রাজনীতি

একাদশ সংসদ নির্বাচন বৈধতা দিল বিএনপি: লাভ-ক্ষতির হিসাবনিকাশে দ্বিধাবিভক্ত হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

এম নিজাম উদ্দিন : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ মুহূর্তে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর দীর্ঘ তালবাহানা ও বিচিত্র রাজনৈতিক নাটকের পর অবশেষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা স্বীকার করে নিলো বিএনপি। শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দিলেন দলটির ৫ নেতা।
৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে ভরাডুবির পর ওই দিন রাতেই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচন দাবি করে। এই দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনের কথা বললেও তেমন কোনো কার্যকর কর্মসূচি দিতে পারেনি তারা। অবশ্য নির্বাচন কমিশনে জোটগতভাবে আবেদন ও গণশুনানিসহ কিছু নিরস সাদামাটা দায়সারা গোছের কর্মসূচি পালন করেছে তারা। সুবিধা করতে না পেরে নেতারা ধরণা দেন আন্তর্জাতিক মহলেও। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর নির্বাচনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার সবরকম চেষ্টাই চালান বিএনপি নেতারা। করতে থাকেন একের পর এক অভিযোগ। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। কূটনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলে রায় দেয়। বিএনপি তারপরও তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। দলটির নির্বাচিত ৬ সংসদ সদস্য শপথ নেবেন না বলে দলের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা বরাবরই বলে আসছিলেন। তারা এও বলেছেন, যারা শপথ নেবেন তারা গণদুশমন। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত পর্যায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় পরিস্থিতি ঘটিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে বিএনপির বাকি সবাই শপথ নিলেন। উল্লেখ্য, দলীয় ও ঐক্য ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২ জন সদস্য ইতঃপূর্বে শপথ গ্রহণ করেছে। ফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত ৮ এমপির মধ্যে ৭ জনই এখন সংসদে।
বিএনপি থেকে বলা হচ্ছে, কৗশলের অংশ হিসেবে দলের ৪ এমপি একেবারে শেষ মুহূর্তে শপথ নিয়েছেন। আবার একই কৌশলের অংশ হিসেবে মির্জা ফখরুল শপথ থেকে বিরত থেকেছেন। বিএনপির এই কৌশল নিয়ে প্রশ্নের এখন শেষ নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, একই কৌশলের সম্পূর্ণ বিপরীত দুই যাত্রা হবে কেন? একেবারে শেষ মুহূর্তে শপথ নেয়ার পেছনে কী কৌশলই বা থাকতে পারে?
বলা হচ্ছে, শেষ দিকে কুইক ডিসিশন এসেছে লন্ডন থেকে। অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিকে ডিঙিয়ে একাই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। স্থায়ী কমিটির নেতারা কেউ কিছুই জানতেন না। লন্ডন থেকে হুট করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে শপথের।
স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতাদের উপেক্ষা করে এ রকম ব্যক্তিকেন্দ্রিক চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে এখন রীতিমতো আগুন জ্বলছে বিএনপিতে। শীর্ষ নেতারা যেমন ক্ষুব্ধ-বিরক্ত, আবার তৃণমূলে হতাশার সঙ্গে চরম ক্ষোভ। সবাই বলছেন, দলের এ রকম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত সিনিয়র নেতাদের জন্য অপমানের। সেই সঙ্গে তৃণমূলের প্রত্যাশাও এখানে আমলে নেয়া হয়নি।
শপথ ও সংসদে যাওয়া না যাওয়া প্রশ্নে সিনিয়র নেতা ও তৃণমূলের আশা ছিল, সবাই বসেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। গণতান্ত্রিকভাবে অন্তত এই পদক্ষেপটি নেয়া হবে। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে অবশ্য শপথ নেয়া নিয়ে মিশ্র অবস্থান ছিল। যদিও বেশিরভাগ ছিলেন শপথ নেয়ার পক্ষে। তাদের যুক্তি, অধিবেশনে যোগ দিয়ে এই মুষ্টিমেয় সংসদ সদস্য নিয়েও প্রতিবাদমুখর হওয়া সম্ভব। তাছাড়া জনগণের ভোটে তারা নির্বাচিত। তাদের দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচনী এলাকার জনগণের কথা বলার। সংসদে না গিয়ে তাদের বঞ্চিত করা অগণতান্ত্রিক আচরণের শামিল হবে।
উল্লেখ্য, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনে বিজয়ী কোনো সংসদ সদস্য ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে তার আসন শূন্য হবে। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন গত ৩০ জানুয়ারি শুরু হয়। সেই হিসাবে শপথ না নিলে ৩০ এপ্রিলের পর বিএনপির নির্বাচিত এমপিদের আসন শূন্য হওয়ার কথা। সেই বিধান অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসন ইতোমধ্যে শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন বিএনপির ৫ জন সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ এবং ১ জনের শপথ না নেয়ার কারণে দলের ভেতরে-বাইরে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গত ৩ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দল শপথের সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন শপথ নিলেন না, তা পরবর্তীতে জানতে চাওয়া হবে। এমনিতেই একাদশ সংসদের বৈধতা নিয়ে বিএনপি ও ঐক্য ফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে বরাবরই প্রশ্ন আছে। তাই কখনও শপথের পক্ষে আবার কখনও বিপক্ষে বলেছেন নেতারা। সকাল-বিকেলে একেক রকম কথা বলেছেন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল একবার ঘোষণা দিলেন দলের সিদ্ধান্তে এ শপথগ্রহণ। আবার পরে এও বলেন, তারেক রহমানের নির্দেশে শপথ নেয়া হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গুরুতর অভিযোগ তুলে বললেন, সরকারের চাপে শপথ নিয়েছেন দলের নির্বাচিতরা। তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, দলে হচ্ছেটা কী?
সব মিলিয়ে কে কী বলছেন, কে কী করছেন তার কোনো লাগাম নেই। দলের শৃঙ্খলা বা নিয়ন্ত্রণ বলে কিছুই নেই। শপথগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন এতো তালবাহানা, কেন এতো নাটক Ñ এ নিয়ে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশারও শেষ নেই। আলোচনা-সমালোচনা চলছে সর্বত্র। সৃষ্টি হয়েছে হাস্যরসেরও। কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের দর্শন ফলো করছেন বিএনপি নেতারা। সকাল-বিকেল একেক রকম কথা। একেক রকম সিদ্ধান্ত। অনেকে বলছেন, সিদ্ধান্তহীনতা ও নানান কথা বলে শপথগ্রহণের মতো সিরিয়াস ইস্যুকে বিএনপি ‘দিল্লিকা লাড্ডু’র মতো বানিয়ে ফেলেছে, যা খেলেও পস্তাতে হয়, না খেলেও পস্তাতে হয়।
শপথগ্রহণ নিয়েও রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, শপথ নিলেও রাজনৈতিকভাবে বিপত্তি, আবার শপথ না নিলেও সমস্যা। কারণ এ নির্বাচনকে তারা অবৈধ বলেছিল। অন্যদিকে শপথ না নিলেও বিপত্তি। কারণ শপথ নেয়ার জন্য তৃণমূল ও দলের বিশাল একটি অংশের চাপ রয়েছে। তবে যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, নেতাকর্মীরা চেয়েছিলেন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে গণতান্ত্রিকভাবে। দলের সার্বিক অবস্থা, তৃণমূলের মনোভাব এবং রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সিনিয়র নেতারা বসে একটি সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু সবাইকে উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে বিএনপি এখন আরও গভীর সংকটে পড়ল। একে তো দলের জনসম্পৃক্ততা কমছে, তার ওপর এ রকম ঘুরিয়েপেচিয়ে রাজনীতির কারণে সাংগঠনিক নাজুক অবস্থা আরও তীব্র হলো। দলের অভ্যন্তরে আস্থা-বিশ্বাসের আরেক ধাপ অবনতি হওয়ার কারণে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্যরে সম্পর্কও বিনষ্ট হচ্ছে। এমনিতেই দলের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্বশূন্যতার কারণে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির ঐক্য ফ্রন্টে যোগদান এবং নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে ঐক্য ফ্রন্ট তথা ড. কামাল হোসেনের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নয় বিএনপির বিরাট একটি অংশ। তারা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট থেকে বিএনপিকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রবল চাপ দিচ্ছে। তাদের মতে, ঐক্য ফ্রন্টে যোগ দেয়ার কারণে ব্যক্তি ও নামসর্বস্ব দলগুলো রাজনীতিতে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে, অন্যদিকে গুরুত্ব হারাচ্ছে বিএনপি ও দলের নেতৃত্ব।

ইউটার্নের রহস্য কী
নাটকীয়ভাবে ইউটার্ন নিয়ে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শপথ নিয়েছেন বিএনপির এমপিরা। সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে আগের কঠোর অবস্থানে থেকে তারা তড়িঘড়ি করে কেন সরে এলেন, উঠছে সে প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় বিএনপির সিনিয়র নেতারা ইতোমধ্যে তৃণমূলের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে রাজনৈতিক মহলে। সামনে আসছে বেশ কয়েকটি বিষয়। ১. যেকোনো মূল্যে দলের ভাঙন ঠেকানো। ২. দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোল অথবা জামিনে মুক্ত করার ইস্যু। ৩. নির্বাচিতদের শপথগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে না পেরে আনুষ্ঠানিকভাবেই শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার আইওয়াশ।

হুমকি, বহিষ্কার, শেষ চেষ্টা,
নাটক কত কিছু
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয় ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিনই ভোটগ্রহণ নিয়ে নানা অভিযোগ তোলেন বিএনপি নেতারা। কারচুপি, হামলা-মামলা অভিযোগের শেষ ছিল না। নির্বাচনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকেও ২ জন নির্বাচিত হন। এদের একজন গণফোরাম নেতা মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। শপথ গ্রহণ করে তিনি অবশ্য বলেছেন, ‘আমি আগেও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে ছিলাম এখনও আওয়ামী লীগেই আছি।’ আরেক সংসদ সদস্য গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খান তাকে অনুসরণ করে গত ২ এপ্রিল শপথ নেন। বলা হয়ে থাকে যে, সিলেট-২ আসনে দলের কোনো বৈধ প্রার্থী না থাকার কারণে বিএনপি গণফোরামের মোকাব্বির খানকে সমর্থন দেয়ার ফলে তিনি অতি সহজে ওই আসন থেকে জয়লাভ করতে সমর্থ হন।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং দল ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতরা শপথ নেবেন না বলে ঘোষণা দেন। যদি কেউ এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। কার্যত দল ও জোটের ওই হুঁশিয়ারিতে কাজ হয়নি।
উল্লেখ্য, গণফোরামের নির্বাচিত ও শপথগ্রহণকারী দুইজনকেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এর আগে গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন শপথ নেয়ার পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। জোটভুক্ত ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামের দুইজন শপথ নেয়ার বিষয়টি বিএনপি ভালোভাবে নেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগও করে বিএনপি। তবে শরিক দলের দুই নেতা শপথ নেয়ার পর দলের ৬ এমপির শপথ নেয়া না নেয়া নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় বিএনপির সামনে। হুঁশিয়ারি-হুংকার অব্যাহত থাকে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা অর্থাৎ বহিষ্কার করা হবে সব ধরনের পদ থেকে। কিন্তু সকল প্রকার হুমকি ও ভয়ভীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান শপথ গ্রহণ করেন। তাকে ২৭ এপ্রিল বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। বাকিরা শপথ নিলে একই পরিণতি হবে জানিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দেয়া হয়। তারপরও পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়া শুরু করে। কিন্তু ২৯ এপ্রিল রাজনৈতিক মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় নাটকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যাতে দৃশ্যমান হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে বাকি ৪ জন শপথ গ্রহণের জন্য হাজির হন সংসদ ভবনে। স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী তাদের শপথ পাঠ করান। শপথ নেন বিএনপির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুন অর রশীদ, বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আব্দুস সাত্তার ভুঁইয়া। তারা দ্রুত অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তব্যও দেন। দাবি জানান, খালেদা জিয়ার মুক্তির। দলের নেতাকর্মী, সমর্থক সবাই হতভম্ব। সবারই জিজ্ঞাসা, শপথই যখন নেয়া হবে তাহলে এতো নাটক কেন? আবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ থেকে বাইরে থাকলেন কেন?

নেতাদের কত কথা কত নাটক
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ডেডলাইন ছিল গত ৩০ এপ্রিল। ওই দিনের মধ্যে শপথ না নিলে শূন্য ঘোষণা করা হবে সংসদীয় আসন Ñ এমন পরিস্থিতিতেই ২৯ এপ্রিল সকালে বিএনপির ৪ জন সংসদ সদস্যের শপথ নেয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদ সম্মেলন ডেকে দৃঢ়তার সঙ্গেই জানান আগের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা। তিনি বলেন, শপথ নেয়ার জন্য তাদের বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে। তবে শপথ নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি খোদ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুপুরে এক আলোচনা সভায় বলেন, এই সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার নয়। তাই শপথ না নেয়ার আগের সিদ্ধান্তেই বিএনপি অটল আছে। কিন্তু বিকেলে এমপি হারুন-অর রশীদ দাবি করেন, তারেক রহমানের সম্মতিতেই তারা শপথ নিয়েছেন। রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি এবার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে বলেন, তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। তিনি এও বলেন, শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত দলের।
দলের নাকি তারেকের সিদ্ধান্ত, সেটা নিয়েই এখন চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বিএনপিতে।

শপথ ঠেকানোর শেষ চেষ্টা
খালেদার মুক্তির শর্ত!
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, শপথ ঠেকানোর সব চেষ্টাই করা হয়েছিল বিএনপির পক্ষ থেকে। ২৮ এপ্রিল এক বৈঠকে লন্ডন থেকে তারেক রহমান স্কাইপের মাধ্যমে অংশ নেন। আপ্রাণ চেষ্টা চালান শপথ ঠেকানোর। ৪ এমপিকে ওয়াদা করানোরও চেষ্টা করা হয়, যেন তারা শপথ না নেন। স্থায়ী কমিটির নেতারা ওই বৈঠকে অংশ নেন, শপথ না নেয়ার ব্যাপার কয়েকজন মতামত তুলে ধরেন। কিন্তু ২৯ এপ্রিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৪ এমপির সঙ্গে বারবার কথা বলেও তাদের শপথ না নেয়ার অঙ্গীকার করানো যায়নি। তারেক রহমানের সঙ্গে ১ জন এমপি বাগবিত-ায়ও জড়িয়ে পড়েন। ওই নেতা তারেককে জানান, শপথ নেয়ার বিষয়ে এলাকার লোকজনের চাপ রয়েছে। তারপরও তারেক রহমান অনড় ছিলেন। পরে এক এমপির বাসায় গোপন বৈঠক করে ৪ এমপি শপথ নিতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তারেক রহমান এ তথ্য জানার পর নিশ্চিত হন, ৪ জনকে বাধা দিলেও শপথ ঠেকানো যাবে না। তাছাড়া এমপিদের কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়ার প্যারোল বা জামিনে মুক্তির বিষয়ে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। সংসদেও মুক্তির দাবি তুলতে পারবেন তারা। তখন তিনি শপথ নেয়ার বিষয়ে সম্মতি দেন।
একটি সূত্র বলছে, বিএনপির পক্ষ থেকে শপথের বিনিময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি তোলা হয়েছিল। শপথের আগে খালেদা জিয়ার জামিন নিশ্চিতের কথাও বলা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সাড়া দেয়া হয়নি। কারণ, শপথের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে নীতিনির্ধারক মহল মনে করেন।

সিনিয়র নেতারা ক্ষুব্ধ,
দ্বিধাবিভক্তির আগুন
নাটকীয় কা- ঘটিয়ে দলীয় এমপিদের শপথ নেয়া নিয়ে বিএনপিতে ক্ষোভ ও দ্বিধাবিভক্তি চরমে পৌঁছেছে। নেতাকর্মীদের বড় অংশই হতাশ। তবে তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের কথা বলায় প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলার সাহস করছেন না। কী বললে কি না হবে, অনেকেই আছেন ভয় ও শঙ্কায়। একক সিদ্ধান্তে এতো বড় পদক্ষেপ নেয়ায় সিনিয়র নেতারা ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারা ছিলেন পুরোপুরি অন্ধকারে। কাউকে কিছু না জানিয়ে তড়িঘড়ি তারেক রহমান একক সিদ্ধান্ত দেন। রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘোষণা দেয়ার জন্য সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে। কিন্তু ফখরুল ছাড়া কেউই ছিলেন না।
বিএনপির প্রভাবশালী নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘দলীয় সংসদ সদস্যদের শপথের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নই বলার সুযোগ নেই। উনার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে, একমত নই বলার সুযোগ নেই।’ ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান শপথ নেয়ায় গয়েশ্বর তাকে গণদুশমন বলেছিলেন। তিনি এখন বলছেন, ‘শপথ নেয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে। এই প্রশ্নের উত্তর কী হবে, তা তো যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা বলবেন, তারা পরিষ্কার করবেন। সবকিছুরই একটা প্রশ্ন তৈরি হয়।’
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘আমি সংসদীয় রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান এবং শপথ নেয়ার কারণে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খানকে বেঈমান বলা এবং বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদকে দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদে যোগ দেয়ার ঘটনা দেশবাসী খারাপভাবে নেবে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এটার নামই বিএনপি। উপর থেকে সিদ্ধান্ত আসবে, কেউ কিছু জানবে না।’
বিএনপির সংসদে যাওয়াকে ভুল পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘বিএনপি ভুল পদ্ধতিতে সংসদে গেল। দলটির উচিত ছিল, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে একটি সংলাপে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী ডাকতে রাজি না হলেও বিএনপির যাওয়া উচিত ছিল। সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যেই আলোচনা করা দরকার ছিল। তার বিষয়ে প্রকাশ্যেই একটি ফয়সালা করা উচিত ছিল। কিন্তু বিএনপি সেটি করেনি। আর আমি সব সময়ই সংসদে যাওয়ার পক্ষে ছিলাম। কিন্তু জনমনে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অবশ্যই নয়।’

তৃণমূলে হতাশা
শপথগ্রহণের পর সরেজমিনে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা। তারা হতাশ-হতভম্ব। নেতাকর্মীর সংখ্যাও অন্য দিনের তুলনায় ছিল কম। ক্ষোভ প্রকাশ করে ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘আর কোনো কথাই বলব না। কর্মসূচিতেও যাব না।’ আরেক নেতা বলেন, ‘আমরা এখন কোন মুখ নিয়ে কথা বলব। এভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আত্মঘাতী হতে পারে। সব সিদ্ধান্ত আলোচনা করে নেয়া উচিত। আর বলা যাবে না সরকার ও সংসদ অবৈধ।’
তৃণমূলের হতাশা প্রসঙ্গে সিনিয়র এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘তাদের হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। ৩০ ডিসেম্বর ভোটের পর থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল এই সংসদে যোগ না দেয়ার। সরকারকে বৈধতা দেবে না বিএনপি। আমরা বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছিলাম। এখন আমরা কী বলব?’ বিএনপির আরেক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘সারাদেশের নেতাকর্মীদের মন খারাপ হওয়ারই কথা। এতবার সিদ্ধান্ত পাল্টালে এরশাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য থাকল কই?’

ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের শরিকরা ক্ষুব্ধ
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে নিয়ে গঠন করা হয় নতুন রাজনৈতিক মোর্চা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এই ফ্রন্ট থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছিল ৩০০ আসনে। মাত্র ৮টি আসন পায় ঐক্যফ্রন্ট Ñ ৬টি বিএনপি আর দুটি গণফোরাম। গণফোরাম গঠনের পর এবার প্রথম দলটি সংসদে আসন পায়। নির্বাচনে ভরাডুবি হলেও ঐক্যফ্রন্ট অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু শপথগ্রহণ ইস্যুতে দলীয় ও জোটগত সম্পর্কে ফাটল ধরেছে।
বিএনপি ও গণফোরামের ওপর চরম ক্ষুব্ধ অন্য দলগুলোর নেতারা। আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহামুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে চলছে অভিমান পর্ব। শপথ ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে ছিলেন শরিক দলের নেতারা। আ স ম রব, মান্নাসহ অনেকেই এ নিয়ে বারবার কথা বলেছেন। তাদের কিছু না জানিয়ে শপথের সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে তারাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইতোমধ্যে একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বক্তব্যও দিয়েছেন। ক্ষুব্ধ হয়েছেন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারাও। জোটের প্রধান সমন্বয়ক এলডিপি সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ (অব.) বিএনপির উদ্দেশে বেঈমানি না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতেই এক অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানতে চান, ‘যদি সমঝোতা হয় তা হলে সেই সমঝোতাটার বিষয়টি খোলাখুলি বলেন, কী সমঝোতা হয়েছে?’ ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিএনপি ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়েছে, এটা এলডিপি জানে না। ২০ দলীয় জোটেরও কেউ জানেন না। আমরাও হতাশ। এভাবে জোট চলতে পারে না।’

লাভ-ক্ষতির হিসাবনিকাশে দ্বিধাবিভক্ত হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী
দলের সমর্থক ও নেতাকর্মীরা মনে করেন, এখনও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। তারা মনে করেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন, দলীয় সরকারের ওপর আস্থা রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে যোগদান এবং সর্বশেষ নির্বাচিত এমপিদের শপথগ্রহণের নাটকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ Ñ কোনোটাই সঠিক ও যথাযথ হয়নি। এতে জোট ও দলের নেতাকর্মীরা বেশ হতাশ-ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিশেষ করে এবারের নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল গ্রহণ বা বর্জন ইস্যুতেও বিএনপির বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, এতে বিএনপির লাভ হয়েছে, নাকি ক্ষতি হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। তারা দলের বৃহত্তর স্বার্থেই দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিপরীতে বিএনপির লাভের হিসাব বা পরিমাণটা জানতে চান।