আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধসজ্জা

মোস্তাফিজুর রহমান
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে নানা খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনাম হয়। কারো মতে, চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে এই সাগর নিয়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান দুই শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দক্ষিণ চীন সাগরে যার যার কৌশলগত স্বার্থ হাসিলে ভীষণভাবে সচেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলার জন্য পরমাণু সক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক ৪টি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে চীন। ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬টি বিমানবাহী রণতরী পানিতে নামবে এবং এর মধ্যে ৪টির পরমাণুসক্ষমতা থাকবে বলে জানা যাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন সমরসজ্জার পর এ অঞ্চলে প্রায় ১০০ জাহাজ মোতায়েন করে বেইজিং। চীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে চোখে চোখে রাখছে। দক্ষিণ চীন সাগরের আশপাশের দেশগুলোও নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনে বাড়াচ্ছে নৌবাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত এলাকায় চীন যেসব কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সেখানে তাদের যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়া। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি এরকম কিছু করে তাতে বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের প্রবাল প্রাচীরের ওপর চীন অনেক দিন ধরেই একগুচ্ছ কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করছে। তবে সাগরের ওই অঞ্চলকে আরো অনেক দেশ নিজেদের বলে দাবি করছে। কৃত্রিম দ্বীপগুলোতে চীন সামরিক স্থাপনা তৈরি করছে বলে স্যাটেলাইটে তোলা ছবি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মতে, চীন দক্ষিণ চীন সাগরে যা করছে তা রাশিয়া যেভাবে ক্রাইমিয়াকে গ্রাস করেছিল, অনেকটা সেরকমেরই একটা কাজ। চীনকে একটা শক্ত সংকেত পাঠাতে হবে যাতে তারা এরকম কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি বন্ধ করে। আর দ্বিতীয়ত এসব দ্বীপে তাদের ঢুকতে দেয়া উচিত হবে না।
কিন্তু চীন মনে করে, যদি বাস্তবেই এরকম কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়, সেটা হবে একটা বিপর্যয়। এর ফলে চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মারাত্মক সংঘাত শুরু হবে বলে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন। আর যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আশা করে যে চীনকে তাদের বৈধ সীমানায় ঢুকতে বাধা দিলে চীন নিজেকে রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেবে না। ওয়াশিংটন যদি না দক্ষিণ চীন সাগরে বড় আকারে একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করে, অন্য কোনো উপায়ে সেখানে নির্মিত দ্বীপগুলোতে চীনের প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা হবে একটা বোকামি।
অন্য সব দেশ মিলে এই এলাকায় যে পরিমাণ খরচ করে, চীন একাই করে তারচেয়ে অনেক বেশি। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে উত্তর চীন সাগর, ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত নিজেদের প্রভাবের আওতায় নিয়ে এসেছে চীনা সামরিক বাহিনী। ভারত মহাসাগরজুড়ে কয়েক ডজন নৌবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। চীনের দাবি, এটি সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথভাবে লাভবান হওয়ার নতুন এক মডেল।
অবস্থানগত কারণেই দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্ব বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক পরিম-লে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়ার সামগ্রিক ব্যবসাবাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি এ সাগর পথেই সম্পাদিত হয়ে থাকে। পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থের বাণিজ্য যে পথে হয়ে থাকে, সেখানে সামান্যতম বিরোধ বা উত্তেজনা সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করাটাই স্বাভাবিক। বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর প্রবহমান, সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা প্রণালী থেকে তাইওয়ান প্রণালী পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের এক বিরাট এলাকা নিয়ে যার ব্যাপ্তি।
দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের প্রশ্নে বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে। মতবিরোধের মূল কারণ দক্ষিণ চীন সাগরের ৮০ শতাংশের ওপর চীন তার সার্বভৌমত্ব দাবি করছে, যা উপকূলবর্তী অন্য দেশগুলোর জন্য উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জাপান দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। জাপানের পরাজয়ের পর ১৯৪৩ ও ১৯৪৫ সালের কায়রো ও পটসডাম ঘোষণার মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোয় প্রজাতন্ত্রী চীনের অধিকার স্বীকৃত হয়। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫৯ দ্বীপ, ক্ষুদ্রদ্বীপ ও বালুচর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের আওতাধীন করে নেয়। কোনো পক্ষ থেকেই কোনো বিরোধিতার বাক্য উচ্চারিত হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় থেকে আজ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলি দক্ষিণ চীন সাগরকে বর্তমান দুনিয়ার উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধের সূত্রপাত, গত শতাব্দীর ষাটের দশকে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জরিপে দক্ষিণ চীন সাগরের ভূতলে কৌশলগত খনিজের সন্ধান লাভ, যুক্তরাষ্ট্রের এক চীন নীতির স্বীকৃতি নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সাথে ১৯৭৮ সালের চুক্তি, শীতল যুদ্ধ অবসানের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্ব হ্রাস, নতুন শতাব্দীর শুরুতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রাণকেন্দ্র রূপে আবির্ভাব, সর্বোপরি বিশ্ব অর্থনৈতিক মানচিত্রে চীনের বিস্ময়কর উত্থান আর বর্তমানকালে তথা বারাক ওবামার পিভট টু এশিয়া পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনের বদৌলতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন নৌশক্তির ৬০ শতাংশ মোতায়েনের ঘোষণাসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে কৌশলগত গুরুত্ব বা উত্তেজনার শীর্ষে চলে আসে দক্ষিণ চীন সাগর।
চীনকে একঘরে বা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দক্ষিণ চীন সাগরে কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা তথা চীনা তৎপরতাকে প্রতিহত করার মার্কিন কৌশল অকার্যকর বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের অতি ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিরাজমান থাকায় ওয়াশিংটনের চীনের সম্প্রসারণ ঠেকাও নীতির বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।