রাজনীতি

পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ যে কারণে কাজে লাগাতে পারছে না জাতীয় পার্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি-জামায়াতের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। সরকারের লেজুড়বৃত্তির পাশাপাশি সকাল-বিকেল জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও দলের জনগ্রহণযোগ্যতা হারানোর অন্যতম কারণ। তাছাড়া প্রতিনিয়ত নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটছে দলের ভেতরে। ফলে জাপার যে জনপ্রিয়তাটুকু রয়েছে দলটি তাও ক্রমেই হারাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তারা বলছেন, কৌশলী পরিকল্পনা থাকলে এবং নেতারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। হয়ত হতে পারতো আওয়ামী লীগের বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল। সে লক্ষ্যে কর্মসূচি নেয়ার এখনই যৌক্তিক সময়। কারণ নানা জটিলতায় বিএনপি-জামায়ত বর্তমানে বেশ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিষ্কার নয়। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াত এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি নানা কারণে এখন বেশ নিষ্ক্রিয়। কিন্তু এই সুযোগ কোনোভাবেই কাজে লাগাতে পারছেন জাতীয় পার্টি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এরশাদের জাতীয় পার্টি সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারলে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির বর্তমান শূন্যস্থানটুকু তারা দখল করতে পারতো। এরশাদের জাতীয় পার্টি হয়ে উঠতে পারতো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। কিন্তু দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ ছোটখাট নানা সমস্যার আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে দলটি।

নানা নাটকীয়তা: জিডি, টাকা চুরি
জাতীয় পার্টিতে ঘটছে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা। পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বনানী কার্যালয়ের তালা ভেঙে কে বা কারা ৪৩ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। গত ২৯ এপ্রিল রাতের এ ঘটনার পর জাপাতে চলছে তোলপাড়। রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের তালা ভেঙে চুরির ঘটনা এর আগে শোনা যায়নি। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, ঘটনাটি অত্যন্ত রহস্যজনক।
এর আগে নিজের সই জাল ও সম্পদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বিরোধী দলীয় নেতার প্রটোকল অফিসার এসআই বাবুল, কনস্টেবল লিজন ও আনসার সদস্য হুমায়ুন এবং তার এক ব্যক্তিগত সহকারী বনানী থানায় জিডিটি করেন। গুলশান থানায় জিডিটির নম্বর ১৫০২। জিডিতে সাবেক এ রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, তার বর্তমান ও অবর্তমানে স্বাক্ষর নকল করে পার্টির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দলের বিভিন্ন পদ-পদবি বাগিয়ে নেয়া, ব্যাংক হিসাব জালিয়াতি এবং পারিবারিক সম্পদ, দোকান, ব্যবসাবাণিজ্য হাতিয়ে নেওয়া ও আত্মীয়স্বজনদের জানমাল হুমকির মুখে রয়েছে। এ কারণে তিনি মনে করেন, তাঁর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন এমন অপরাধ করতে না পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দরকার।

বারবার ভাঙা জাতীয় পার্টি
জাতীয় পার্টি ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে ভেঙে গিয়ে আরও ৩টি ভাগে আছে জাতীয় পার্টি। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের ক্ষমতা দখলের ৩ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত হন বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী। বলা হয়ে থাকে, এরশাদ মূলত ক্ষমতা দখলের পর থেকেই রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করছিলেন। তাঁরই ইচ্ছায় গত ২ নভেম্বর ১৯৮৩ আহসানউদ্দিন চৌধুরী জনদল গঠন করেন। বিএনপির ১৯ দফার আদলে এরশাদ ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একপর্যায়ে আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ দখল করলে জনদল থেকে সরে দাঁড়ান আহসানউদ্দিন চৌধুরী। ‘জন দলে’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মিজানুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা।
দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরির চেষ্টা চালান এরশাদ। প্লাটফর্মটির নাম ছিল জাতীয় ফ্রন্ট। বিএনপি নেতা শাহ আজিজের নেতৃত্বে একটি অংশ, জনদল, গণতন্ত্রী দল, কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, মওদুদ আহমদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জাতীয় ফ্রন্টে যোগ দেন।
১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর এরশাদ রাজনৈতিক কর্মকা-ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এর কয়েক মাসের মাথায় আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় পার্টি। ১৯৮৯ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ’৯০-এর ডিসেম্বরে পদ ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটি মাত্র ৩৫টি আসন পায়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরেছে কয়েকবার। ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি ভেঙে বেরিয়ে যান এরশাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাজিউর রহমান মঞ্জুর। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি নামের দল গঠন করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি থেকে বেরিয়ে যান কাজী জাফর। তিনি জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নামেই নতুন দল গঠন করেন। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুর পর দলটিতে নতুন নেতৃত্ব আসে। আরও একটি অংশের জাতীয় পার্টি (জেপি) নেতৃত্ব দিচ্ছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। নাজিউর রহমান মঞ্জুর অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন তার ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থ।
সম্প্রতি এরশাদের অসুস্থতার পর দলটিতে নেতৃত্বের কোন্দল আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এরশাদের পর কে হবেন দলটির শীর্ষ নেতা, তা নিয়ে বিবাদের শেষ নেই। বারবার দলের উত্তারাধিকার বদলের ঘটনাও ঘটছে। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ৪ মে এইচএম এরশাদ গভীর রাতে বারিধারায় নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা দেন যে তাঁর ছোট ভাই জিএম কাদের পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
উল্লেখ্য, এর আগে জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেও আবার বাদ দেন এরশাদ। ১১ দিনের মাথায় আবার তাকেই দলের কো-চেয়ারম্যান করেন। এর আগে তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। এবার এরশাদ তাঁর ছোট ভাইকে পুনরায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদটি ফিরিয়ে দিলেন।
এভাবে নানা নাটকীয়তা আর হাস্যকর কর্মকা-ের ফলে দলটি বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারছে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তাদের মতে, বিএনপি-জামায়াত নিষ্ক্রিয়। বারবার ভুল পদক্ষেপের কারণে তারা জনবিচ্ছিন হয়ে পড়েছে। তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একেবারেই অন্ধকার। ফলে মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় পার্টি হয়ে উঠতে পারতো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল।