প্রতিবেদন

নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ব নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ পালিত বাজেট বরাদ্দের অভাবে ১১১ সুপারিশ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক : নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ব নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ পালিত হলেও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট ১১১ সুপারিশ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না থাকায় অতি জরুরি সুপারিশও আলোর মুখ দেখছে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অন্যতম কর্মসূচি হচ্ছে গবেষণা, তদন্ত, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা। এর মধ্যে শিক্ষা কর্মসূচি চালুর জন্য পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হচ্ছে। তবে গবেষণা ও তদন্তের জন্য কোনো তহবিল নেই প্রতিষ্ঠানটির।
২০০২ থেকে ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত এটি ছিল দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র। পরে এটি ইনস্টিটিউট হলে বুয়েটের অধীনে চলে আসে। এরপর থেকে বুয়েট কর্তৃপক্ষই প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দ দিচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তার সিকি ভাগও মেলে না।
সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞ কমিটি সড়কে শৃঙ্খলার জন্য ১১১টি খসড়া সুপারিশ তৈরি করেছে। সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নেই সরকারের। ফলে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ২২ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি চলতি মাসে সড়কে শৃঙ্খলার জন্য ১১১টি খসড়া সুপারিশ তৈরি করে। এসবে যেসব প্রকল্প ও কর্মসূচির সুপারিশ রয়েছে তার বেশিরভাগ বাস্তবায়নের জন্যই বরাদ্দ নেই। ১১১ সুপারিশের মধ্যে ৫৩ নম্বর সুপারিশটি হলো ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন মহানগরীতে গণপরিবহন বিশেষ করে বাস-মিনিবাস পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দূর ও শৃঙ্খলার জন্য বাস রুট ফ্রাঞ্চাইজিং চালু করা। ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা এসটিপির সুপারিশমালার মধ্যে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা আনতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল ২০০৪ সালেই। এই সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনও কোনো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়নি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ৮ মাস ধরে এ নিয়ে বৈঠক হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা ও দক্ষ চালক তৈরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র করতে চান। এ জন্য ২০১২-১৩ অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ খাতে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সে অর্থ পাননি। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘বড় বড় প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দ মেলে আর কার্যকর কর্মসূচিতে কোনো বরাদ্দ মেলে না।’
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতি বছরই সড়ক নিরাপত্তা দিবস পালিত হচ্ছে; কিন্তু এ বিষয়ে যেসব কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ থাকে না।
জানা গেছে, বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা শাখা থেকে সড়কে আইন মানার জন্য গাড়িচালক ও পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়। কিন্তু জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনে সংস্থাটির কাছে সরকারি তহবিল নেই। বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা শাখার পরিচালক শেখ মো. মাহবুব ই রব্বানী বলেন, ‘২০১৭ ও ২০১৮ সালে আমরা এ দিবস পালন করার জন্য কোনো বরাদ্দ পাইনি।’
প্রায় একই চিত্র সড়ক দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকল্পেও। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রকল্পের জন্য সমীক্ষাসহ বিভিন্ন গবেষণা চালানো হয়। কিন্তু ওই কাজে বরাদ্দই ছিল না। এ প্রসঙ্গে গবেষণায় যুক্ত ড. এস এম সালেহউদ্দিন বলেন, ‘সমস্যা সমাধানের জন্য শহরবাসীকে বাঁচানোর চেতনাকে সামনে রেখেই কাজ করছি। বরাদ্দ থাকলে কাজ আরো এগিয়ে যেত। এখন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি হলে আইআইএফটি থেকে প্রাথমিক বরাদ্দ মিলতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য গবেষণার বিকল্প নেই। গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার বিভিন্ন কারণ উঠে আসে। অথচ এসব কারণ রোধে নানা সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। অথচ অনেক বড় বড় প্রকল্পে বছরের পর বছর কাজ চলছে; প্রতি বছর তাদের বাজেট বরাদ্দও বাড়ছে। শত শত কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ঢাকা উড়াল সড়ক প্রকল্প। ২০১১ সালে উদ্বোধন করা হলেও ঢাকা উড়াল সড়কের কাজ ৮ বছরেও শেষ হয়নি। অথচ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী হয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত হবে এ সড়কটি। ঢাকা উড়াল সড়কের মতো বড় বড় প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ মিলছে প্রতি অর্থবছরে। অন্যদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় সামান্য বরাদ্দও মিলছে না। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বরাদ্দ আছে ৫০ লাখ টাকা, যা ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদানেই খরচ হয়ে যাবে। বুয়েট কর্তৃপক্ষকে আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে ইনস্টিটিউট থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘আগে ইনস্টিটিউটের একটি পাজেরো ও একটি মাইক্রোবাস ছিল। এ দুটি গাড়িও বুয়েটের পরিবহন পুলে নেয়া হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে আমাদের পকেট থেকে টাকা খরচ করে সরেজমিনে যেতে হয়। শিক্ষার্থী রাজীব, কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানিসহ চলতি অর্থবছরে ৪টি সড়ক দুর্ঘটনার তদন্ত আমরা করেছি। প্রতিষ্ঠান তো আর পকেটের টাকায় চালানো সম্ভব নয়।’
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ অতি গতি। সড়কে গাড়ির গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিজিটাল জরিমানার ব্যবস্থা চালুর জন্য এই ইনস্টিটিউট, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিলে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছিল। ২ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক ৪০টি অংশে ভাগ করে কেন্দ্রীয়ভাবে ২৪ ঘণ্টা তদারক করতে তাতে স্পিড এনফোর্সমেন্ট ক্যামেরা রাখার প্রস্তাব ছিল। এতে গাড়ির ছবি, নম্বর প্লেট ও গতি রেকর্ড হবে। আইন না মানলে মোতায়েন করা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। থাকবে মোবাইল হাসপাতাল, যাতে আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয়। মহাসড়ক পুলিশ, মহাসড়কের পাশের ১২০টি ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা এ কাজে সহায়তা করবে।
এ প্রস্তাব ১ বছর আগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে একটি সভা ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়েও মন্ত্রণালয় তা বাতিল করে। অথচ সরকার ২০২০ সালের মধ্যে সড়কে প্রাণহানি ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার কর্মকৌশল নিয়েছে। কিন্তু এ জন্য ছোট ছোট কর্মসূচি ও প্রকল্পে বরাদ্দ নেই। এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘বড় প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ মিলছে। কিন্তু বেশি কার্যকর প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বরাদ্দই নেই Ñ এমন বার্তা আমাদের হতাশ করে।’
আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ১৬৭টি প্রকল্প স্থান পেতে যাচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। অর্থ সচিবকে সম্প্রতি অতিরিক্ত চাহিদার বিষয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন সড়ক সচিব। প্রকল্প তালিকায় বেশিরভাগই সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজ। এরই মধ্যে সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রকল্প আছে মাত্র ১টি। যার নাম ‘জাতীয় মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানসমূহে নিরাপত্তা উন্নয়ন’ প্রকল্প।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোটরযান আইন ১৯৮৩ (অধ্যাদেশ)-এ তৃতীয় পক্ষের ইনস্যুরেন্সের মাধ্যমে এ সুবিধা পাওয়ার বিধান ছিল। কিন্তু কোনো যাত্রী, পথচারীকে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি। নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এ তৃতীয় পক্ষের ইনস্যুরেন্সের বিধানটি বাতিল করে জীবনবীমাকে ঐচ্ছিক হিসেবে রাখা হয়েছে। কেউ ইচ্ছা করলে ইনস্যুরেন্স করতে পারবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের নিয়মিত কোনো তহবিল নেই।
এ অবস্থায় গত ৭ এপ্রিল রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক সেমিনারে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ বাবদ জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি তুলেছে। সংস্থাটি প্রস্তাব দিয়েছে, গণপরিবহনের প্রতি ট্রিপে আসনপ্রতি ১ টাকা করে নিলেও প্রতিদিন পাওয়া যাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সিএসআর ফান্ড, ব্যক্তিগত অনুদান, পুলিশের করা জরিমানার অর্থ এবং সরকারের উন্নয়ন খাত থেকে বছরে দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকা পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। তারা বলছেন, এভাবে পরিকল্পনামাফিক করা গেলে এ কাজ করা কঠিন হবে না।