প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লন্ডন সফরে উজ্জীবিত বাঙালি কমিউনিটি

বিশেষ প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লন্ডন সফরে উজ্জীবিত সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ পুরো বাঙালি কমিউনিটি। প্রধানমন্ত্রী তার সফরে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, বিদেশবিভুঁইয়ে থাকলেও প্রবাসী বাংলাদেশি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যেন দেশের কথা মনে রাখেন, দেশের জন্য কাজ করেন। সেইসঙ্গে বিদেশের মাটিতে যেন কোনোভাবেই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বিদেশে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশে সাজাপ্রাপ্ত তথাকথিত কোনো নেতা যাতে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে না পারেন সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার কঠোর নির্দেশনা, দেশবিরোধী যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের এ ব্যাপারে সজাগ-সতর্ক থাকার বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও ৬ মে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের বিদেশ থেকেই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান এবং তাদের অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। এমনকি লন্ডনে অবস্থানকালীন সময়ে গত ৪ মে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ফণী। ফণীর তা-বে যাতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম হয় সেই লক্ষ্যে পূর্ব থেকেই প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আগাম সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেন এবং উপদ্রুত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের আগাম নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রবাসী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সেখানে অবস্থানরত বাঙালি কমিউনিটিকে বলেন, বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কোনো শেষ নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ দিনের ব্যক্তিগত সফরে গত ১ মে লন্ডন যান। চোখের চিকিৎসা করানোর জন্য মূলত প্রধানমন্ত্রী এবার যুক্তরাজ্য সফর করেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনুরোধে সেখানে তাজ হোটেলে ৯ মে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। উক্ত মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘খুন ও অর্থপাচারকারীদের কোনো ক্ষমা নেই, তাদের শাস্তি অবশ্যই হবে।’
লন্ডনে লুকিয়ে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি। খুনি ও অর্থপাচারকারীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, যত টাকাই খরচ করুক, তাদের কোনো ক্ষমা নেই এবং জাতি তাদের ক্ষমা করবে না। আদালত খুনি ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। আমরা এই রায় কার্যকরের পদক্ষেপ নেবো। তারা যত স্লোগানই দিক, যত তিরস্কারই করুক, তাদের অবশ্যই শাস্তি হবে।’
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখা ও দলের সহযোগী সংগঠনগুলো এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ এতে সভাপতিত্ব করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম মতবিনিময় সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি অপপ্রচার চালাচ্ছে। যাদের জন্মের কোনো বৈধতা নেই তারাই সবকিছুতে অবৈধ খুঁজে বেড়ায়। মিথ্যা নিয়ে কারবার করাই বিএনপির ব্যবসা। তারা এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে এবং বিদেশে অর্থ পাচার করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক বনে গেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, সত্যের জয় হবেই।’
বিগত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশে চমকপ্রদ আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। বিজয় সমুন্নত রাখতে হবে। আপনাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে এবং দেশের ইতিহাসকে বিকৃত করতে না পারে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার নিজস্ব অর্থ দিয়েই পদ্মাসেতু নির্মাণ করছে এবং ইতোমধ্যে সাড়ে ৬ কিলোমিটার সেতুর প্রায় ২ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে। এই সেতু নির্মাণ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু আমরা সেই অভিযোগ মেনে নিইনি বরং এর প্রতিবাদ করেছি; কারণ সেই সৎ সাহস আমাদের ছিল। আমরা কেন তাদের অভিযোগ মেনে নেব, যে কাজ আমরা করিনি। একটি সংস্থা আমাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছিল এবং আমরা তা মেনে নিইনি। কেননা তা কখনও ঘটেনি। আমরা কোনো অভিযোগ ঘাড়ে করে ক্ষমতায় আসতে চাইনি। আমি কোনো মিথ্যা অভিযোগের দায় নিতে পারি না এবং আমি জানি মানুষ সত্য ভালোবাসে এবং মর্যাদা দেয়, আমি এও জানি সত্যের পথ সবসময়ই কঠিন এবং সে পথেই আমি এ পর্যন্ত এসেছি।’
নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির প্রসঙ্গ তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, দলটি নির্বাচনকে প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ না করে মনোনয়ন বাণিজ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা এক-একটি আসনে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করে এবং যাদের নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল তাদেরকেই তারা বাদ দিয়ে দেয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। কারণ মহিলা ও যুবসমাজ ব্যাপক হারে নৌকার পক্ষে ভোট দিয়েছে।’
শেখ হাসিনা বিগত ১০ বছরের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর সংস্থান করতে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বেশকিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে এ অর্থবছরের শেষ নাগাদ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।’
তিনি বলেন, ‘এ দেশে আর কেউ গৃহহীন থাকবে না, কেউ কুড়েঘরে বাস করবে না। শিক্ষাব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নয়ন করেছে সরকার। একটি সময়োপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করছে সরকার। দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবহেলিত ছিল। আমরা কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান মর্যাদা প্রদান করেছি। সরকার ঝরেপড়া রোধ করতে স্কুলগুলোতে মিড-ডে মিল চালু করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সাল নাগাদ দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপন করবো। আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়ন করছে সরকার। আমরা ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর ভিত্তি করেই দেশের অর্থনীতি এখন শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসার জন্য তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে দেশের জনগণ ও প্রবাসীদের মাহে রমজানের মোবারকবাদ জানান। তিনি সবাইকে আগাম ঈদ শুভেচ্ছাও জানান। ১০ দিনের লন্ডন সফর শেষে গত ১১ মে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে তাঁকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
লন্ডনে স্থানীয় সময় ১০ মে সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম প্রমুখ।
প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার এ সফর বিভিন্ন কারণেই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে সাজাপ্রাপ্ত একজন নেতা এখানে লুকিয়ে আছেন। তিনি এখানে বসে দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন বলে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাকে দেশে ফেরত নিয়ে যাতে সাজা কার্যকর করা যায়, সে ব্যাপারে প্রবাসী বাংলাদেশি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উদ্যোগ নেয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেইসঙ্গে বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে থাকা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাকি খুনিদেরও দেশে ফেরত পাঠাতে উদ্যোগী হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘লন্ডন কোনো পলাতক দ-প্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাপদ আবাস হতে পারে না। ঐতিহ্যবাহী এ শহরের সঙ্গে বিষয়টি খুবই বেমানান। আমরা যুক্তরাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ইতোমধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছি, যাতে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়। তারা আশ্বস্তও করেছেন। বলেছেন, আইনি নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে সবকিছু করতে হবে। সে কারণেই একটু সময় লাগছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনামূলক প্রাণবন্ত বক্তব্যে এখানকার নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা উজ্জীবিত হয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের প্রতি তাদের দায়িত্বের জায়গাটায় আরও সচেষ্ট হবেন বলে মনে করি। যে যেখানেই থাকি না কেন, দেশের উপরে তো কিছু নেই। সবার আগে দেশ, মাতৃভূমি। এর সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। দেশ প্রসঙ্গে কোনো ছাড় দেয়া যায় না, এ কথাটাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।