রাজনীতি

নতুন রূপে জামায়াত: দলের ভেতরে-বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বিশেষ প্রতিবেদক : মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত বেশ বেকায়দায় রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতার ফাঁসি হওয়ার পাশাপাশি ইসি কর্তৃক জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর রাজনীতির মাঠে জামায়াতের সরব উপস্থিতি একেবারেই নেই। অনেকেই বলছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের অঘোষিত বিলুপ্তি ঘটেছে। এমনকি আইন করে জামায়াতের রাজনীতি বন্ধ করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দলগতভাবে জামায়াত নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে গত ২৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াত। যদিও জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ স্লোগানে জামায়াতের সংস্কারপন্থিরা নতুন দল গড়ার ঘোষণায় বলেন, নতুন দলের সাথে জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কোনোরূপ সম্পর্ক নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরোক্ষভাবে এ প্রক্রিয়ার সাথে অনেকে থাকলেও আপাতত সামনে দেখা যাচ্ছে মূল দল থেকে সদ্যবহিষ্কৃত জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শুরার সাবেক সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকে। জামায়াতের যেসব নেতা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে চান না, তারা ও তাদের অনুসারীরা নতুন এ দলে থাকছেন বলে জানা গেছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারণীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সংস্কারপন্থিদের যোগাযোগও রয়েছে।
জামায়াতের মূল দলটির নেতৃত্বের একটা অংশ এ ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে। প্রায় ৯ বছর আগে অনেকটা একই রকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তিনি ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর কারাগার থেকে দেয়া এক চিঠিতে প্রস্তাব করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন দায়িত্বশীলদের হাতে জামায়াতকে যেন ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি একাধিক বিকল্পের মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতের নামও পরিবর্তনেরও পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে মতিউর রহমান নিজামীর পরিবারসহ তখনকার জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাধার কারণে সেটা আর এগোয়নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলের তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশ নতুন করে ওই প্রস্তাব ও আলোচনা সামনে এনেছে।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য সম্প্রতি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয়। দলের তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে সভায় একাত্তরের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত নামক দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে দলকে নিয়োজিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা মজলিশে শুরায় অনুমোদন পায়নি।
সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে যারা ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাদের অনেকের বিবেচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য জামায়াতের ভুল স্বীকার করা উচিত। এই অংশটি মনে করে, একাত্তরে যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থাকার পরও তাদের ভুলের দায় আর বহন না করাই উত্তম। তারা মনে করেন, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের ব্যাপক বিজয়ের পর দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক একাত্তরের মূল্যায়ন ও ভুল স্বীকার করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার যে প্রস্তাব তুলেছিলেন, তা করা হলে আজ জামায়াতকে এত বড় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখে পড়তে হতো না। তখন জামায়াতের অন্য দুই প্রভাবশালী নেতা কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীও এ মতের অনুসারী ছিলেন।
দলের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানায়, মূলত দলে এই চিন্তার অনুসারী নেতা ও সমর্থকদের বড় একটি অংশ একাত্তরের মূল্যায়ন সম্পন্ন করে জামায়াতে ইসলামীকে বিলুপ্ত করে দিয়ে নতুন দল গঠনের পক্ষে। তারা মনে করেন, এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জামায়াতকে বিলুপ্ত করার পর নতুন একটি গণতন্ত্র অভিমুখী দল গঠন করে রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে অনেকেই জামায়াত ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। একদিকে সরকারের নির্মম নির্যাতন, অন্যদিকে দলে গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে বিকল্প চিন্তা করছেন। অনেকেই সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সংস্কারপন্থিদের কার্যক্রম সফল হলে জামায়াতের অনেকেই তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে যোগ দেবেন বলে জানা যায়।
এদিকে সংস্কারপন্থিদের এ উদ্যোগে মূল দলের বা ছাত্রশিবিরের কেউ যেন অংশ না নেন, সে জন্য ডা. শফিকুর রহমান দেশে ও দেশের বাইরে গিয়ে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সম্প্রতি দল বিলুপ্ত করার প্রস্তাব আলোচনায় এলে মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে নাদিমুর রহমান তালহা এটাকে ‘বেইমানি’ বলে মন্তব্য করেন। গত ১৭ জানুয়ারি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, ‘…নিছক শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং শত্রুকে খুশি করার জন্য তার নিজের রক্ত দিয়ে গড়া ঘরটি ভেঙে দেয়া কোনো বিবেকবান ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।’
জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বলছেন, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মুখে দলটির নেতাকর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছেন। শীর্ষ নেতাদের অনেকের ফাঁসি হয়েছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। এ সময় অসংখ্য নেতাকর্মী হতাহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত নেতাকর্মীরা কয়েক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
তবে জামায়াতের সংস্কারপন্থিদের এ নতুন উদ্যোগের সঙ্গে অনেকে থাকলেও আপাতত তারা নেপথ্যে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। সামনে থাকছেন জামায়াতে ইসলামী থেকে সদ্যবহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, কিন্তু কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করব না। আমরা যে রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছি তা হবে ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য এবং উন্মুক্ত একটি প্লাটফরম।
জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সংস্কারপন্থিদের মূল টার্গেট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম। সেক্ষেত্রে শিবিরের মেধাবী এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এমন তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়াও স্বনামধন্য চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ রাজনৈতিক দলটি তারা গঠন করতে চাচ্ছেন।
নতুন রাজনৈতিক দল গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও মনোভাবের প্রতিফলন ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
এদিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা যেন সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে কোনোরূপ যোগাযোগ না করেন, সে জন্য জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি অংশ কাজ করছে। ইতোমধ্যে তিনি সৌদি আরব, মালয়েশিয়া সফর শেষে এখন লন্ডন সফর করছেন।
দলের সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে সম্প্রতি জামায়াতে বিরোধ প্রকাশ্যে দেখা দেয়। যার রেশ ধরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। একই বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হন মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনের কাজ শুরু করলেও আবদুর রাজ্জাক এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না থাকার কথা বলেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকসহ দলের অনেকেরই সম্পৃক্ততা আছে।
এ অবস্থায় দেশের মধ্যে নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন জামায়াতের শফিক অনুসারীরা। জামায়াত নেতারা জানান, ইতোমধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলের জামায়াত-শিবিরের নানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ডেকে আলাদাভাবে কথা বলেছেন, কাজ না হলে ধমকও দিয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ সবকিছু উপেক্ষা করে সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সংস্কারপন্থি এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, জামায়াতের বর্তমান কমিটি গঠনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ উত্তরাঞ্চলের শিবির নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে করে জামায়াত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ এসব নেতার বড় একটি অংশই সংস্কারপন্থিদের দলে যোগ দেবেন বলে তাদের কথা দিয়েছেন। অনেকে ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছেন।
এদিকে নতুন নামে জামায়াতের একাংশের আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, খোলস পাল্টে নতুন নামে এলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।
গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরে জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন নেতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন হানিফ। তিনি বলেন, ‘যে নামেই হোক, তারা (জামায়াত ইসলামী) খোলস পাল্টিয়ে অন্য কোনো নাম দিয়েও যদি রাজনীতি করতে চায়, এটাও আমি মনে করি তাদের কোনো নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না।’
এর কারণ হিসেবে হানিফ বলেন, ‘দুটি বিষয় খুব পরিষ্কার তাদের সামনে। এখনো যে একাত্তর সালে জামায়াতে ইসলামী তাদের এই অপকর্মের জন্য আজ পর্যন্ত তারা দলীয়ভাবে তাদের অপরাধের দায় স্বীকার করেনি, ক্ষমা প্রার্থনাও করে নাই।’
অবশ্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতের নতুন মেরুকরণের বিষয়ে এ মুহূর্তে কেউই কোনো কথা বলতে রাজি হননি বিএনপি নেতারা।
তবে বিএনপিসহ জামায়াতের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা জামায়াতের রাজনীতিতে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা যায়। যদিও জামায়াতের নবীন-প্রবীণ নেতাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম দলের যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে রাজি নয়, বরং এ ইস্যুতে তারা জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে নতুন রূপে রাজনীতি করার পক্ষে। দেশের সাধারণ মানুষও জামায়াতের নতুন ধারার রাজনীতির পক্ষেই কথা বলছেন। যদিও জামায়াতের প্রবীণ রাজনীতিকদের অনেকে এখনও পুরাতন ধ্যান-ধারণা পোষণ করেই রাজনীতি করতে চান; যা বর্তমান বাস্তবতায় একেবারেই অচল।