প্রতিবেদন

গ্যাসসংকট নিরসনে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকার কারণে বাংলাদেশে গ্যাসসংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তাই সরকার নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার, গ্যাস উত্তোলন ও আমদানি করছে। দেশে বর্তমানে ২৬টি গ্যাসক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকার পরও সঞ্চালন লাইনের অভাবেই হোক, বা উত্তোলন অক্ষমতার কারণেই হোকÑ আবাসিকে গ্যাসসংযোগ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন।
অভিযোগ আছে, সিলিন্ডারে ভরে বিক্রির জন্যই নাকি প্রাকৃতিক গ্যাসের কৃত্রিম সংকটের কথা বলে পাইপলাইনের মাধ্যমে আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
সে যা-ই হোক, চলতি বছরের মধ্যে দেশে গ্যাসসংকট সমাধানে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এজন্য দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউ দেশে এসে কার্যক্রম শুরু করেছে। টার্মিনাল দুটি পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু করলে দেশে আর গ্যাস সংকট থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে। এরমধ্যে একটি টার্মিনাল গত বছরের আগস্ট থেকে এলএনজি সরবরাহ শুরু করেছে। অন্য একটি টার্মিনাল দেশে এসে পৌঁছেছে। শিগগিরই টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহ শুরু করলে দেশে আর গ্যাসের ঘাটতি থাকবে না। দৈনিক পাওয়া যাবে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ভয়াবহ সংকটের মধ্যে ছিল দেশ। বিগত কয়েক বছর কাজ করে বিদ্যুতে একটি সুবিধাজনক স্থান তৈরি করলেও জ্বালানিতে তা করা সম্ভব হয়নি। এরমধ্যে দেশীয় খনি থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি উৎপাদন বৃদ্ধি করেও সংকট সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। দেশে গ্যাসের সংকট থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বিঘœ ঘটছিল। কিন্তু এখন সেই সংকট কেটে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সরকার দেশীয় উৎস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়াতে দেশে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও বন্ধ করে দেয়। ২০১৪ সালের পর গ্যাসচালিত কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদন দেয়া হয়নি। এর আগে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল ওই কেন্দ্রগুলোর কয়েকটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদনে এসেছে।
তবে এখন আবার এলএনজি আমদানি শুরু হওয়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করছে। এরমধ্যে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি জার্মান সিমেন্স এবং চীনের কোম্পানি সিএমসির সঙ্গে যৌথভাবে পায়রাতে দেশের সবচেয়ে বড় ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়টের এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এর বাইরে পিডিবি এবং সামিট পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চুক্তি করেছে। এছাড়া ভারতের রিল্যায়েন্স গ্রুপ বাংলাদেশে এলএনজি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য চুক্তি করেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি বলেছেন, এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বিদ্যুৎ আমদানি করার চেয়ে সাশ্রয় হয়।
সঙ্গত কারণে সরকার এখন আমদানি করা এলএনজির প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
দেশে এলএনজি সরবরাহের পরিমাণ এখন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের উপরে। গত মার্চ মাসে পেট্রোবাংলার দেয়া হিসাব অনুযায়ী গত ১ মার্চ দেশে এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে ৪০৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর পরদিন থেকেই প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে গত ১৪ মার্চ এলএনজির সরবরাহ কিছুটা কম হলেও ৪৮৪ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নামেনি। এছাড়া অন্যসব দিনই ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২৩ মার্চ সর্বোচ্চ ৫৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে।
দেশে আসা দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনালটি মে মাসের প্রথম থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করবেব বলে জানা গেছে। শুরুতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। মে মাসের শেষ বা জুনের শুরু থেকে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন এলএনজি পাওয়া যাবে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন পুরো ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যোগ হলে দেশে গ্যাসের সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।
চট্টগ্রামের চাহিদা প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। কিন্তু চট্টগ্রামের দুই সার কারখানা বন্ধ থাকায় এখন প্রতিদিন চাহিদা ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে, যার পুরোটাই সরবরাহ পাচ্ছে চট্টগ্রাম এলাকা। কিন্তু দেশের অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে জালালাবাদ ও বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে কোনো সংকট নেই। গ্যাসসংকটের বেশিরভাগই রয়েছে মধ্যাঞ্চলের তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের বিতরণ কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এবং দক্ষিণ পশ্চিমে বিতরণকারী সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে সংকট রয়েছে। সামিট এলএনজির দ্বিতীয় টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহ শুরু করলে এসব কোম্পানিগুলো আরও গ্যাস পাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন যে সংকট তা পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে প্রমাণ করেছে। এর আগে যখন এলএনজি আমদানি শুরুর চিন্তা করা হয় তখন মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত যে পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। সঙ্গত কারণে সামিটের সঙ্গে চুক্তি করার পর আরও একটি পাইপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। একবারে এক হাজার মিলিয়ন বা তার বেশি পরিবহন ক্ষমতার লাইন নির্মাণ করা হলে এই সমস্যা হতো না। সঙ্গত কারণে আনোয়ারা-মহেশখালী পাইপলাইন নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামিট এলএনজি টার্মিনালটি পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবে না। জিটিসিএল বলছে আগামী মে মাসের শেষের দিকে তারা পাইপ লাইন নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারবে।
এর বাইরে এলএনজি সরবরাহে সরকারের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে দৈনিক ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট করা হবে। দুটি ভাসমান টার্মিনালের সঙ্গে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির জন্য একটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এর প্রথম ইউনিট নির্মাণ শেষ হবে ২০২৩ সালে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হতে সময় লাগবে আরও সাত বছর। এরপর ২০৩০ সালে উৎপাদনে আসবে দ্বিতীয় ইউনিট, যাতে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বাড়বে।
এছাড়াও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর এলাকাতে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন আরও একটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল উৎপাদনে আসবে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ টার্মিনালটি উৎপাদন শুরু করবে।
সরকার এখন স্থলভাগের পাশাপাশি সাগরেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে। সাগরে গ্যাস পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনায় কাটছাঁট করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।