২০১৯ সালের ১৭ই নভেম্বর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের বিশ বছর পূর্তি হবে। ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার সংগ্রামী জনতার দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত করারও ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে বাঙালি জাতি। দেশের ইতিহাসকে আরো স্বচ্ছভাবে মানুষের কাছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য এ ধরনের উৎসব, আয়োজন ও অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।
বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইগুলো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তির অবসান ঘটাচ্ছে বা ঘটাবে। মোট ১৪টি খ-ে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। এসব দলিলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।
বাংলা ভাষার প্রতি মর্যাদা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রতি বছর শেখ হাসিনা নিজেও জাতিসংঘে বাংলাতেই ভাষণ দেন Ñ একথাও বইমেলার উদ্বোধনী দিনে সকলে আরো একবার স্মরণ করেন।
৩.
গত তিন দশক ধরে অমর একুশে গ্রন্থমেলা মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য বইমেলার চেয়ে এর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ‘কলকাতা বইমেলা’ শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। ১৯৮৪ সালে এটি আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হয়ে মেলাটি চলে ১২দিন। জার্মানিতে বইয়ের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য মেলা হলো ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা’। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মাঝামাঝি আয়োজিত এ মেলা ৫০০ বছরের বেশি পুরনো হলেও মাত্র ৫দিন এর ব্যাপ্তিকাল। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরেই জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা হলো ‘লিপজিগ বইমেলা’। মার্চে ৪ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এ মেলা। ‘হংকং বইমেলা’র প্রথম আসর বসে ১৯৯০ সালে। প্রতি জুলাইয়ে শুরু হয়ে এটি চলে এক সপ্তাহ। ১৯৮৬ সাল থেকে চলে আসছে ‘বেইজিং আন্তর্জাতিক বইমেলা’। প্রকাশনা শিল্পে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হলেও এটির স্থায়ীত্বও অল্প সময়ের। প্রতি বছর মার্চ কিংবা এপ্রিলে ৪ দিনব্যাপী ইতালির বোলোগনাতে অনুষ্ঠিত হয় ‘বোলোগনা শিশু সাহিত্যের বইমেলা’। ১৯৬৩ সাল থেকে চলে আসছে এ মেলা। ২০০৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে আয়োজিত হচ্ছে ‘ব্রুকলিন বইমেলা’। মে মাসের মাঝামাঝি ইতালির তুরিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা’। এ বইমেলা শুরু হয় ১৯৮৮ সাল থেকে। লন্ডন বইমেলা বছরের এপ্রিল মাসে আয়োজন করা হয়ে থাকে। ১৯৭১ সাল থেকে চলে আসছে এ বইমেলা, মেয়াদ ১২দিন। ১৯৯৩ সাল থেকে জাপানে চলছে ‘টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা’। অর্থাৎ বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলা ব্যতীত পৃথিবীর অন্য সব বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় অল্প সময়ের জন্য। এদিক থেকে আমাদের আয়োজনের ভিন্নতর গুরুত্ব এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এবারের মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩ লাখ বর্গফুট এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে এই বইমেলা বর্ধমান হাউজ থেকে সম্প্রসারিত হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিস্তৃৃত হয়েছে। এবার মেলায় ৫২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। এছাড়া ১৮০টি লিটল ম্যাগাজিনকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৪টি প্রতিষ্ঠানের ১৫০টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের ৬২০টি ইউনিটসহ মোট ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠান ৭৭০টি ইউনিট বরাদ্দ পেয়েছিল। এছাড়া বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ১৮০টি লিটল ম্যাগকে ১৫৫টি স্টল এবং ২৫টি স্টলে দুটি করে লিটল ম্যাগাজিনকে স্থান দেয়া হয়েছিল। স্টল পায় অন্য ১৩০টি লিটল ম্যাগও।
২০১৯ সালের মেলার মূল আকর্ষণ ছিল ‘লেখক বলছি’ নামের মঞ্চ। লেখকের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ বাড়াতে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের মেলায় চালু হয় ‘লেখক বলছি’ নামের মঞ্চ। মঞ্চে প্রতিদিন পাঁচজন করে লেখক পাঠকের সামনে এসেছেন নিজের নতুন বই নিয়ে। সেখানে দেখা মিলেছে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের। এছাড়া প্রতিদিন মূল মঞ্চে সেমিনার, বিশিষ্ট বাঙালি মনীষীর জন্মশতবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি ও তাদের কর্মজীবন নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষত গণঅভ্যুত্থানের সুবর্ণজয়ন্তী, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী, কবি সিকানদার আবু জাফর, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ভাষাবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই, কথাশিল্পী অমিয়ভূষণ মজুমদার জন্মশতবর্ষ প্রভৃতি আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল মননধর্মী ও মনোমুগ্ধকর। প্রয়াত লেখকদের বেশ কয়েকজনকেও স্মরণ করা হয়েছে তাঁদের সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়ন করে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে ছিল বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। আবার মেলার বই নিয়ে এবং স্টল সাজ-সজ্জার ওপর কয়েকটি পুরস্কার প্রদানের আয়োজনও করা হয়েছিল, যা ছিল বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।
৪.
বইমেলা আসলে একটি বড় ধরনের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। বইয়ের সঙ্গে আছে আরো অনেক কিছু। আগেই লিখেছি এবারের বইমেলার পরিসর অনেক বড় এবং স্টলগুলোর আয়তনও যথেষ্ট বিস্তৃত ছিল। ছিল পানীয় জল ও খাবার স্টল, কিছু বসার জায়গাও। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জলাধারকে মেলার সঙ্গে যুক্ত করায় পাঠক-লেখকদের সময় কাটানোর একটা জায়গাও তৈরি হয়েছিল এবারের মেলায়। ১ মাসের মধ্যে ৮ দিন ছিল শুক্র ও শনিবারের ছুটি আর ছিল সরস্বতী পূজা, ১ ফাল্গুন এবং বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সব মিলে ১১ দিন মানুষের ভিড় ছিল দেখার মতো। ছুটির দিনে বাচ্চারা বাবা-মার কোলে করে বা হাত ধরে বই কিনতে এসেছিল। শুধু বাচ্চারা নয়, সব বয়সী মানুষ দল বেঁধে মেলাতে এসেছেন। ঘুরেছেন, বই দেখেছেন, বই কিনেছেন, গল্প করেছেন তারা সকলে। লণীয় ভিড় ছিলো বাংলা একাডেমি, মুক্তধারা, বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, তাম্রলিপি, নবযুগ, অবসর, সেবা-র মতো প্রকাশনীগুলোতে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক কিংবা তরুণ প্রজন্মের অনেকেরই বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। বইমেলায় জ্যেষ্ঠ লেখকদের পাশাপাশি এবার তরুণ লেখকদের বইয়ের প্রতি পাঠক আগ্রহ দেখে বেশ ভালো লেগেছে। বলা যায়, কোনো লেখকের একক আধিপত্যের সংস্কৃতি এখন আর নেই। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে প্রতিদিনই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাগম ঘটেছে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান এবারও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
৫.
২ মার্চ অমর একুশের বইমেলা শেষ হয়েছে। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের পদচারণা আর আড্ডায় মুখরিত অঙ্গনে নীরবতা নেমে এসেছে। মাঝে বৃষ্টিভেজা কয়েকটা দিন ছাড়া বিপুল উপস্থিতি ছিল। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, মোড়ক উন্মোচন, বইকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা স্মৃতি হয়ে গেছে এখন। একুশের চেতনাজাত সেই মিলনমেলার পর্দা নেমেছে। পাঠক-লেখক ও প্রকাশকের মেলবন্ধনের এই স্পন্দন মিলবে আবারো ১১ মাস পর। সকলেই বলে থাকেন, বইমেলা কেবল কেনাবেচার নয়, চেতনার অভূতপূর্ব মিলনোৎসব। অন্যদিকে মানুষের সমাগম দেখে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি বইকেনার ভিড় দেখে মনে হয়েছে ডিজিটাল যুগেও মুদ্রিত বইয়ের আবেদন শেষ হবার নয়। আগামী বছর থেকে বইমেলার পরিসর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপ। একইসঙ্গে মেলায় যুক্ত হবে আরও ১০০টি নতুন ইউনিট।
প্রকাশনা সংস্থা বৃদ্ধি এবং বিশেষ দিনগুলোতে বর্তমান পরিসরেও মেলা প্রাঙ্গণে লোক ধারণে সমস্যা হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত যথার্থ বলে আমরা মনে করি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা অন্য শহরগুলোতেও ছড়িয়ে দিতে চান প্রকাশকরা। তাঁরা মনে করেন, বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে বইয়ের মান বাড়ানো জরুরি। আর বাংলা একাডেমি মনে করে, আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মেলা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।
মূলত বইমেলাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে সৃজনশীল বই প্রকাশিত হয় এবং তার সংখ্যা ৯০ ভাগেরও বেশি। আসলে বইমেলা নতুন বই প্রকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। বইমেলা আমাদের ভাষা শহীদ, আমাদের স্বাধীনতা এবং আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বইমেলার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যকে তুলে ধরি। এই মেলার মাধ্যমে নতুন সাহিত্যিক এবং পাঠক সৃষ্টি হয়। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ এখন বেশ নান্দনিক। প্রচ্ছদ দেখলেই মন চায় বইটা কিনে ফেলি। তবে বাইরের সৌন্দর্য নয়, বইয়ের ভেতরের গুণটাই আসল। এজন্য পাঠককে বই কেনার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আবার সাহিত্য-সমালোচকের দায়িত্ব পালন করা দরকার পাঠককে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য Ñ কোনটা ভালো বই কিংবা কোনটা পাঠযোগ্য। এদেশে ভালো সমালোচকেরও অভাব রয়েছে। ভালো সমালোচক না থাকলে নতুন করে কবি লেখক সৃষ্টির চেষ্টা বিফলে যাবে। এজন্য কেবল মেলা নয় বছরজুড়ে সাহিত্যের খবর রাখা পাঠকদের জন্য অবশ্যই একটি কর্তব্য।
সবমিলে ২০১৯ সালের বইমেলা স্মৃতিময় এবং এই মেলা আমাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার পথ দেখিয়েছে। নতুন প্রজন্ম এই মেলাকে কেন্দ্র করে নতুন বই লেখা ও প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা লাভ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।