কলাম

নুসরাতদের বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর একটি পদক্ষেপই যথেষ্ট

হারুন অর রশিদ
শিক্ষক নামের কিছু কুলাঙ্গার যেন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। প্রতিদিন ঘটছে দেশের কোনো না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নরপিশাচ যৌনপিপাসুর নোংরা থাবা বসছে নিষ্পাপ ছাত্রীদের ওপর।
উল্লেখ্য, এ ধরনের কিছু ঘটনা জনসমক্ষে এলেও অধিকাংশ ঘটনা পর্দার অন্তরালেই থেকে যায়। গুটিকয়েক শিক্ষক নামধারী কুলাঙ্গার ছাত্রীদের পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেয়া, কখনও বেশি নাম্বার পাইয়ে দেয়া আবার কখনও পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে যৌন হয়রানি করে থাকে; যা পরিবার ও সমাজে মানসম্মান বজায় রাখার স্বার্থে শিক্ষার্থীরা গোপন করে থাকে।
আর জনসমক্ষে প্রকাশিত ছাত্রীর শ্লীলতাহানির কিছু ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা নিলে উল্টো ভিক্টিম পরিবারটিকে মামলা-হামলা এমনকি ভিকটিমকে এসিড নিক্ষেপ ও আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়। যেমনটি হয়েছে ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহানের বেলায়। যে ঘটনায় সারাদেশ আজ শোকার্ত। নুসরাতের সাথে অধ্যক্ষ সিরাজের অশ্লীল আচরণের বর্ণনা যখন ওসি মোয়াজ্জমের কাছে লজ্জায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিল তখন সেই ওসি-ও ঘটে যাওয়া নোংরা কথাগুলো বারবার নুসরাতের মুখ দিয়ে পুনরাবৃত্তি করিয়ে মজা নিচ্ছিল। পরিশেষে ওসি এমনও বলে, যা কিছু হয়েছে এতে তোমার কিছু হয়নি। আমার মনে হয় এসব তোমার সাজানো নাটক। তুমি শান্ত হও। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। এটা কোথাও ফ্লাশ করা হবে না।
সিনেমার সেই খলচরিত্রের মেকি ওসির অভিনয়ও যেন এখানে হার মানে। নুসরাতের ভাইরাল হওয়া হৃদয়বিদারক সাক্ষাৎকারটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এ নোংরা চরিত্রের ওসিরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। ধিক তার দায়িত্ব অবহেলাকে, ধিক সেই সব কুলাঙ্গারকে, যারা একটি মুখোশধারী শয়তানকে বাঁচাতে মানববন্ধন করেছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে নুসরাতের শহিদী মৃত্যু হলেও এ মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি বাংলার ১৭ কোটি মানুষ। তার জীবনের অন্তিম সময়ের বলা কথাগুলো প্রধানমন্ত্রীকেও কাঁদিয়েছে। তার এ সাহসী প্রতিবাদ শিক্ষক নামের কুলাঙ্গারদের জন্য চরম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এদেশ এখনও অনেকটা ব্রিটিশ আইনে চললেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, আপনি ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই করতে পারেন, যা আপনার কর্মের মধ্যে প্রতীয়মান হয়েছে। পবিত্র কোরআনে হত্যা, ধর্ষণ ও মাদক বিক্রেতার বিচার হত্যা। যার প্রয়োগ আরব বিশ্বে রয়েছে।
সম্প্রতি ইরানে রাসূল (সা.)-এর নামে বিষোদ্গার করা ৬ জন লেখককে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মুসলিম দেশ ব্রুনাইয়ে এ আইন চালু হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি আইন চালু করুন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ করুন। তাহলে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধপ্রবণতা খিড়কীর দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবে। না হয় আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যে কারণে দিন দিন মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন। নুসরাতের হত্যাকারী সিরাজকে যদি আজ প্রকাশ্যে গুলি বা ফাঁসি দেয়া হতো তা হলে আগামীতে অন্য কেউ তার মতো আর এত বড় অপকর্ম ঘটানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে সাহস পেতো না। অথচ পুলিশ তাকে আটক করে তার সাথে নতুন দুলামিয়া সুলভ আচরণ করছে, যা বিবেকবান মানুষ সহজে মেনে নিতে পারেনি।
নুসরাত একটি সাহসের নাম। সে তার ডায়েরিতে একটি চিরকুট লিখেছিল, চরিত্রহীন অধ্যক্ষকে শাস্তি পেতেই হবে। তাকে এমন শাস্তি দিব, যা দেখে তার মতো লম্পটরা শুধরে যাবে।
এ প্রতিজ্ঞায় তার যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন নামের পাখিটি জান্নাতে স্থানান্তরিত হলেও জীবনযুদ্ধে প্রতিবাদীদের সারিতে নুসরাত তুমি অনির্বাণ হয়ে থাকবে।
তারপরও দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রশাসন, পুলিশ-র‌্যাব-সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ে অনেক সফল নারীর পদচারণা থাকা সত্ত্বেও কেন অবহেলিত ধর্ষিতা হয়ে আত্মহত্যা করে উচ্ছিষ্টের মতো সমাজ থেকে নিক্ষিপ্ত হবে? আর কত বুকের ধন খালি করা মা-বাবার চোখের পানিতে সিক্ত হবে নুসরাতের মতো হাজারও সমাধি?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট