প্রতিবেদন

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম উইংয়ের কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও শ্রমজীবী মানুষকে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক : সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম উইংয়ের কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ’ করার অভিযোগ করেছেন সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ। তাকে দ্রুত কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহানের কাছে চিঠি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ঘটনার ৪ মাস পার হলেও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন আমিনুল ইসলাম। অথচ তার বিরুদ্ধে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম ও সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ। তারপরও সরকারের সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ডেস্কের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে আমিনুল চালিয়ে যাচ্ছে তার অপকর্ম। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে নিয়মিত ওই সব কর্মকর্তার বাসায় উপঢৌকন পাঠায় আমিনুল।
তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান বলেছেন, ‘জেদ্দার শ্রম কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। তার সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাকে শো’কজ করা হয়েছে। তাকে প্রত্যাহার করার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।’
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ জেদ্দা কনস্যুলেটে কর্মরত শ্রম কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে দেশে ফেরত নেয়ার জন্য আধাসরকারি পত্র দেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। ওই চিঠিতে বলা হয়, সৌদি আরবে বর্তমানে ২১ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি গৃহকর্মী হিসেবে দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন। সৌদি আরবে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে সেবা প্রদানের জন্য শ্রম উইংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এ পরিপ্রেক্ষিতে দূতাবাস ও জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম উইংয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের অত্যন্ত দায়িত্বশীল থেকে বাংলাদেশ কমিউনিটির সমস্যাগুলো সমাধানে তৎপর থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রদূত চিঠিতে আরো উল্লেখ করেন, কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গত কিছুদিন ধরে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম উইংয়ে কর্মরত কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের নামে বাংলাদেশ কমিউনিটির অনেকেই বিভিন্ন অভিযোগ করছেন। কনস্যুলেটে সেবা গ্রহণ করতে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীরা কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের নিকট থেকে দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল এফ এম বোরহান উদ্দীন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। সেই সাথে অন্য কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের আচরণের কারণে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। এতে শ্রম উইংয়ের নিয়মিত কাজকর্ম অনেকটা স্লথ হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সহজে দ্রুত সেবা প্রদানে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট বদ্ধপরিকর। এ ছাড়া সব পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা শোনা ও সমস্যার কার্যকর সমাধান প্রদানের পাশাপাশি তাদের সাথে ভালো আচরণ করা অপরিহার্য। তাই দ্রুত কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে তার পরিবর্তে একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে চিঠিতে রাষ্ট্রদূত অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠির অনুলিপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হক ও মহাপরিচালক (পশ্চিম এশিয়া) মো. আমিনুল হকের কাছে দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া শ্রম কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে পারফরমেন্স অডিট অধিদপ্তর। ২০১৭ সালের জুলাই হতে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে সোফা, কিচেন টেবিল, ওয়াশিং মেশিন ও হটনটি কেনাকাটায় প্রায় ১২ লাখ টাকা নয়ছয় হয়েছে। এসব কেনাকাটায় রশিদ, কোটেশন পাওয়া যায়নি। কোনোটা পাওয়া গেলেও তা অরজিনাল নয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পারফরমেন্স অডিট অধিদপ্তর মহাপরিচালক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘বিষয়গুলোর অডিট হয়েছে। সেখানে শ্রম কাউন্সিলর আমিনুলসহ বেশ কয়েকজনের আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেছে।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেদ্দার শ্রম কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম জেদ্দায় সেবাপ্রার্থী প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুর্ব্যবহার ও হয়রানি করে থাকেন। বছরের পর বছর ফাইল আটকে রাখেন। তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগের শেষ নেই। ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কিচনীদহ গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন। ক্ষতিপূরণ মামলা পরিচালনার জন্য দূতাবাসের চাহিদা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশকর্তৃক ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ পাঠানো হলেও তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়নি। মৃত তোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী সায়েরা খাতুন মামলাটির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়ে বারবার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করছেন। কিন্তু এখন এ সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেননি কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম। গত ১০ এপ্রিল ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।