প্রতিবেদন

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট অনেক দুর্যোগেও প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে দেশ। এতে প্রতি বছর জানমালের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। তাই বর্তমান সরকার প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট Ñ উভয় প্রকারের দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রতিরোধে নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় অগ্নিকা-, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সব সময় সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা মোকাবিলায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কী কী করণীয় সে সবের প্রচার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান করবে। কোনো দুর্যোগ এলে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের করণীয় কী? যেসব নির্দেশনা আছে তার ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। এছাড়া দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সবাইকে নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব নির্দেশ দেন।
জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কোথায় কাজ করেন, কী করেন, সেখানে নিরাপত্তা কতটুকু, নিজের ভেতরে সেই সচেতনতা আছে কি না Ñ এ বিষয়ে নিজেদেরও প্রস্তুতি থাকতে হবে।
দুর্যোগ-দুর্ঘটনা মোকাবিলায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী কী করণীয় তার প্রচার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান করবে। হঠাৎ কোনো দুর্যোগ এলে জাতীয়ভাবে আমাদের করণীয় কী, যেসব নির্দেশ আছে তার ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডার, দাহ্য পদার্থ ব্যবহারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকা-ের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কিছুদিন আগে একটা বহুতল ভবনে আগুন লাগল, সেখানে যে বিষয়টা লক্ষণীয়, সেখানে যারা কর্মরত ছিল, তাদের মধ্যে কোনো সচেতনতা ছিল না। এমনকি সেখানে যে ফায়ার এক্সিট আছে সেটাও তারা জানেন না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ফায়ার এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথে ইন্টেরিয়র সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অথবা সেখানে খালি জায়গায় যত মালপত্র আছে সব ফেলে রাখা হয়। দুর্যোগ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের (ভবন) সঙ্গে সেখানে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে সচেতনতা থাকা প্রয়োজন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, সক্ষমতার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রতি অগ্নিকা-ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ৮০০ বছরের বেশি পুরনো মধ্যযুগীয় স্থাপত্য নটর ডেম ক্যাথেড্রাল ধ্বংস হওয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের ঘনবসতির কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত ঘনবসতির দেশ আমাদের Ñ এটা মাথায় রেখে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈঠকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অগ্নিকা-ের রিপোর্ট পর্যালোচনা এবং বিগত সময়ে এ সংক্রান্ত সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ের চামেলী সভাকক্ষে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের সভা হয়।
বিগত সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় বৈঠকে। এছাড়া সম্প্রতি সংঘটিত অগ্নিকা-ের রিপোর্ট উপস্থাপন, সংশোধিত দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (এসওডি)-২০১৯ উপস্থাপন ও চূড়ান্তকরণ নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রায় দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের সভায় ১৯টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল; এগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় সভায়। এছাড়া ২৫৪ পৃষ্ঠার এসওডি, রাসায়নিক দুর্ঘটনা, অগ্নিদুর্ঘটনা, নগরায়ন দুর্ঘটনা নিয়ে পর্যালোচনা এবং বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে মন্ত্রিসভা সদস্যদের মধ্যে কৃষি, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, রেলপথ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়কমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন নৌপরিবহন, পানিসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বিভিন্ন বাহিনী প্রধান ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিব এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরাও।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সভায় ভূমিকম্প ও নগর-দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। ইতোমধ্যে সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি-২ এর আওতায় সিলেট সীমান্তে সক্রিয় ডাউকি ফল্ট ও টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টের অবস্থান এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও বর্মা প্লেটের সংযোগস্থলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী শহরের মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এই মানচিত্র অনুসরণে নগরে ভূমিকম্প প্রতিরোধক বাড়ি তৈরি করা হলে ঝুঁকি হ্রাস পাবে। এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে কি না সে সম্পর্কে সভায় আলোচনা হয়।