সাহিত্য

দুখু মিঞার চুরুলিয়ায়

শ্যামল কুমার সরকার : সেই পাঠশালায় পড়তেই প্রথম শুনি দুখু মিয়া মানে কাজী নজরুল ইসলামের কথা। বইতে পড়েছি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে বিদ্রোহী কবি এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুলের ছিল ৬ ভাই এবং ২ বোন।
ছোটবেলায় শুনে আসা চুরুলিয়া গ্রামটিকে কাছ থেকে দেখার তীব্র ইচ্ছে থাকলেও জীবনের ঝক্কিঝামেলার কারণে এতদিন তা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে গত মাসের শেষ দিকে (২১-২৮ মার্চ) দু’চোখ জুড়িয়ে এলাম কবিতীর্থ চুরুলিয়া, আসানসোল ও বর্ধমান দর্শন করে।
বর্ধমান জেলাটি অনেক বড়। বর্তমানে জেলাটি পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান জেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। আমার অবস্থান পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্রগড় হতে ২৪ মার্চ ভোররাতে (৪ টার পরে) বাসে চেপে স্বাপ্নিক মনে বর্ধমানের শিল্পনগরী দূর্গাপুর ও নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত আসানসোল পেরিয়ে সকাল ১১টার দিকে পৌঁছে যাই বহু আকাক্সিক্ষত চুরুলিয়ার চৌধুরীর পুকুর মোড়ে।
বাস হতে নেমেই দেখি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের বিশাল স্ট্যাচু ও কবিতার কিছু লাইন। কবিকে স্যালুট করে কিছু সময় চুপচাপ থাকি। হৃদয়ে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করি। বুঝতে পারি, এ চঞ্চলতা পাওয়ার আনন্দের।
রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে দু-একজন পথচারীকে কবির বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই গন্তব্য বলে দিলেন। সামান্য পরেই সত্যি সত্যিই পৌঁছে গেলাম কবিতীর্থ চুরুলিয়ায়। স্বপ্ন নয়, একেবারেই সত্যি! আমি দাঁড়িয়ে আছি আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সকলের দুখু মিঞার জন্ম ভিটেয়! সেখানে নজরুল একাডেমির (১৯৫৮) সাইন বোর্ড দেখে কী যে ভালো লাগলো।
বাইরেই কিছু সময় কাটালাম। হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। দু’জন লোক এগিয়ে এসে কথা বলতে থাকলেন। আমার উদ্দেশ্য বলতেই উনারা আমাকে নজরুল একাডেমির অফিসে নিয়ে গেলেন। সালাম দিয়ে চেয়ারে বসলাম। পরিচিত হয়ে হ্যান্ডশেক করলাম কবির ভাইয়ের পুত্র ও নজরুল একাডেমির বর্তমান কর্মযোগী সাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল করিমের সাথে। প্রমীলা-নজরুলের জন্মভূমি বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ হতে গিয়েছি বলে ভদ্রলোক আমাকে বিশেষভাবে আপ্যায়িত করলেন। কথা বলতে বলতে দেখছিলাম নজরুল-প্রমীলার বাঁধানো ছবি। এরপর একজন কর্মচারী আমাকে নিয়ে গেলেন একাডেমির মিউজিয়ামে। সেখানে নজরুল-প্রমীলার স্মৃতির বহু নিদর্শন দেখে মুগ্ধ হলাম। জানলাম চুরুলিয়াতে কবি কাটিয়েছেন তার জীবনের ১২-১৩টি বছর।
জাদুঘরে দেখা গেল কবির জীবনের অধ্যায়ভিত্তিক সচিত্র তথ্যাবলি। সেখানে আছে শিশুকাল ও প্রথম পাঠ, লেটোর দলে নজরুল, জ্ঞানপিপাসু ছাত্র, নজরুলের যুদ্ধযাত্রা, সাহিত্যান্বেষী নজরুল, রবীন্দ্র-নজরুল সাক্ষাৎকার, সাংবাদিক কাজী নজরুল ইসলাম, রাজবন্দির জবানবন্দি, বিদ্রোহী কবিতা ও বিদ্রোহী কবি, নভেম্বর বিপ্লব ও নজরুল, কবির অনশন সত্যাগ্রহ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, প্রেম ও বিবাহ, স্বতন্ত্র পার্টি গঠন ও রাজনীতি, কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সাম্যবাদের কবি নজরুল, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা, মহান সুরশিল্পী ও স্রষ্টা, কবির পারিবারিক জীবন, জনগণের কবি নজরুল, লেখাপড়া, শেষ রাজনৈতিক মঞ্চ ও সর্বনাশের সংকেত শিরোনামের উদ্দীপনামূলক বার্তা। আরো জানতে পারলাম মিউজিয়ামটি এবং কাজী নজরুল ইসলাম মহাবিদ্যালয় কেনা জায়গায় নজরুল একাডেমি করেছে। কবির জন্মদিন উপলক্ষে সেখানে সাতদিনের মেলা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। জাদুঘরে কবির ব্যবহৃত খাট, গ্রামোফোন ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দেখে আনমনা হয়ে গেলাম। কবিপুত্র সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধর ব্যবহৃত জামা, বুলবুলের পাঞ্জাবি এবং কবিপতœী প্রমীলার ব্যবহৃত শাড়ি দেখে মনটা ব্যথায় ভরে গেল, লিখে যা বোঝানো যাবে না।
সময় বয়ে যেতে থাকে। আমাকে পূর্ব বর্ধমানের ক্ষণিক আবাসস্থলে নিরাপদে ফিরে আসতে হবে। তাই মনের বিরুদ্ধেই জাদুঘর ছাড়তে হলো। গেলাম কবির মক্তবে যেটি এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়। মক্তবের পাশে দাঁড়িয়ে শিশু দুখু মিঞাকে দেখার চেষ্টা করলাম। আবছাভাবে দেখলাম দুখু মিঞা সেখানে ক্লাসে বসে আছে, দুষ্টুমি করছে, দৌড়াচ্ছে, খেলছে…। এমনি এক ধরনের বিস্ময়কর অনুভূতি নিয়ে যাই পাশের মসজিদে যেখানে নজরুল কিছুদিন মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন। দাঁড়াই কিছুক্ষণ। যেন শিশু নজরুলের কণ্ঠে আযানের ধনি শুনতে পাই।
সময় ফুরিয়ে আসে, কিন্তু মনের সাধ মিটে না। চলে যাই প্রমীলা নজরুলের সমাধিস্থলে। সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে সত্যিকার অর্থেই নির্বাক হয়ে গেলাম। আমার গাইড ও সহযাত্রী শচীন শুধু আমাকে দেখতে থাকে। কতটা সময় এভাবে ছিলাম জানি না। ওর ডাকেই আসি চুরুলিয়ায়। ভাবতে থাকি প্রমীলা নজরুল ও নজরুলকে নিয়ে। ভাবতে থাকি তাঁদের প্রেম-ভালোবাসা ও বিয়ে নিয়ে। ১৯০৮ সালের মে মাসে অবিভক্ত বাংলার ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় থানার তেওতা গ্রামে জন্ম নেয়া প্রমীলা সেনগুপ্তা (আশালতা, দুলি, দোলন) পরবর্তীকালের প্রমীলা নজরুল এখানে ঘুমিয়ে আছেন (মৃত্যু ১৯৬২ সালের ৩০ জুন)। আর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি নজরুল ঢাকায় বিদায় দিয়েছিলেন সুন্দর পৃথিবীকে।
নজরুল-প্রমীলা মাটির পৃথিবীতে নেই। কিন্তু রয়েছে তাদের প্রেম ও স্মৃতি। রয়েছে প্রমীলার মা গিরিবালা দেবীর স্মৃতি। গিরিবালা দেবীর নৈতিক সমর্থন ছাড়া নজরুল-প্রমীলার মিলন হতো কি না সন্দেহ।
সময় একেবারেই শেষ হয়ে যায়। নজরুল একাডেমির অফিসকক্ষে গিয়ে বসি। সাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল করিমের সাথে বিদায়ী কথা বলে, তাঁকে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে আসার আমন্ত্রণ জানাই। অতঃপর তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নজরুল একাডেমি, চুরুলিয়ার আজীবন সদস্য হয়ে (উনার ভাষায় নজরুল একাডেমির আত্মীয় হয়ে) গাইডসহ কবিতীর্থস্থল ত্যাগ করি।
যেতে-আসতে কবির স্মৃতিবিজড়িত আসানসোলে থামি। আসানসোলে ঢুকতেই চোখে পড়ে বড় করে লেখা ঞযব ঈরঃু ড়ভ ইৎড়ঃযবৎযড়ড়ফ. মনে পড়ে আসানসোলের এএম বক্স-এর রুটির দোকানের কথা যেখানে নজরুল মাসিক ৮ টাকা মাইনের চাকরি করতেন।
আসানসোলের নজরুল বিশ^বিদ্যালয় ও বর্ধমানের বর্ধমান বিশ^বিদ্যালয়ের সুদৃশ্য ক্যাম্পাস দেখে দারুণ ভালো লাগে।
ভাবতে ভাবতে পনের ঘণ্টার তীর্থযাত্রা সাঙ্গ করে পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্রগড়ে ফিরে আসি। এরপর স্বদেশে। সোনার বাংলায় ফিরে আসার ১০ দিন পরে শয়নেজাগরণে এখনও চুরুলিয়াতেই আছি। কিছুতেই ভুলতে পারছি না চুরুলিয়া, আসানসোলের স্মৃতি। ভুলতে পারছি না সেখানকার প্রকৃতি।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ
ঝিট্কা খাজা রহমত আলী কলেজ
হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ