কলাম

আমাদের বেকারত্ব ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রসঙ্গ

ড. শরীফ এনামুল কবির
বাংলাদেশে বিশাল জনসংখ্যার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বেকার-কর্মহীন মানুষ থাকার পরও আমাদের দেশে তৈরী পোশাকশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দক্ষ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি দূর করতে প্রতি বছর ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ খরচ করে বিদেশ থেকে দক্ষ জনবল আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ এখনও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
কর্মমুখী শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই শিক্ষা বিস্তারে গতিহীনতাই এর প্রধান কারণ। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাকরির ভালো চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকাররা ব্যর্থতার বেদনা ও হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদন বলছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরী পোশাকশিল্পসহ দেশের সম্ভাবনাময় ১০টি খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকেরই প্রশিক্ষণ নেই। তাদের দক্ষতার অভাবে বিভিন্ন খাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন হচ্ছে না।
এই অবস্থা কেবল পোশাক খাতেই নয়, প্রচলিত-অপ্রচলিত অন্যান্য পণ্যের খাত, সম্ভাবনাময় প্রায় প্রতিটি খাতেরই। বিআইডিএস-এর ওই প্রতিবেদনে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে ১০টি খাতে কত শ্রমিক প্রয়োজন হতে পারে, তাদের দক্ষতার ঘাটতি পূরণে কী কী করণীয়, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
চাহিদা অনুযায়ী আমাদের বিপুলসংখ্যক দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি পূরণে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করে তা সফলভাবে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের শ্রম জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় দেশের ১০টি খাত বেছে নেয়া হয়, যেগুলো দেশের কর্মসংস্থান ও জিডিপি বৃদ্ধিতে অনন্য অবদান রাখছে। গুরুত্বপূর্ণ এই খাতগুলো হলো কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, স্বাস্থ্য, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়াজাত, হালকা প্রকৌশল, তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল ও জাহাজনির্মাণ শিল্প। সবচেয়ে বেশি অদক্ষ শ্রমিক রয়েছে চামড়া খাতে। এ খাতের ৯৫ ভাগ শ্রমিকেরই প্রশিক্ষণ নেই। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ৯৩ ভাগ শ্রমিক প্রশিক্ষিত নয়। পোশাক খাতে মাত্র ৮ ভাগ কর্মী প্রশিক্ষিত। বর্তমানে ৪০ লাখ কর্মী পোশাকশিল্পে সরাসরি নিয়োজিত রয়েছে, যার ৯০ ভাগই নারী। এ খাতে দক্ষ শ্রমিক নেই Ñ দীর্ঘ সময় ধরে এমন অভিযোগ করে আসছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা। দাতারাও দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছেন।
বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে যে কর্মসূচি চালু আছে, তাও যথেষ্ট নয়। জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে আরো বেশি বরাদ্দের দাবি রয়েছে।
নেতিবাচক অবস্থা পর্যটন খাতেও। এ খাতে ৭৫ ভাগ জনবলের প্রশিক্ষণ নেই। এ খাতে ইংরেজি বলতে না পারাটাও একটা বড় দুর্বলতা।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬০ ভাগ লোকের প্রশিক্ষণ নেই। এছাড়া নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব যথাক্রমে ৯২, ৮৭ এবং ৮৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের শ্রমবাজারে জনবল লাগবে ৮ কোটি ২৯ লাখ। ২০২০ সালের মধ্যে ৫৪ লাখ এবং ২০২৫ সালে ৭২ লাখ লোককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন। সেই বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এখন বলা হচ্ছে অমীমাংসিত রহস্য। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘দিস ইজ দ্য ক্রাকস অব দ্য সারপ্রাইজ’। বিশ্বে এখন ধনী দেশগুলোর বাইরে অগ্রসরমাণ বড় অর্থনীতি হিসেবে তারা ৪টি দেশের নাম বলছে Ñ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। সংক্ষেপে এদের বলা হয় ব্রিকস। বিশ্বখ্যাত মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাচ বলছে, এরপরই রয়েছে ‘নেক্সট ইলেভেন’। এই এগারো দেশের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ।
আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান জে পি মরগান বলছে, অগ্রসরমাণ ৫ দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। তাদের ভাষায় ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’। বাংলাদেশের এই অর্জনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব পাচ্ছে তৈরী পোশাক খাত, প্রবাসী আয় আর কৃষি খাত। তৈরী পোশাক খাতের এই অর্জনের পেছনে আছে একশ্রেণির নতুন উদ্যোক্তা। কৃষিতে আছে সরকারের নেয়া অনেক সহায়ক নীতি। তবে প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা খুবই কম।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি রয়েছেন, যাদের ৮৭ শতাংশ কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বড় একটি অংশেরই নেই কোনো দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতাও তাদের অনেক কম। তার ওপর রয়েছে ভাষাগত জটিলতা। ইংরেজি জানা নেই অধিকাংশেরই। ফলে বিদেশে বাংলাদেশিরা ভালো চাকরি পান না। পারিশ্রমিকও কম পাচ্ছেন। অথচ প্রশিক্ষণ থাকার কারণে পার্শ্ববর্তী দেশের শ্রমিকরা একই কাজে ৪-৫ গুণ বেশি রোজগার করছেন। এমন তথ্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)।
আবার প্রবাসী বাংলাদেশি ও তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং এর ব্যয় নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপের তথ্যমতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ৯৫ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন, যাদের গড় বয়স ৩২ বছর। তাদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বাকিরা কোনো না কোনো প্রশিক্ষণ নিয়ে গেছেন। এই ৯৫ লাখ প্রবাসীর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ নারী শ্রমিক।
সিপিডি বলছে, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে অশিক্ষিত এবং আধা-প্রশিক্ষিত শ্রমিক বেশি সরবরাহ করছে। এসব শ্রমিক প্রশিক্ষিত বাংলাদেশির তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের শ্রমিকরা মাথাপিছু ৪৮৪৩ ডলার, চীনারা ৬১১২ ডলার এবং ফিলিপাইনের শ্রমিকরা ৫ হাজার ডলার পেলেও বাংলাদেশিরা সেখানে পাচ্ছেন মাত্র ১৬৭২ ডলার।
শিক্ষার দিক থেকে অন্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা। প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ মাধ্যমিকের গ-িই পেরোতে পারেনি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভালো বেতন না পাওয়ার প্রধান কারণ ভাষাগত দুর্বলতা ও অদক্ষতা। বেশিরভাগ প্রবাসীই ইংরেজি ভাষা জানেন না। তাছাড়া কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা বিদেশে যান। এ কারণেই অন্য অনেক দেশের শ্রমিকের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা অনেক কম বেতন পান। এমনকি একপর্যায়ে তারা অনেকেই দেশে চলে আসতেও বাধ্য হন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসী শ্রমিকরা সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। প্রতি বছরই বাড়ছে এর পরিমাণ। ২০২০ সালের মধ্যে এটি ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার।
উপসংহারে বলা যায়, কর্মমুখী শিক্ষা থাকলে প্রাত্যহিক জীবনে ছোটখাটো কাজ সম্পাদনে ব্যক্তি নিজেই সচেষ্ট হতে শেখে। উৎপাদনশীল কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
কোনো দেশ ও জাতির প্রধান সম্পদ হলো এর দক্ষ জনশক্তি। পরিকল্পনা ছাড়া জনসাধারণকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে প্রায়োগিক জ্ঞানের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই শিক্ষার যথার্থ রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। সম্ভব জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করা। সে লক্ষ্যেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রকে ক্রমেই সম্প্রসারিত করে চলেছেন। তবে দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য কর্মমুখী শিক্ষার আরো ব্যাপক প্রসার ঘটানো দরকার। এজন্য সরকারের বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারের নীতিকে আরো গতিশীল যেমন করতে হবে, তেমনি সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকার ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় এখনই বাংলাদেশে পর্যাপ্ত বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবেই উচ্চতর তাত্ত্বিক শিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষার যুগ্মধারায়, কর্মসংস্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে জাতির জীবন। যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষাই হতে পারে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণ এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ গঠনের প্রধান হাতিয়ার।
লেখক: সাবেক সদস্য
পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং সাবেক উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়