প্রতিবেদন

টিআইবির রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান ॥ ওয়াসার দাবি পানির প্রতিটি ফোঁটাই সুপেয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করতে গ্রাহককে প্রতি বছর ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস পোড়াতে হয়, ৯১ শতাংশ গ্রাহক ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করেন, ওয়াসার সেবা নিতে হলে সাড়ে ৩৭ শতাংশ গ্রাহককে ঘুষ দিতে হয় Ñ ঢাকা ওয়াসা সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির এমন গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৭ এপ্রিল।
টিআইবি কর্তৃক প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সেবামূলক সংস্থা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, টিআইবির প্রকাশিত প্রতিবেদন মনগড়া। ওয়াসার পানি ফুটিয়ে খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস পোড়ানোরও দরকার নেই। ওয়াসা যে পানি উৎপাদন করে তার প্রতিটি ফোঁটাই সুপেয়। টিআইবি একপেশে মনগড়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনের কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঢাকা ওয়াসাকে মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
২০ এপ্রিল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান এসব কথা বলেন।
ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, গত ১৭ এপ্রিল টিআইবির পক্ষ থেকে ‘ঢাকা ওয়াসা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করতে গ্রাহককে প্রতি বছর ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস পোড়াতে হয়। ৯১ শতাংশ গ্রাহক ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করেন। ওয়াসার সেবা নিতে হলে সাড়ে ৩৭ শতাংশ গ্রাহককে ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া ঢাকা ওয়াসায় সুশাসনের অভাব, এমডির একনায়কত্ব, অনিয়ম ও রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে।
টিআইবির প্রতিবেদনের জবাব দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাকসিম এ খান তার দায়িত্ব পালনের বিগত প্রায় এক দশক সময়ে ওয়াসার সফলতার চিত্র তুলে ধরেন। বিদেশি গণমাধ্যমে ঢাকা শহরের পানি ব্যবস্থাপনার সফলতা সংবলিত বিভিন্ন প্রতিবেদনও সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছে দেন।
টিআইবির গবেষণাপত্রের ধরন, কৌশল ও উপস্থাপন দেখে এটা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয় যে মনগড়া তথ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসাকে নগরবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এটি কোনো প্রফেশনাল গবেষণা নয়, এটি একটি একপেশে প্রতিবেদন। এটি তাদের মনগড়া। এই প্রতিবেদনের ফলে ওয়াসা সম্পর্কে জনমনে একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে। যাতে জনমনে কোনো ভ্রান্ত ধারণা না থাকে সেজন্য এ সংবাদ সম্মেলন।
ওয়াসার উৎপাদিত প্রতিটি পানির ফোঁটাই সুপেয় হিসেবে উল্লেখ করার পরপরই সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে শুরু করেন ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। একজন সাংবাদিক তার বাসার ট্যাপ থেকে দুই গ্লাাস পানি পানের অনুরোধ জানান। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান, ওয়াসার পানির মানের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই। আরেকজন সাংবাদিক বলেন, সংবাদ সম্মেলনে ওয়াসার দুজন পরিচালক মঞ্চে বসে আছেন, যাদের ওয়াসার জনবল কাঠামোকে অবজ্ঞা করে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর ওয়াসার বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে ৬ জন সিনিয়রকে সুপারসিড করে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসানো হয়েছে। এ রকম নানা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করলে সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্নই এড়িয়ে যান ওয়াসার এমডি।
টিআইবি ও উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে উদ্দেশ করে ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, পানির সংযোগ এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য অনলাইনে আবেদনের নিয়ম চালু করায় অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। মিটার রিডার যাতে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করতে না পারে সে জন্য ইতোমধ্যে মিটার অটোমেশন পাইলট প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে পানির মিটার অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া সিস্টেম লস ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়েছে। রাজস্ব আয় অনেক বেড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমছে। কিন্তু টিআইবি গ্যাস পোড়ানো বাবদ যে ৩৩২ কোটি টাকার হিসাব দিয়েছে সেটা মনগড়া। কারণ বাসাবাড়িতে গ্যাসের দাম ফিক্সড। গ্রাহক যতই ব্যবহার করুক না কেন, তাকে ৮০০ টাকাই বিল দিতে হয়। কাজেই গ্রাহকের অতিরিক্ত খরচের কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে কিছু গ্রাহক ফুটিয়ে পানি পান করেন। এটা না করলে দেশের গ্যাসসম্পদের কিছু সাশ্রয় হতো। আর ৯১ শতাংশ গ্রাহক যদি পানি ফুটিয়েই খাবেন তাহলে বাজারে এত পানির জার ও বোতল পানি বিক্রি হয়, সেগুলো কারা পান করেন Ñ এ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এমডি বলেন, ওয়াসার পানি সুপেয়। তবে পাইপলাইনে দু-একটি লিকেজ ও বাসাবাড়ির পানির ট্যাঙ্ক ঠিকমতো পরিষ্কার না করার কারণে পানি দূষিত হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে ওয়াসা বিভিন্ন সময় নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষাও করেছে। কিন্তু টিআইবি কোনো পরীক্ষা না করেই মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছে। ওয়াসা টিআইবির প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য সাংবাদিক শাবান মাহমুদ বলেন, আজ ওয়াসার এমডিকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হচ্ছে। তবে আগে কী হয়েছে তা আমি জানি না। আমি বোর্ডের সদস্য হওয়ার পর থেকে কোনো অনিয়ম হয়নি; এমনকি বর্তমান বোর্ডের আপত্তির কারণে ওয়াসার অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান নিজে ওয়াসার শতভাগ সুপেয় পানি পান না করে তিন ধরনের বোতলজাত পানি পান করে থাকেন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়াসার এমডির বক্তব্যের ব্যাপক সমালোচনার পাশাপাশি তারা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে ওয়াসার শতভাগ সুপেয় পানি (তার ভাষায়) পান করার আহ্বান জানিয়েছেন।