রাজনীতি

দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী আওয়ামী লীগ গঠনে দলের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : টানা তৃতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর হানিমুন পিরিয়ড ১০০ দিন অতিবাহিত করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে দলে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানে নামছে দলটি। ৮ বিভাগে ৮টি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় টিম সারাদেশে সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে দলকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এই শুদ্ধি অভিযান চালাবেন। বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে মাঝি হয়েও নৌকা ডোবানোর সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী-এমপি-বড় বড় নেতাও রেহাই পাবেন না এই শুদ্ধি অভিযানে।
একইসঙ্গে ক্ষমতার মধু খেতে দলে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড, বহিরাগত এবং দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত নেতাদের চিহ্নিত করে সংগঠন পুনর্গঠনের সময় তাদের হটিয়ে জনপ্রিয় নেতাদের সংগঠনের মূল নেতৃত্বে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। আগামী অক্টোবরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় জাতীয় সম্মেলনের আগ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন দলটি। শুধু তৃণমূলই নয়, দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ দলের সহযোগী সংগঠনগুলোকেও দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। এ কারণে আগামী রমজান মাসে স্বল্প পরিসরে এবং ঈদের পর কোমড় বেঁধে সারাদেশে এই শুদ্ধি অভিযানে নামবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, থানা, জেলা ও মহানগরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো সম্মেলনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানো এবং বিতর্কিত নেতাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে হটিয়ে জনপ্রিয় নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে এনে সারাদেশেই দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলবেন ৮ বিভাগের জন্য গঠিত ৮টি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক টিম। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগ পর্যন্ত এই শুদ্ধি অভিযান ধারাবাহিকভাবে চালানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের। আর এসব টিমে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে সারাদেশে দলকে শক্তিশালী ও ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতসহ অন্য কোনো দলের বিতর্কিত নেতারা কোথায় কোথায় অনুপ্রবেশ করেছে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করার জন্য দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে অনুপ্রবেশকারীদের দল থেকে বের করে দেয়া হবে এবং দলের যেসব নেতা এসব বিতর্কিতদের দলে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে যারা দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন তাদের বিষয়েও যাচাই-বাছাই চলছে। যদি সত্যিই কেউ অভিযুক্ত হন, তবে তাকেও দল থেকে কেন বহিষ্কার করা হবে না এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থমকে গেছে রাজনীতি। রাজনৈতিক ময়দান এখন রাজনীতিশূন্য। রাজনীতির মাঠে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধুচন্দ্রিমা যেন কাটছেই না। নির্বাচনের পর থেকে গত ৪ মাস রাজনীতির মাঠে দলটির কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচি ও ঘরোয়া সভা-সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকা-। থমকে রয়েছে সাংগঠনিক কর্মকা-ও।
সারাদেশেই মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেলেও মাঠে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায় দেশের অধিকাংশ স্থানেই আওয়ামী লীগের মুখোমুখি এখন আওয়ামী লীগই। প্রায় প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা শহরেই দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্ব সময়ের ব্যবধানে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সবশেষ অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দলের মধ্যে চরম বিভেদ স্পষ্ট হয়েছে।
তবে সবশেষ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার সুযোগে দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী এবং হাইব্রিড নেতাদের কর্মকা-ে প্রায়শই আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। দেশব্যাপী আলোচিত ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার মূল হোতা জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতার জড়িত থাকার ঘটনায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় ক্ষমতাসীন দলটিকে। টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসায় সারাদেশেই বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দল থেকে অসংখ্য সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগে ভিড়ে নানা অপকর্ম চালাচ্ছে। গত ৪ মাসে সাংগঠনিক কর্মকা- নিষ্ক্রিয় থাকলেও ফেনীর ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসেছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিডদের বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খোঁজ নেয়া শুরু করেছেন তারা। জানা গেছে, দেশব্যাপী শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এদের দল থেকে বের করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।