কলাম

শ্রমিক-মালিক ঐক্য ও উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করছে শ্রম অধিদপ্তর

এ.কে.এম. মিজানুর রহমান : শ্রমিক অধিকারে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হলো মহান মে দিবস। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টির একটি দিন ১ মে। দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল শ্রমিকরা। তাই শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা আর শ্রমিকদের শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটানোর দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয় দিনটিকে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আপসহীন ও দীর্ঘ সংগ্রাম করার এক অনুকরণীয় আদর্শ সংগঠক হিসেবে ইতিহাসে চিরভাস্বর। তিনি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের পথ সুগম এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তৎকালীন ৭টি মৌল কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে হাত দিয়েছেন এবং দুর্বার গতিতে দেশে উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করেছেন। শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করছে। জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার শ্রমিক-মালিক-সরকার-এ তিন পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের সার্বিক উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সুষ্ঠু শিল্পসম্পর্ক বজায় রাখতে সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শ্রম অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। বর্তমান সরকার শ্রমিক-মালিকের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য বদ্ধপরিকর। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের সার্বিক যুগান্তকরী উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে তাদের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়ন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছেন, যার সুফল পাচ্ছেন দেশের মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ।
দেশের শ্রম সেক্টরে সুষ্ঠু শ্রম সেবা প্রদানে নিয়োজিত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম অধিদপ্তর। ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের রেজিস্ট্রেশন প্রদান, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ, অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠন ও তার কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা, যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি নির্ধারণ, অর্থাৎ শ্রমিক ও মালিক কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণ ইত্যাদি এ দপ্তরের অন্যতম মৌলিক কাজ। শ্রমিক ও তাদের পরিবারবর্গের জন্য শ্রম অধিদপ্তর এর অধীনস্থ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রসমূহের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা ও বিনোদনমূলক সেবা প্রদান করে থাকে। শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়তনসহ শ্রম আইন, শ্রম বিধিমালা, শ্রম প্রশাসন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ সেবা প্রদান করছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী দেশের শ্রম সেক্টরে সুষ্ঠু ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকা- পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শ্রমিক মালিক উভয়ের স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্য শ্রম অধিদপ্তর নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি ২০০৯ সাল থেকে ৩০ জুন ২০১৮ পর্যন্ত সর্বমোট ২,৩১৫টি ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে।
কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে একাধিক ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রম অধিদপ্তর গোপন ব্যালটে নির্বাচন পরিচালনার মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে সিবিএ নির্ধারণ করে থাকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শ্রম অধিদপ্তর গোপন ব্যালটে নির্বাচন পরিচালনার মাধ্যমে সর্বমোট ১৬টি প্রতিষ্ঠানে সিবিএ নির্ধারণ করেছে। শান্তিপূর্ণ পন্থায় সালিশি কার্যক্রমের মাধ্যমে শিল্পবিরোধ নিষ্পত্তি করা এ দপ্তরের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। শিল্পবিরোধ আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয়ভাবেই নিষ্পত্তি করা হয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে শ্রম অধিদপ্তরের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের কল্যাণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি সফল পরিচালনার মাধ্যমে শ্রম অধিদপ্তর শ্রমিকদের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। কর্মক্ষেত্রে কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় স্থাপিত ৪টি শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়তন এবং ৩২টি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে শ্রম আইন, শ্রম প্রশাসন, শ্রমমান, শ্রম অর্থনীতি, শ্রমকল্যাণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতি বছরে প্রায় ১৫০০০ শ্রমিক, মালিক প্রতিনিধি ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ৩২টি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ, প্রজনন স্বাস্থ্য, শিক্ষা সেবা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করছে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা সমাধান ও শ্রমজীবীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিক। এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘টাস্ক ফোর্স অন লেবার ওয়েলফেয়ার ইন আরএমজি’ এবং ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কোর কমিটি’ কাজ করে যাচ্ছে। শ্রম অধিদপ্তর উভয় কমিটিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শ্রম অধিদপ্তর ঝউওজ (ঝড়পরধষ উরধষড়মঁব ধহফ ওহফঁংঃৎরধষ জবষধঃরড়হং) এর আওতায় গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের ডড়ৎশঢ়ষধপব পড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ-এর ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। ওঈঞ কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শ্রম অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, ৬টি বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, ৪টি শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়তন ও ৯টি আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরকে ই-নথি কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শ্রম অধিদপ্তরের অবশিষ্ট ৩২টি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রকে এই কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলমান আছে। এর ফলে শ্রম অধিদপ্তরের শ্রম-সেবা ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম আরো জোরদার ও সম্প্রসারিত হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে রাঙ্গামাটির ঘাগড়ায় বহুবিধ সুবিধাসহ একটি শ্রমকল্যাণ কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। চট্টগ্রামে কালুরঘাটে এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দরে কর্মরত শ্রমজীবী মহিলাদের আবাসনসংকট নিরসনে ২টি বহুতল হোস্টেল নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর অনুস্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শ্রমমানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে (আইএলসি) অংশগ্রহণ করা, শ্রমমান, শিল্প সম্পর্ক ও শ্রমপরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে ইতোমধ্যে শ্রমিকদের অংশগ্রহণের ন্যূনতম হার কমানো হয়েছে, যা আইএলও কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে।
বিশ্বের মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিনে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যথাযোগ্য মর্যাদায় মে দিবস পালন করেছে। শ্রমিক ও মালিকের ঐক্য সুদৃঢ় করে উন্নয়নের অভিযাত্রায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে Ñ ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, উন্নয়নের শপথ করি’। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শ্রমিক-মালিক ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে Ñ এ হোক অঙ্গীকার। কারণ শ্রমিক-মালিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সমাজের শান্তি-সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপর্ণ ভিত্তি।
লেখক: মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব)
শ্রম অধিদপ্তর
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়