প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

আমেরিকা প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য দৃষ্টান্ত : নিজ জন্মস্থান কুমিল্লায় শিক্ষার আলো জ্বালাতে তৈরি করেছেন মানুষ গড়ার অবিনশ্বর কারখানা

বিশেষ প্রতিবেদক : ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন না সবাই, সে কারণে ত্যাগের মহিমা অমূল্য এক গুণ। দামি এক সম্পদ, যা টাকার পরিমাপে মাপা যায় না; যদিও টাকাটাই অনেকের কাছে সবকিছু। প্রাণ ছাড়লেও টাকা ছাড়তে চান না। তাইতো কয়েক হাজার বছরের মানবসভ্যতায় ত্যাগের দৃষ্টান্ত খুব বেশি আছে এ কথা বলা যাবে না। স্বার্থপরতায় অন্ধ পৃথিবীতে ত্যাগের কীর্তি স্থাপন করেছেন অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ, যারা পৃথিবীকে দিয়েছেন মানবিক সৌন্দর্য। বাংলাদেশের মোশারফ হোসেন খান চৌধুরী সে রকমই একজন বিরল গুণী মানুষ।
তিনি দেশে থাকেন না, কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। সেখানে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। উপার্জন করেছেন অনেক টাকা, যা দিয়ে অন্য কেউ হলে নিঃসন্দেহে যাপন করতেন বিলাসী জীবন। দেশের কথা ভাবারও প্রসঙ্গ আসতো না। ক’জনই ভাবেন দেশের কথা?
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা। তিনি ভেবেছেন দেশের কথা। নিউইয়র্কে তিনি কখনও ট্যাক্সিক্যাব চালান, কখনও কাজ করেন ফাস্টফুডের দোকানে। এমনকি প্রবাসজীবনের প্রথম দিকে নির্মাণশ্রমিক হিসেবেও কাজ করেছেন। সেই মানুষটি সুদূর বিদেশে থেকেও নিজ দেশের জনমানুষের কল্যাণে কাজ করে স্থাপন করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। দেশে না থাকলেও এখন এলাকাবাসী তাঁকে সবসময় স্মরণ করেন তাঁর সমাজসেবামূলক ধারাবাহিক কর্মকা-ের কারণে। গ্রামের একটি শতবর্ষী বটগাছ ঘিরে তাঁর উদ্যোগ এবং ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে তিনি এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ।
ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া, পরিবেশ রক্ষা ও নানা ধরনের জনহিতকর কাজ করেছেন। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর দৃষ্টান্তমূলক কার্যক্রম দেশ-বিদেশে মানুষের মুখে মুখে। তিনি ১টি-২টি নয়, এলাকায় ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছেন। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, একটি মহিলা কলেজ ও একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা এবং একটি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পড়ালেখার মানও অত্যন্ত ভালো। প্রতি বছরই ভালো ফল করছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই মোশাররফ হোসেন খান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে সেরা ১০টি কলেজের তালিকায় স্থান করে নেয়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর নামে একটি মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২০১৩ সালে এই কলেজটিও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ১০-এর তালিকায় জায়গা করে নেয়।

যেভাবে বেড়ে ওঠেন
১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরী দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী জন্ম নেন। সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে অসাধারণ এক অবস্থান তৈরি করেছেন তাঁর পরিশ্রম, মেধা, সততা ও উদার-মানবিক মনমানসিকতার কারণে। তাঁর পরিবারে অর্থের চাকচিক্য ছিল না। বিপুল সম্পদ অর্জনের জন্য পরিবারের চাপও ছিল না। কারণ বাবা-মা সবসময়ই বলেছেন আদর্শের কথা, সৎভাবে জীবনযাপনের কথা। মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করার কথা। পরিবারের সেই শিক্ষাই পাথেয় করেছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন একজন সৎ ও ধর্মভীরু স্কুলশিক্ষক। প্রয়াত বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। মা ও দাদির নামে গড়েছেন আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। নিজের দুই ছেলেমেয়ের নামে গড়েছেন মুম-রোহান চাইল্ড কেয়ার প্রি-কাডেট কিন্ডারগার্টেন স্কুল।
কিভাবে তিনি গড়লেন একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘শিক্ষক বাবার সংসারে অভাব-অনটন ছিল। একজন শিক্ষকের পক্ষে আর কত টাকাই উপার্জন করা সম্ভব? ভেবেছিলাম অনেক লেখাপড়া করব। উচ্চশিক্ষা অর্জন করবো। কিন্তু অভাব-অনটনের কারণে বেশিদূর পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পারিনি। এই আক্ষেপ সবসময় আমাকে ভাবাতো, কষ্ট দিতো। তখন থেকেই ভেবেছি গরিব-দুঃখী সমাজের পাশে দাঁড়াতে হবে। অভাবগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য কিছু করতেই হবে। এই দর্শন এলাকার শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগ নেয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলা যায়। আমি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারিনি। টাকার অভাবে আমার এলাকার কোনো শিক্ষার্থীর লেখাপড়া যেন ব্যাহত না হয়, সেটাই ছিল আমার প্রত্যয়। কিভাবে কী করা যায় একটা তাড়না ছিল সবসময়। শেষ পর্যন্ত আমার সীমিত সামর্থ্য ও সদিচ্ছার কারণে এলাকাবাসীর জন্য কিছু করতে পেরেছি, এটা আমাকে বড় আনন্দ দেয়। স্বস্তি পাই এই ভেবে যে, কিছু একটা তো করতে পেরেছি। অনেকে বলেন, আপনি অনেক বড় কাজ করেছেন। তাদের আমি বলি, আমার কাছে এটা খুব বড় কাজ এখনও নয়। সামনে আরও পথ চলা বাকি।’

দৃষ্টান্ত স্থাপন করার উদ্যোগ
মোশাররফ হোসেন খান চোধুরী ১৯৭৪ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীকে হারান। ৬ সন্তানকে বুকে নিয়ে মায়ের সংগ্রামী কঠিন পথচলা দেখেছেন। চাচাদের সহায়তায় চলতো কোনো রকমের জীবনযাপন।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৮৩ সালে জীবিকার তাগিদে কাতার যান। সাড়ে ৫ বছর পর বিদেশ থেকে দেশে এসে জনমানুষের কথা চিন্তা করে ১৯৮৮ সালে গ্রামে ঈদগাহ ও কবরস্থান করেন। ১৯৮৯ সালে ধান্যদৌল গ্রামে বাবার নামে আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে সেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। ১৯৯৪ সালে মা ও দাদির নামে আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা গড়ে তোলেন। ৫ বছর পর ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ছাত্রছাত্রী এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। ১০টি বিষয়ে অনার্সসহ ১টি বিষয়ে মাস্টার্স বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। এর পাশাপাশি মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ১৯৯৯ সালেই উপজেলা সদরে আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীর সংখ্যা ৫ শতাধিক।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ২০০২ সালে মুমু-রোহান চাইল্ড কেয়ার প্রি-ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেন নামে একটি স্কুল স্থাপন করেন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী তিন শতাধিক। অসহায় গরিব ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী সেরা টপ টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বরাবরই জায়গা করে নিয়েছিল মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটি। পাসের হারও শতভাগ। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের পর বোর্ড থেকে এ ধরনের কোনো তালিকা এখন আর প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বর্তমানে রেটিং পদ্ধতি না থাকলেও ২০১৮ সালে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পাসের হার শতভাগ। আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজে পাসের হার শতভাগ এবং আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে পাসের হার ৯৮%।
এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষানুরাগী মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, ভালো ফলাফলের কারণে প্রতি বছরই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ হোসেন খান স্বদেশ খবরকে বলেন, শিক্ষার উন্নয়নে ব্যতিক্রম ও ত্যাগী ভূমিকা রাখার পেছনে তাঁর বাবা ও বাবার দাদা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রামে ধান্যদৌল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তার বাবার দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী। স্কুল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বেও ছিলেন। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ১৯৫৭ সালে রাঙামাটির মতো দুর্গম এলাকায় জ্বালিয়েছেন শিক্ষার আলো। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নিজের এলাকা থেকে শিক্ষক নিয়ে সেখানে চাকরি দেন।
শিক্ষার আলো বিলিয়ে তৃপ্তি পান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। তাই সবসময় চেয়েছেন নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কখনই যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে না চলে।
তিনি স্বদেশ খবরকে জানান, অর্থ উপার্জনের বাস্তবতায় বার বার দেশের বাইরে যেতে হলেও সবসময় মন পড়ে থেকেছে দেশে। সন্তানতুল্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পড়ে থাকতো প্রাণ। তবে বিদেশে থেকেও তদারকির অভাব রাখেননি কখনও। তাই তো প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই এমপিওভুক্ত হয়েছে, পেয়েছে সরকারি সকল ধরনের সমর্থন ও সহযোগিতা। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় সবসময় মনোযোগ দিতেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। সমাজের মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালানোর মতো একটি মহৎ উদ্দেশ্য দিনে দিনে এভাবেই সফল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। তাঁর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া। কোনো আর্থিক লাভের আশায় নয়, বরং নিজের সব উপার্জন ঢেলে দিয়েছেন মানুষের কল্যাণে।
স্বদেশ খবর প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে আমেরিকাপ্রবাসী শিক্ষানুরাগী মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী জানান তাঁর নিজ হাতে গড়া ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩টি প্রতিষ্ঠানই সরকারি স্বীকৃতি লাভ করায় সেগুলো এখন সরকারি নিয়মনীতি মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে। তিনি এখন কেবল প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত আছেন। তারপরও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তার মন সবসময় পড়ে থাকে বলে জানান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
আরও নানা উদ্যোগ
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, আরও নানা সমাজসেবামূলক কাজ নিঃস্বার্থভাবে করে যাচ্ছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। কঠোর পরিশ্রম করে জমানো টাকা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, ব্যয় করছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তিনি ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে দান করেন ১ বিঘা জমি, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। নিজ খরচে দুটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। টাকার অভাবে গরিব-ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষাবঞ্চিত না হয়, সে জন্য নিজের নামে ‘মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ফাউন্ডেশন’ গড়ে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছেন প্রতি বছর। গরিব-দুঃখী শিক্ষার্থীদের কাছে এই ফাউন্ডেশন এক বিরাট আশার আলো। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ নাড়া দিয়েছে এলাকার মানুষের মনে। সবাই করছেন তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া এলাকার জনকল্যাণে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অবদান সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপকালে উঠে আসে, দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার জনকল্যাণে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে আমেরিকাপ্রবাসী মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। উদাহরণ দিতে গিয়ে জনৈক হিন্দু ব্যক্তি জানান, অত্যন্ত জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল ব্রাহ্মণপাড়া শ্রী শ্রী কালীমন্দির। উপাসনা ব্যাহত হচ্ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। মন্দির প্রাঙ্গণে একটি প্রাচীন বটগাছ ছিল। প্রায় শতবর্ষী ওই গাছটি ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে মন্দির সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। বেশকয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রাচীন বটগাছ বিক্রির খবর। মোশাররফ সাহেবের দৃষ্টিগোচর হয় এ খবর। দেরি না করে তিনি মন্দির কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে গাছটি ১ লাখ টাকায় কিনে আবার মন্দিরকেই দান করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ উদ্যোগে আনন্দ ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তারা মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ওই মন্দির রক্ষা কমিটির সভাপতি তপন কান্তি দেব বলেন, ‘আমরা এ রকমটা একেবারেই ধারণা করেনি। সবাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। গাছটি এখন মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, এখন এটি বেঁচে থাকবে তার আয়ুষ্কাল অবধি। এলাকার হিন্দুধর্মাবলম্বীরা তাঁর এই নিঃস্বার্থ বদান্যতার কথা সবসময় মনে রাখবেন। গাছটির দিকে তাকিয়ে মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সবাই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কথা মনে করেন। এটা তাঁর এক অনন্য অবদান।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: মানবসেবাই ব্রত
মোশাররফ হোসেন মানবসেবাইকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মূলত বাবার স্কুল গড়ার স্বপ্নকে আমি একে একে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছি। সমাজসেবার এই ব্রত অব্যাহত রাখতে পারলেই স্বস্তি পাবো।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা আরও মানসম্মত করতে চাই। সেটা কিভাবে করা যায় সে লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাথে সমন্বয় করে উদ্ভূত বর্তমান সমস্যার সমাধান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
অন্যদের মতো পারিবারিক ভোগবিলাসে জীবন কাটননি কেন Ñ এমন প্রশ্নে তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘দেখুন, সবাই দান করতে পারেন না। আল্লাহ যার পক্ষে থাকেন, প্রকৃতিও তার পক্ষে থাকে। তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন; তাই এতকিছু করতে সক্ষম হয়েছি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ সবসময় আমার ওপর তাঁর করুণার দৃষ্টি রেখেছেন। আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমি শুকরিয়া আদায় করি। পরিবারের সবাইকেও বলি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তাছাড়া এমন ত্যাগ শুধু আমি নই, বঙ্গবন্ধুও করেছেন, মহাত্মা গান্ধীও অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করেছেন। কাউকে না কাউকে তো ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়, তা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে গড়ে উঠবে। কিভাবে তৈরি আগামীর পৃথিবী?’
বিদেশে পাড়ি জমালেও পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে আরাম-আয়েশের জীবন কাটাতে চাননি মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। স্ত্রী-সন্তানদের দেশে রেখে বিদেশের বুকে মেসের কষ্টকর জীবন পার করেছেন তিনি। উপার্জিত অর্থ জমিয়ে এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছেন। ঢাকা শহরে ১০-২০টি বাড়ি, দামি গাড়ির মালিক হতে পারতেন, বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হতে পারতেন। তা না করে খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। এখনও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ত্যাগের মহিমায় পরিবারের সদস্যদেরও শামিল করেছেন।
তিন দশক ধরে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী নিউইয়র্কে আছেন। মাধ্যমিক পাস করে ১৯৮৩ সালে ২০ বছর বয়সে কাজের সন্ধানে কাতার গিয়েছিলেন। সেখানে সাড়ে ৫ বছরের বেশি সময় করেছেন নির্মাণশ্রমিকের কাজ। ১৯৮৯ সালে নিউইয়র্কে গিয়ে ট্যাক্সিক্যাব চালানো, ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ছোটখাটো কাজ করেছেন জীবিকার প্রয়োজনে। সেখানে নিজেই এখন একটি ফাস্ট ফুডের দোকান চালু করেছেন সম্প্রতি। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান দেশেই থাকে।
স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশে নেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে একা কোনোরকমে মেসে থাকি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গেলে খরচ বেড়ে যেত। তাছাড়া গ্রামে যে কাজগুলো করছি, সেগুলো করা সম্ভব হতো না। আমি সবসময় আমার স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনু এবং দুই সন্তান নওশীন তাবাসসুম খান চৌধুরী ও ফারহান খান চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তারা সকলেই আমার সামাজিক কর্মকা-কে উৎসাহ দিয়ে মানসিকভাবে সমর্থন করে আমাকে সহযোগিতা করে আসছে। ’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর স্কুল-কলেজের কোনো কাজ নিয়ে গেলে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রায় সবাই জেনেছেন, প্রবাসে থেকে অনেক কষ্টের টাকায় তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছেন।
ব্যক্তির সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আমেরিকা প্রবাসী মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কুমিল্লা ৫ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘প্রত্যেক এলাকায় এমন দানশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি থাকলে দেশের চেহারাই পাল্টে যেত।’
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করেন তিনি। শেখ হাসিনার উন্নয়নের একজন সাধারণ যোদ্ধা হিসেবে তিনি করছেন বলে মনে করেন। এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী যেন রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তার জবাব, ‘আপাতত রাজনীতির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো বিলিয়ে মানুষের উপকার করতে চাই। গড়ে তুলতে চাই আরও গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।’

বিরল পদক্ষেপ, মানুষের পাশে সবসময়
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী যে শুধু শিক্ষা বিস্তারে গভীর মনোযোগী তা নন। আরও বহুমুখী কর্মকা-েও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি গাছ লাগাতে ভালোবাসেন। স্কুল-কলেজের আঙিনায় কয়েক হাজার গাছ লাগিয়েছেন, সেগুলো এখন দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের তৈরি করেছে।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি কেউ মারা গেলে লাশ দেশে পাঠানোর বন্দ্যোবস্ত করেন। অসহায়-অসুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে পিছ-পা হন না। বাড়িয়ে দেন সেবার হাত।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তাঁর অগ্রযাত্রায় যাঁরা বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন, নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন। এদের অন্যতম হলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, দাদা জাকির খান চৌধুরী ও সহধর্মিণী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনু।