প্রতিবেদন

তৃতীয় কৌশলগত সংলাপ: সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে আগ্রহী বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য

বিশেষ প্রতিবেদক : স্বল্পোন্নত দেশ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কথা যুক্তরাজ্যের। পরিবর্তিত এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের আন্তঃসম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের মধ্যে ২৪ এপ্রিল কৌশলগত আলোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই তৃতীয়বারের মতো কৌশলগত বৈঠকে বসেছে ঢাকা-লন্ডন।
গত ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি সাইমন ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে উভয় দেশের মধ্যে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইদা মোনা তাসনিম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত দুই বছরের মধ্যে এটি উভয় দেশের মধ্যে তৃতীয় কৌশলগত আলোচনা।’
তাসনিম জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে অংশ নেয়া শহীদুল হক এবং সাইমন ম্যাকডোনাল্ড এবার তৃতীয়বারের মতো আলোচনায় বসেন। তাদের দুইজনের মধ্যে বোঝাপড়া অত্যন্ত ভালো এবং এজন্য একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি সাইমন ম্যাকডোনাল্ডের মধ্যে কৌশলগত আলোচনায় জানানো হয়েছে, বাাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী যুক্তরাজ্য।
বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য তৃতীয় কৌশলগত সংলাপ শেষে এ কথা জানান সফররত ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের পারমানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি বলেন, এবারের সংলাপে আমার নেতৃত্বে ২১ সদস্যের অংশগ্রহণে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত আলোচনায় এবং সম্পর্ক বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্য কতটা মনোযোগী।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এ সংলাপে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারে একমত হয়েছে দুই দেশ। ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সন্ত্রাস দমন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্ক নিবিড় করা, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং শিক্ষা খাতে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারে এ ঐকমত্য হয়।
সংলাপ শেষে সাইমন ম্যাকডোনাল্ড জানান, দুই দেশের সম্পর্কের প্রায় সব বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। সংলাপে ১৭টি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। আমরা সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান, আঞ্চলিক সংযুক্তি ও স্থিতিশীলতার মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ যাতে দেশটির বিশেষ বাণিজ্য অংশীদার থাকে, তা নিয়েও কথা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা ও দক্ষতা, সুশাসন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অংশীদারত্ব, অভিবাসন এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পারস্পরিক স্বার্থের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়টি অধিক গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়।
কমনওয়েলথের সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলংকায় সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদ থেকে নিরপরাধ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও বিশ্বমানবতার পাশে থাকার বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য।
২০১৭ সালে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠকে বসতে কৌশলগত সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য। প্রথম বৈঠক ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ ঢাকায় এবং দ্বিতীয় বৈঠক পরের বছরের ১৫ মার্চ লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়।
এ দিকে ‘যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিত্যাগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক’ শীর্ষক সেমিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাইমন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি বলেন, কূটনীতিকের কাজ হলো পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা। বর্তমানে মানুষ মনে করে কূটনীতি হলো তথ্য রাখা। কিন্তু তথ্য রাখাই কূটনীতি নয়। কূটনীতির জন্য জরুরি হচ্ছে তথ্যের বিশ্লেষণ এবং তথ্যের উপলব্ধি। আর দেশগুলোর সরকারের প্রয়োজন এমন ধরনের বিশেষজ্ঞ, যারা তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ ও উপলব্ধি করতে পারবেন।
সাইমন ম্যাকডোনাল্ড বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, যা ব্রিটিশরাজ দিয়ে শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, তখন অনেক দেশ সময় নিচ্ছিল, অনেকে পরিষ্কার ছিল না আসলে কী হচ্ছে। সে সময় শুরুর দিকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলোর কাতারে যুক্তরাজ্য রয়েছে। আমরা এজন্য গর্বিত। আর বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের কাছে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) তাদের মিলনায়তনে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদসহ অন্যরা অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন মেজর জেনারেল এ কে আবদুর রহমান।
এদিকে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাইমন ম্যাকডোনাল্ড ১৫ থেকে ২০ জন ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান চলাচল, এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বৈঠকে যোগ দেন। দুই পক্ষের আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় প্রাধান্য পায়।
বৈঠকে জানানো হয়, দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি রাজনৈতিক যোগাযোগ। বৈঠকে জরুরি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, গত বছর দুই দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বছরও একই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পরস্পরকে উভয় দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো একটি সাধারণ প্রথা।
ওই কর্মকর্তা বলেন, গত বছর যুক্তরাজ্য ২১ হাজারের বেশি ভিসা দিয়েছে এবং যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ে তার ৭০ শতাংশকে ভিসা দেয়া হয়। অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রশ্নে দুই পক্ষের বোঝাপড়া অত্যন্ত চমৎকার এবং বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে যুক্তরাজ্য সম্মতি দিয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল আইনি সব বিষয় নিষ্পত্তির পর কোনো বাংলাদেশিকে যুক্তরাজ্য ফেরত পাঠাতে পারবে। লন্ডন এটি মেনে নিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পরও বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে চাইলে ভিন্ন একটি পদ্ধতিতে তা পেতে হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানান, আমরা চাই বর্তমান সুবিধা অব্যাহত থাক এবং সেজন্য যদি ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা নিতে হয় সেই বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই। যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্থ করেছে তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখবে।
বৈঠকে আরো জানানো হয়, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে তাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, সামরিক সহযোগিতা, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলংকায় সন্ত্রাসবাদ ঘটনার নিন্দাসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রশ্নে আলোচনা হয় বৈঠকে। এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যায় যুক্তরাজ্যের সহায়তা চায় বাংলাদেশ।