সাহিত্য

নজরুলের প্রমীলা, প্রমীলার নজরুল

শ্যামল কুমার সরকার
(পূর্ব প্রকাশের পর)
নজরুলের এ সময়কালের কার্যক্রমের পেছনে প্রমীলার অস্তিত্ব অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। ১৩৩১ সালের বৈশাখ মাসের গোড়ায় নজরুল সমস্তিপুরে গেলেন। সেবার তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই গিয়েছিলেন। নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন আশালতাকে ছাড়া তার বাঁচার উপায় নেই। তাইতো তিনি গিরিবালা-প্রমীলাকে নিয়ে কলকাতার কাছাকাছি হাওড়া জেলার বালিতে গিয়ে উঠেন। হাওড়ায় কিছুদিন থাকার পরে নজরুল তার হবু বধু প্রমীলা ও হবু শাশুড়ী গিরিবালা দেবীকে নিয়ে কলকাতার ৬ নম্বর হাজী লেনে একটি বাড়ি ভাড়া নেন এবং ওই বাড়িতেই ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ (২৪ এপ্রিল, ১৯২৪) নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয়।
সে দিনটি ছিল শুক্রবার। বিয়ের সময় নজরুলের বয়স ছিল পঁচিশ আর প্রমীলার ১৬। বিয়ে হয়েছিল পাত্রপাত্রীর বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এবং গিরিবালা দেবীর নৈতিক সমর্থনে। বিবাহের আর্থিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন মিসেস এম রহমান। বিয়েতে দেনমোহর ধার্য ছিল ১ হাজার টাকা। আর বিয়ের সময় নজরুল সাদা চাদরে পাগড়ি তৈরি করে মাথায় পরেছিলেন। নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয়েছিল ‘আহলে-কিতাব’ মতে। কারণ প্রমীলার বয়স ছিল তখন ষোল এবং সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট-১৮৭২ অনুযায়ী আঠারো বছর না হওয়াতে প্রমীলার বিয়ে সম্ভব ছিল না। পাত্রপাত্রীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক কেউই ধর্ম পরিবর্তন করেননি। এতে রক্ষণশীল হিন্দু-মুসলমানরা বেজায় ক্ষেপে গেলেন। মৌলবাদী হিন্দুরা ক্ষেপলেন এ কারণে যে, বিয়েটা হয়েছিল মুসলমানি মতে। আর মৌলবাদী মুসলমানরা ক্ষিপ্ত হলেন প্রমীলার ধর্ম বদল না হওয়াতে। এমন বৈরী পরিস্থিতিতে নজরুল ও প্রমীলার নির্ভরযোগ্য একটি আশ্রয়ের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। ফলে হুগলীর বিপ্লবী-কর্মী হামিদুল হক ও প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের চেষ্টায় প্রমীলা ও গিরিবালাকে নিয়ে হুগলিতে যান নজরুল। কিন্তু হুগলিতে কেউ নজরুলকে বাড়ি ভাড়া দিতে চান না।
উল্লেখ্য, তেইশ বছরের সাহিত্যজীবনে কলকাতায় নজরুলকে সাইত্রিশ বার বাসা বদল করতে হয়েছে। তার একমাত্র ‘অপরাধ’, বিয়ে। পাঠক, পরিস্থিতিটা একবার ভেবে দেখুন।
এরপর হুগলির বিপ্লবী বীরেন ঘোষের দাদা খগেন ঘোষের কাঠঘড়ার বাড়িতে নজরুল পরিবারের থাকার ব্যবস্থা হয়। পরবর্তীতে নজরুল স্ত্রী ও শাশুড়ীকে নিয়ে হামিদুল মোক্তারের বাড়িতে উঠেন। সে বাড়িটি ছিল মোঘলপুরা লেনে। সে বাড়িটিই মূলত প্রমীলার শ^শুরবাড়ি হয়ে ওঠে। আর্থিক অস্বচ্ছলতা সত্বেও হুগলিতে প্রমীলার ঘর-সংসার ভালোই চলছিল। নজরুল প্রমীলা উভয়ে উভয়ের প্রেমে বিহবল ছিলেন। এ সময় লেখা প্রমীলার ‘শঙ্কিতা’ কবিতা (যা সাম্যবাদী পত্রিকার ১৩৩২ বঙ্গাব্দে এবং সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়) হতে তার বৈষ্ণয়ীর ধারার প্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রমীলা লিখেছেন-
কেন আজি প্রাণ মম বেদনায় বিহবল/কেন আজি অকারণ চোখে আসে জল।/সন্ধ্যার সমীরন হু হু করে বয়ে যায়/বয়ে যায় মোর মন করে কেন হায় হায়।/কেন বেদনায় মম বুক আজি কম্পিত/কে জানেগো হিয়া মাঝে কত ব্যথা সঞ্চিত।/বেলা শেষে নীলিমায় চেয়ে আছে অনিমিখ/কে ছড়ালে বিদায়ের সিন্দুর চারিদিক।/কিছুই বুঝিনা হায় কেন প্রাণ ভারাতুর/কে দিলো হৃদয়ে বেঁধে মল্লার-রাগসুর।/মনে হয়, এ নিখিলে কেহ নাই, নাই মোর/তুমি বলো কি সন্ধ্যা, কেহ নাই, নাই তোর।
পাঠককে বলে রাখি উপরোক্ত লাইগুলো পড়ে ভুলেও ভাববেন না যে, প্রমীলা নজরুল বিয়ের পর পরই অতি কষ্টে কথাগুলো লিখেছেন। আদতে প্রমীলা একজন বৈষ্ণবী প্রেমিকা। বৈষ্ণব কাব্যের নায়িকার অষ্ট রুপের একটি হচ্ছে উৎকণ্ঠিতা। আর এ রুপে নায়িকারা উৎসুক হৃদয়ে নায়কের জন্য প্রতীক্ষা করেন। এক্ষেত্রে পরম সুখে থেকেও নায়িকা অভিসারী হয়ে কাল্পনিক বিচ্ছেদ বেদনায় উচ্চ মার্গের প্রেমসুখ উপভোগ করেন। এমনি ধারার প্রমীলার ‘করুণা’ নামের একটি কবিতা ১৩৩২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটির অংশবিশেষ উল্লেখ করা হলো-
সেই ভালো তুমি যাও ফিরে যাও/মোর সুখনিশি হয়েছে ভোর/… /জনমের মতো ভুলে যাও মোরে /সহিব নীরবে যাও দূরে সরে/.. .চিরদিন আমি থাকিব তোমার/কাঁদিবে বেহাগ কণ্ঠে আমার/…চাহিনাকো সুখ, ভিখারীর সম/সেই ভালো তুমি হও কঠোর।
দাম্পত্য জীবনের মান-অভিমানের পাশাপাশি প্রেমিকের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাও এখানে প্রকাশ পেয়েছে। এখানে বৈষ্ণব প্রেমের ‘কলহান্তরিতা’ রূপ প্রকাশ পেয়েছে। এক্ষেত্রে নায়ককে হারিয়ে নায়িকা বড় অভিমানী। আবার আমরা দেখি প্রমীলার প্রতি নজরুলের প্রেম অনেকটাই পূজা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বন্দিদশায় থাকাকালে নজরুল লিখেছেন ‘বিজয়িনি’ কবিতাটি। সেখানে আছে-
হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে !/আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।/… /যত তৃণ তোমার মালায় পরে/আমি বিজয়ী আজ নয়ন-জলে ভেসে।
১৩৩২ বঙ্গাব্দের আশি^নে প্রকাশিত ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি প্রকাশিত। কবিতার বিজয়িনি মনে আশালতা বা প্রমীলা। ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের কবি-রানী কবিতায় নজরুল লিখেছেন-তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।/আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।/…/আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়/আমার আশা বাইরে এলো তোমার হঠাৎ আসায়।
এখানে পরিষ্কার বোঝা যায় প্রমীলার উপর নজরুলের নির্ভরতার মাত্রা। কবির শক্তি ও প্রেরণা প্রমীলা। ১৯২৪ সালে গান্ধীজি হুগলিতে এলে নজরুল বিখ্যাত চরকার গান লিখে তাঁকে মুগ্ধ করেন। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ২৭ জ্যৈষ্ঠ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে তারকেশ^রে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হলে নজরুল তাতে যোগ দেন। এসবের পেছনে প্রমীলার ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে হুগলিতে নজরুল-প্রমীলার প্রথম সন্তান জন্ম লাভ করে। তার নাম রাখা হয়েছিল আযাদ কামাল বা কৃষ্ণ মহম্মদ। পুত্রটি পরিবারে আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসে। কিন্তু এ সুখ বেশিদিন থাকলো না। কিছু দিন পরেই হঠাৎ শিশুপুত্রটি মারা যায়। এতে গোটা পরিবার শোকে-দুঃখে ভেঙে পড়ে। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২৩ ভাদ্র (৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬) নজরুল-প্রমীলার দ্বিতীয় সন্তান বুলবুল কৃষ্ণনগরে জন্ম নেয়। এতে নজরুল পরিবারে আবার খুশির হাওয়া বয়ে যায়। কিন্তু প্রচ- আর্থিক কষ্ট ও কবির একাধিক বই বাজেয়াপ্ত হওয়ায় পারিবারিক পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক হয়ে আসে। বুলবুলের জন্মের দিনই নজরুল কৃষ্ণনগরে ফিরে বর্মন পাবলিশিং হাউসের কর্ণধার ব্রজবিহারী বর্মনকে একটি পত্রে লেখেন-
পরম স্নেহভাজনেষু-
স্নেহের ব্রজ, আজ সকাল ছটায় আমার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে। তোমার বৌদি আপাতত ভালো আছে। টাকার বড্ডো দরকার। যেমন করে পার পঁচিশটি টাকা আজই টেলিগ্রাম করে পাঠাও…
ইতি
তোমার কাজীদা,
অভাবের সংসারে বুলবুল সবাইকে মাতিয়ে রাখতো। এ সুখও নজরুল-প্রমীলার সইলো না। বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ২৪ বৈশাখ (৭ মে, ১৯৩০) কলকাতার বাসায় চার বছরের বুলবুল শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করলো। পুুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। কবি এমতাবস্থায় আকুল কান্নায় গেয়েছেন-
‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়’। এর পরে নজরুল ক্রমাগত বেসামাল হতে লাগলেন। তিনি সূক্ষ্ম দেহে প্রিয়তম পুত্র বুলবুলকে দেখতে চাইলেন। ধ্যান ও যোগ শুরু করলেন। ধ্যানে বুলবুলকে দেখার কথাও বললেন। অসহায়ভাবে নজরুলের পাশে দাঁড়িয়ে প্রমীলা তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। এ সময়টা ছিল প্রমীলার জীবনের নিদারুণ সংকট। কিন্তু তিনি নীরবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তবুও জীবন চলছিল।
এর পরে ঘটলো আর এক ভয়াবহ ঘটনা। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের আগে এক সময়ে প্রমীলার পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিল। নজরুল ব্যাকুল হয়ে গেলেন। ডা. বিধান চন্দ্র রায়, ডা. নরেন ব্রহ্মচারীসহ অনেক বিখ্যাত চিকিৎসকের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। এক পর্যায়ে প্রমীলার দেহের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেল। বিছানায় থাকতে থাকতে তার পিঠে ঘা হয়ে গেল। নজরুলের প্রচেষ্টায় তার উপশম হলো। প্রমীলার চিকিৎসার জন্য নজরুল চার হাজার টাকায় নিজের সকল বইয়ের মেধাসত্ত্ব একজন আইনজীবীর কাছে বন্ধক রাখলেন। স্ত্রীর জন্য কী অসামান্য ভালোবাসা থাকলে কাজটি সম্ভব তা আমরা বুঝতে পারি।
প্রমীলার রোগ নিরাময়ের জন্য নজরুল পাগলের মতো ছুটতে লাগলেন। ভূত প্রেত ও গুনিনে বিশ^াস করতে লাগলেন। খবর পেয়ে বীরভূম জেলার আমোদপুরে গিয়ে নজরুল পুকুরে ডুব দিয়ে প্রমীলার জন্য মাটি তুলে নিয়ে এলেন। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত কবি নজরুল ক্ষতবিক্ষত হতে থাকেন।
১৩৪৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে (৯ জুলাই, ১৯৪২) কলকাতা রেডিও স্টেশনের একটি অনুষ্ঠানে নজরুলের জিহবায় জড়তা দেখা দেয়। এতে প্রমীলার মাথায় বজ্রাঘাত হয়। ডা. ডি এল সরকারের পরামর্শে নজরুলকে বায়ু পরিবর্তনের জন্য মধুপুর নেয়া হলো। দুই পুত্র সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধকে নিয়ে প্রমীলা কবির সাথে মধুপুর গেলেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। অসুস্থ নজরুলকে প্রমীলা একা ছাড়েননি। এই তো প্রেম।
দু’মাস পরে কবিকে কলকাতায় আনা হলো। এক পর্যায়ে কবির বাকশক্তি নষ্ট হয়ে গেল। নজরুলের এই দুঃসহ অবস্থা প্রমীলা সহ্য করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে লুম্বিনী উদ্যানে নজরুলের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। আবার শুরু হলো হোমিওপ্যাথি ও ফকিরি চিকিৎসা। সারারাত জেগে প্রমীলা অসুস্থ নজরুলের সেবা করতেন। গভীর রাতে প্রায়ই প্রমীলাকে বলতে শোনা যেত, ‘এদিকে এসো, বাইরে যেয়ো না। শোনো, শুয়ে পড়ো’। বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রমীলা নজরুলের সেবা করতেন। সবজি-মাছ ছোট ছোট টুকরো করে নিজ হাতে রান্না করে কবিকে খাইয়ে দিতেন। কারণ, এমন খাবারই যে কবির প্রিয়!
শুধু নজরুল নয়, দু’টি কিশোর পুত্রের লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, আদর-আবদার সবই প্রমীলাকে সামলাতে হতো। এর মাঝে ঘটলো প্রমীলার জীবনে আরেক সর্বনাশ। ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার কিছু দিন পরেই প্রমীলার মমতাময়ী মা গিরিবালা দেবী নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কুৎসা সহ্য করতে না পেরে তিনি এমনটি করেন বলে জানা যায়। সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ তাঁদের দিদিমাকে কোথাও খুঁজে পেলেন না।
১৩৫৯ বঙ্গাব্দে কবিকে রাঁচি মানসিক হাসপাতালে নেয়া হলো। ১৩৬০ সালে কবিকে ইউরোপ নেয়া হলে পুত্র কাজী অনিরুদ্ধকে নিয়ে প্রমীলা সাথে গিয়েছেন। টানা দেড় বছর নিজের অসুস্থতা নিয়েও কবির সেবা করেছেন। ফিরে এসে উত্তর কলকাতার টালা পার্ক অঞ্চলে ১৫৬-সি মন্মথ রোডে কবির ঠিকানা হয়েছে।
মানুষের সহ্যক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। প্রমীলার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। শেষের দিকে প্রমীলার শরীরের নি¤œাঞ্চলে অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগলো। দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়ার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়ে তার জীবনের শেষ সাত দিন চলে। অবশেষে ১৩৬৯ বঙ্গাব্দের ১৫ই আষাঢ় (৩০ জুন, ১৯৬২) বিকেল ৫-২০ মিনিটে দীর্ঘ ২৩ বছরের দুঃসহ যন্ত্রণার পর প্রমীলা নজরুল টালা পার্কের বাড়িতেই শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। অবসান ঘটে নজরুল-প্রমীলার দীর্ঘ আটত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের। ছিঁড়ে যায় বীণার একটি তার। প্রমীলার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী চুরুলিয়ায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। প্রমীলার মৃত্যুর পরেই তাঁর জীবন সাথী নজরুলকে নিজ কক্ষে আনমনে কাগজ ছিড়তে দেখা যায়। পরবর্তীতে যখন পুত্র সব্যসাচী নজরুলকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন তখন নজরুল বার বার পেছনে ফিরে শূন্য চৌকির উপর কাকে যেন খুঁজছিলেন। সে দৃশ্য দেখে কবির পুত্রবধু কল্যাণী কাজীসহ অন্যরা চোখের জল রোধ করতে পারেননি।
১৩৭৯ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে/ ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার যামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেয়া কবি ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র (২৯ আগষ্ট, ১৯৭৬) ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। কবিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সমাহিত করা হয়। কবিপুত্র সব্যসাচী কবির সমাধিস্থল হতে এক মুঠো মাটি চুরুলিয়ায় প্রমীলা নজরুলের সমাধির পাশে প্রোথিত করেন। দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে প্রমীলা-নজরুল আবার পাশাপাশি থাকতে শুরু করেন।
সম্প্রতি (২১ মার্চ-২৮ মার্চ) নজরুলের চুরুলিয়ায় দেখে এলাম প্রমীলা নজরুল নির্জনে গ্রামের শান্ত পরিবেশে ঘুমন্ত। নজরুলও সেখানে আছেন। উনারা এখন আর দেহধারী নন। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশে^র বাংলাভাষীদের মনে নজরুল-প্রমীলা আছেন, থাকবেন। প্রেম-দ্রোহ-বিদ্রোহের কথা এলেই নজরুল প্রমীলা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।
নজরুল-প্রমীলা নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা চলছে এবং তা চলতেই থাকবে। নজরুলকে নিয়ে লিখতে গেলে প্রমীলা থাকবেই। একই কথা প্রমীলার ক্ষেত্রেও। কারণ, নজরুল আর প্রমীলা ভিন্ন সত্তার হলেও একে অপরের জন্য অত্যাবশ্যক। কাজেই এ জুটির একজনকে নিয়ে গবেষণা করতে গেলে অন্যজনকেও টানতে হবে। অন্যথায় মূল্যায়ন হবে অপূর্ণাঙ্গ। এ নিবন্ধের মাধ্যমে সে চেষ্টাই করা হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ^াস, নজরুল ছিলেন প্রমীলার আর প্রমীলা নজরুলের। চিন্তার ভার পাঠকের উপর রইলো। (শেষ)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও
বিভাগীয় প্রধান ইংরেজি বিভাগ
ঝিট্কা খাজা রহমত আলী কলেজ
হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ