কলাম

খালেদা জিয়ার প্যারোল বিতর্ক এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

এ কে এম শাহনাওয়াজ
আমাদের দেশে রাজনীতি অঙ্গনের মানুষের একটি বিশেষ সুবিধা আছে – নানা গোলমেলে কথা বলে ফেললেও ঠিক নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে পারেন। কোনো জবানির বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন করলে এবং এর তথ্যভিত্তিক উত্তর না থাকলে নির্দ্বিধায় বলে ফেলবেন Ñ এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য। অর্থাৎ সরল ভাষায় মিথ্যাচার। মোদ্দা কথা, যেন বলতে চাচ্ছেন এসব বক্তব্য আমলে নেয়ার দরকার নেই।
আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আইনকানুন ভালো বুঝি না, রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচও অজানা Ñ তারা সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেত্রীর প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিক ও আইনজীবীদের নানা ব্যাখ্যায় মহাধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। এই আইনগত ব্যাখ্যাটিও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয় যে, আইন সকলের জন্য সমান কি না। রাজনৈতিক মামলা হলে রাজনৈতিকভাবে না হয় একটি নিষ্পত্তির সুযোগ থাকে; কিন্তু দীর্ঘদিন নিয়মমাফিক মামলা লড়ে কোনো আসামি দ-প্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকলে তাকে তো বর্ণবিভাজন করে আলাদা করা যায় না। একারণেই তো বলা হয়, আইন সকলের জন্য সমান।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও বিএনপি নেতারা আইনের পথে না হেঁটে বলতে থাকেন Ñ তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। আদালতের দেয়া চূড়ান্ত রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও যখন সংক্ষুব্ধ পক্ষ বলেন মিথ্যা মামলা, তখন আর আদালতের মর্যাদা থাকে কোথায়? কিন্তু আমাদের দেশে অহরহ এ ধরনের আদালত অবমাননা হয়ে যাচ্ছে। আদালত এসব উপেক্ষা করে মহানুভবতার পরিচয় দিচ্ছেন।
খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে হঠাৎ করেই একটি কথা চাউর হয়েছে মিডিয়াতে। এরপর বিএনপি নেতা আর আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে অদ্ভুত বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতাদের কারো কারো বক্তব্যে মনে হচ্ছে যেন প্যারোলে মুক্তির মতো অমন নিন্দনীয় কথা তারা বলতে পারেন না। আবার আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ প্যারোলে মুক্তি চাওয়ার নানা নিয়মকানুন শেখাচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের ভাষ্য চলে যাচ্ছে আরেক দিকে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ একটি ধূম্রজালে যেন আটকে যাচ্ছে; কিন্তু নানা তথ্যউপাত্তে মনে হয় না যে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি শূন্য থেকে উৎসারিত হয়েছে।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত নানা ভাষ্য থেকে জানা যায়, বিএনপির কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করার জন্য গোপনে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কোনো কোনো বিদেশি কূটনীতিকও এ ব্যাপারে দূতিয়ালি করছেন।
দেশবাসী অনেকেরই জানা বিএনপির নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে দ্বিধা-বিভক্তি রয়েছে। একদল তারেক জিয়ার অনুসারী আর অন্য দল তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল নন। এই দ্বিতীয় পক্ষই প্যারোলে মুক্ত করতে চান বেগম জিয়াকে। তারেক জিয়ার অনুসারীরা প্যারোলের ব্যাপারে উৎসাহী নন।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে আলোচনার জন্য প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তারা বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা করে প্যারোলের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। বেগম জিয়ার অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসার প্রয়োজনেই প্যারোলের বিষয়টি নিয়ে ভেবেছিলেন। সম্ভবত এটি দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল না। তাই প্যারোল ভাবনাটি নাকচ করে দেন তারেক রহমান। এরপর থেকে প্যারোলে মুক্তির প্রসঙ্গটি বিএনপির পক্ষ থেকে আর সামনে আসেনি।
সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর আবারও প্যারোলে মুক্তির প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। ভেতরে ভেতরে কয়েকজন নেতা সক্রিয় থাকলেও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আরো কয়েকজন নেতা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তি দলের বিষয় নয়।
সরাসরি নাকচ না করে কোনো কোনো নেতা বলেন, প্যারোলে মুক্তি চাইবেন কি না এটি সম্পূর্ণই বেগম জিয়ার এখতিয়ার।
এরপর থেকেই বলা যায়, বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি নেবেন, নাকি নেবেন না Ñ এই বিতর্ক দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনীতির মাঠে অনেকটা পর্যুদস্ত বিএনপি নেতারা বরাবরই কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দিয়ে থাকেন। এই ধারাবাহিকতায় গত ৫ এপ্রিল বিএনপি নেতৃবৃন্দ প্রায় ২১টি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা বেগম জিয়ার উন্নত চিকিৎসা এবং মুক্তির ব্যাপারে কূটনীতিকদের সহযোগিতা চান।
এই বিষয়টি প্রচারিত হলে প্যারোলে মুক্তির প্রসঙ্গটি আবার সরব আলোচনায় চলে আসে। সঙ্গত কারণেই এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্যারোল প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি নিয়মের কথা জানান। বলেন, খালেদা জিয়া যদি সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে প্যারোলের জন্য আবেদন করেন, তবে সরকার ভেবে দেখতে পারে। এই আবেদন করার কোনো উদ্যোগ বিএনপির পক্ষ থেকে গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
এসব বক্তব্য শুনে মনে হয়, বেগম জিয়ার প্যারোল প্রসঙ্গটি যেন একটি বায়বীয় বিষয়। অনর্থক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে গলা চুলকানো ঝগড়া। না হলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে বলবেন কেন যে, প্যারোলে মুক্তির মতো এমন কোনো পরিস্থিতি খালেদা জিয়ার হয়নি। অবশ্য একটি যৌক্তিক কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর মতে, এটি আইনি ফয়সালার বিষয়, রাজনৈতিক নয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দায়িত্বশীল সকলে এক সুরে কথা বলেন না, তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ে।
অপরদিকে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সম্প্রতি কুমিল্লায় সাংবাদিকদের কাছে বলেন, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তিনি নানা দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, রাজনৈতিক মামলায় প্যারোল লাভের উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু এই আইনজীবী পরিষ্কার করলেন না খালেদা জিয়া তো রাজনৈতিক মামলায় নন, দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, একজন আইনজীবী হয়ে আদালতের বিচারে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। এমন বক্তব্যে মহামান্য আদলতকে কি সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো না?
এরই মধ্যে বিএনপি মহাসচিব যা বললেন, একে রাজনৈতিক বক্তব্য বলা যাবে কিনা জানি না। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি নেতাদের গণঅনশন কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন, বেগম জিয়া প্যারোল চাইবেন না। আইনি প্রক্রিয়াতেই তাঁর মুক্তি হবে। যদি এটিই ঠিক কথা হয় তা হলে কোনো পক্ষেরই এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার আর অবকাশ থাকে না।
কিন্তু সংকট আরও আছে। আইনের প্রতি আস্থাহীনতার প্রকাশও দেখা গেল বিএনপি নেতাদের কণ্ঠে। আইনি প্রক্রিয়ার অর্থ যেন তাদের ইচ্ছাধীন রায় দিতে হবে। কারণ একই অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস জানালেন, আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত না হলে নেত্রীকে মুক্ত করতে আন্দোলন গড়ে তুলবেন তারা।
অবশ্য বিএনপির আন্দোলনের হুঙ্কার ইতোমধ্যে খেলো হয়ে গেছে। বছরের পর বছর আন্দোলন গড়ার কথা বললেও অদ্যাবধি আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামার কোনো নমুনা দেখা যায়নি। বিএনপি নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা দেখে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা হতাশ। এদের বেগম জিয়াকেন্দ্রিক এমন ব্যক্তিক ইস্যুতে মাঠে নামানো কঠিন হবে।
বিএনপি নেত্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। জনগণের নেতা-নেত্রীরা নিজেদের জনবিচ্ছিন্ন ভাবেন না। এদেশের সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে ঠাঁই পান না, সেখানে আদালতের আদেশে বেগম জিয়ার চিকিৎসার বন্দোবস্ত থাকলেও বিএনপি নেতা-নেত্রীদের মন ওঠে না। তারা তাদের পছন্দের বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার দাবি তোলেন। যে ধরনের হাসপাতালের ধারে-কাছে সাধারণ মানুষের যাওয়ার সাধ্য নেই। এমন আভিজাত্য ছড়িয়ে কি সাধারণ মানুষের নেত্রী হওয়া যায়? অথচ বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীর উপাধি দিয়েছেন দেশনেত্রী। পাশাপাশি দেশের গণমানুষের নেত্রীর চিকিৎসা আভিজাত্য নিয়ে যেভাবে বিএনপি নেতারা মাঠ গুলজার করছেন তাতে কি একবারও মনে হয় না এখানে সাধারণ মানুষ থেকে নেত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে?
এভাবেই আমাদের রাজনীতি অঞ্চলের ক্ষমতাবান মানুষেরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে বিএনপি নানা ইস্যুতে এবং সর্বশেষ বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের আওয়াজ তুললেও আন্দোলন গড়ে ওঠার কোনো নমুনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ জনগণ দূরের কথা, দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও এক্ষেত্রে কোনো চাঙাভাব নেই। এ কারণে আমরা বরাবর বলে আসছি, সব রেখে বিএনপি নেতাদের উচিত চারদেয়ালের ভেতর থেকে আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে দল পুনর্গঠনের জন্য মাঠে নামা। আদর্শিক জায়গা স্পষ্ট করে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে না পারলে এই অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা বাড়তেই থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়