রাজনীতি

কাউন্সিলকে সামনে রেখে দল গোছাতে আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য কাউন্সিলকে সামনে রেখে মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজাতে ক্ষমতাসীন দলটি নানামুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এ জন্য নানা উদ্যোগের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের শিগগিরই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর শুরু করতে নিদের্শনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরের মধ্য দিয়ে সব পর্যায়ে কমিটি গঠন, নেতাদের সঙ্গে এমপিদের কোন্দল নিরসন এবং দলীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও মজবুত করে গড়ে তুলতে চান তিনি।
তাছাড়া দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে অন্য দল থেকে আসা ‘অনুপ্রবেশকারী’ সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এসব নব্য আওয়ামী লীগারকে চিহ্নিত করে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় কাউন্সিলের আগে ওই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত ৫ এপ্রিল দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে ওই তালিকা প্রস্তুত করা এবং তাদের তৎপরতার বিষয়ে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে। কাউন্সিলের আগেই তাদের বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী কাউন্সিলের মাধ্যমে যাতে কোনো অনুপ্রবেশকারী আওয়ামী লীগের কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা হবে। এসব আগাছা চিহ্নিত করতে পারলে দলের প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা সুবিধা হবে বলেও মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের পর থেকে টানা দেশ পরিচালনা করছে। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে যোগ দিয়েছে। এমনকি তারা বিভিন্ন পদ-পদবিও দখল করে নিয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চাঙা করতে এবং ক্ষেত্রবিশেষ কোনো ঘটনা উস্কে দেয়ার ক্ষেত্রে এসব নব্য আওয়ামী লীগারকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায়ও দেখা যায়। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নসহ দলের বিভিন্ন পদ-পদবি নিয়েও এদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের। এ নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারপিটের ঘটনাও ঘটেছে। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। তাই এসব নব্য আওয়ামী লীগারকে চিহ্নিত করে তালিকা প্রণয়ন করার মাধ্যমে দলে শুদ্ধি অভিযান চালানো সহজ হবে। এ কারণেই কাউন্সিলের আগেই তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা মনে করেন, সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, তার জন্য মূলত নব্য আওয়ামী লীগাররাই দায়ী। এসব বিতর্কিত, সমাজবিরোধী নব্য আওয়ামী লীগারকে চিহ্নিত করে দল থেকে দ্রুত বিদায় দেয়া এবং তারা কিভাবে, কার সহযোগিতায় দলে অনুপ্রবেশ করেছে তাও চিহ্নিত করা জরুরি।
সূত্র জানায়, দলে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার কাজ করছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নেতৃত্বে একটি কমিটি। মূলত বিএনপি ও জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী, চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী, অপরাধী এবং সমাজবিরোধী কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই কাজ শুরু হয়েছিল। কমিটির সদস্যরা কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘দলে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরিতে আওয়ামী লীগের একটি কমিটি কাজ করছে। তাদের আগামী জাতীয় কাউন্সিলের আগেই প্রতিবেদন জমা দিতে এবং নব্য আওয়ামী লীগারদের তৎপরতার ব্যাপারে জানাতে বলা হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আমাদের নেতাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু সুযোগসন্ধানী আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েছে। তাদের আমরা চিহ্নিত করছি। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। আর সামনের কাউন্সিলে তারা দলের কোনো পর্যায়ের কমিটিতে যাতে ঢুকতে না পারে সে জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নব্য আওয়ামী লীগারদের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষের নানা ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে দলে যোগদান প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। তখন বলা হয়, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অনুমতি ছাড়া আওয়ামী লীগে যোগদান করানো যাবে না। সেই থেকে দলে ‘বহিরাগত অনুপ্রবেশ’ কমে যায়। তবে এখনও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
জানা গেছে, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে যেমন বিএনপি ও জামায়াত থেকে অনেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, তেমনি দল ভারী করার জন্যও সংসদ সদস্য পদে আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থী ও নেতা তাদের আওয়ামী লীগে যোগদান করিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোথাও কোথাও নব্য আওয়ামী লীগারদের হাতে আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে আছে অথবা মার খাচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের মূলধারার বাইরে থেকে মনোনয়ন নিয়ে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তারা বিভিন্ন দল থেকে লোক এনে দলের ভেতরে নিজস্ব আরেকটি দল বানিয়েছেন স্থানীয় পর্যায়ে। আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, ব্যবসাবাণিজ্যসহ নানা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে মূলধারার নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
অভিযোগ আছে, কোথাও কোথাও স্থানীয় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের কারণে দল ভারী করতে কোনো কোনো নেতা বিএনপি-জামায়াত থেকে লোক নিয়ে দলে জায়গা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ব্যবসাবাণিজ্য বা অবস্থান টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়েছে। এই তালিকা প্রণীত হলে নব্য আওয়ামী লীগাররা নতুন করে সুবিধা নিতে পারবে না বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।