রাজনীতি

কার্যকর হচ্ছে না তারেক রহমানের নির্দেশনা! ভাঙনের মুখে বিএনপি: দ্বিধাবিভক্ত দলের নেতাকর্মীরা

বিশেষ প্রতিবেদক : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ১ বছরের অধিক সময় ধরে কারাবন্দি। মামলার কারণে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দেশে ফিরতে পারছেন না। দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর আন্তঃকোন্দল ও দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেয়া বিএনপির জন্য অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে খালেদা জিয়া ছাড়া জামায়াতকে জোটে রাখা না রাখা নিয়ে নেতাকর্মীদের মতপার্থক্য, বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদে যাওয়া-না যাওয়া, ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপি আলাদা হওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না বিএনপি। এমনকি লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করতে গিয়েও বেকায়দায় রয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান। জানা যায়, তারেক রহমানের অনেক সিদ্ধান্তও এখন আর কার্যকর হচ্ছে না দলে। তার নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান গত ২৫ এপ্রিল এমপি হিসেবে শপথ নেন। এতে দলের ভেতরে-বাইরে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বিএনপি। কারণ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এরই মধ্যে দলটি শপথ গ্রহণ না করার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে ২৯ এপ্রিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে বিএনপির সকল নির্বাচিত সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পিকার বরাবরে পরবর্তীতে শপথ নেয়ার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। ৩০ এপ্রিলের পর সুবিধাজনক সময়ে বিএনপি মহাসচিব শপথ গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে।
বিএনপি’র নির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত দলের সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। সরকারের সাথে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ইস্যুতে সমঝোতা হয়েছে কি নাÑ এমন এক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
উল্লেখ্য, এর আগে সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের টিকেটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে ‘বেঈমান ও প্রতারক’ বলে অভিহিত করেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া বিএনপির নির্বাচিতরা বলছেন, শপথ নেয়ার বিষয়ে আমরা পজেটিভ। দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা শপথ গ্রহণ করেছি। শপথ গ্রহণের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তারা বলেন, এলাকার জনগণ যারা বিপদের মধ্যে থেকেও ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে চাপ আছে। নির্বাচিতরা মনে করেন শপথ না নিলে এলাকায় যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে যেত। জনগণ ভোট দিয়ে নেতা বানিয়েছে সংসদে তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য। জনগণের দাবি, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার জন্য ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করেছে। তাই তারা শপথ গ্রহণ করেছেন।
তবে বিএনপি মহাসচিব সাংবাদিকদের জানান, বিএনপি জনগণের দল, সেই দল হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ভবিষ্যতেও দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
এদিকে সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচিত এমপি মুকাব্বির খান দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২ এপ্রিল মুকাব্বির খান সংসদে যোগ দিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি উঠেছিল গণফোরামের ভেতর থেকে। এর আগে ৭ মার্চ শপথ নেন গণফোরামের আরেক সংসদ সদস্য সুলতান মো. মনসুর। অবশ্য সেদিনই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এ নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিয়েও বিএনপিতে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। তারা ড. কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেও মত দেন।
অবশ্য অফিসিয়ালি বিএনপি বলছে, দলে কোনো মতানৈক্য নেই, নেই কোনো বিশৃৃঙ্খলা।
উল্লেখ্য, সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শপথ নিতে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বিজয়ী প্রার্থীদের। সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে স্পিকারকে চিঠি না দিলে ৩০ এপ্রিলের পর তাদের আসন শূন্য হয়ে যাবে। পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এসব শূন্য আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান দলীয় এমপিদের শপথ গ্রহণের বিপক্ষে ছিল; কিন্তু দলের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বিশেষ করে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে সমঝোতার ভিত্তিতে শেষ মুহূর্তে বিএনপি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, শেষ মুহূর্তে দলের এমপিদের শপথ গ্রহণ করা Ñ এটিও একটি রাজনৈতিক কৌশল।