রাজনীতি

ভেঙে যাচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভেঙে যেতে বসেছে ড. কামালের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট মূলত বিএনপির ওপর ভর করেই পরিচালিত হয়ে আসছিলো। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবির পর নানা কারণে জোট ও ঐক্যফ্রন্টের দু’টি পথ দুই দিকে যায় বেঁকে।
সর্বশেষ বিএনপির এমপিদের শপথ নেয়াকে কেন্দ্র করে ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। আরও বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে ২০ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ লেবার পার্টি। একই ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন কাদের সিদ্দিকী। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে থাকলে তা খোলাসা করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।
শুধু অন্য দলে নয়, নিজ দলেও এ ইস্যুতে চলছে নানা অস্থিরতা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী নেতাদের শপথ গ্রহণ ইস্যুতে সম্প্রতি দলের নেতাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে দলটিতে শুরু হয়েছে নতুন তৎপরতা। এখন যে ক্রান্তিলগ্ন চলছে বিএনপিতে, নেতাদের মতানৈক্য তা আরও প্রকট করে তুলবে। তাই এ থেকে উত্তরণে পরস্পরবিরোধী কোনো বক্তব্য কিংবা দলীয় কোনো সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা না করে; বরং সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি – এমন অনুধাবন থেকে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নয়া তৎপরতা; ক্ষোভ কমাতে শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো সঠিক কি না, তা মূল্যায়ন করা হবে তার কারামুক্তির পর। এ মুহূর্তে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে।
গত ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বর্জন করে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটি। কিন্তু স্থায়ী কমিটিকে অন্ধকারে রেখে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেষ মুহূর্তে দল থেকে বিজয়ী নেতাদের শপথগ্রহণ করার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয়ায় কারণে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা। এর জের ধরে গত ৪ মের স্থায়ী কমিটির নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকও বাতিল করা হয়। নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে সেদিনই স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে লন্ডন থেকে স্কাইপেতে কথা বলেন তারেক রহমান। প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপ্তির এ কথোপকথন প্রসঙ্গে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অবশ্য কোনোরূপ মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সূত্রমতে, দলের সিনিয়র নেতাদের মান ভাঙাতে গয়েশ্বর রায়কে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের বিএনপি কিভাবে সহায়তা করবে, তাদের পাশে দাঁড়াবে Ñ সে বিষয়েও গয়েশ্বর চন্দ্রকে দায়িত্ব দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা জানান, সিনিয়র নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে গয়েশ্বর রায় গত ৫ মে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় বৈঠক করেন। একই দিন গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও বৈঠক করেন গয়েশ্বর। এতে মূল আলোচ্য ছিল, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিভাবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়। কারণ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মানে দলীয় সিদ্ধান্ত যা ‘অগ্রাহ্য’ করা যায় না।
ওই বৈঠকের বিস্তারিত জানা না গেলেও ৬ মে এক অনুষ্ঠানে গয়েশ্বর রায় বলেন, ব্লেইম গেইম থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমি কী পারলাম Ñ সেটা ভেবে দেখতে হবে। কেন পরস্পরকে দোষারোপ করব? এতে তো প্রতিপক্ষ সুযোগ পায়; আমরা দুর্বল হয়ে যাই। আমাদের সংগ্রাম ঐক্যের জন্য, যে ঐক্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের।
তিনি আরও বলেন, আসুন আমরা আত্মসমালোচনা করি এবং নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলি। এতে দল শক্তিশালী হবে, দলের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, যেখানে ব্যর্থতার শেষ, সেখানেই সফলতার যাত্রা শুরু হয়, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। আমাদের চেষ্টা করা দরকার। চেষ্টা কখনো কখনো বিফলও হতে পারে। তার মানে এই নয় যে, ইস্তফা দিতে হবে।
গত ৫ মে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, রাজনীতি শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই। এটা পরিবর্তন হয়। ১৯৯০ সালের যে ভাবনা সেই পরিস্থিতি কি ২০১৯ সালে আছে? সুতরাং আমাদের ২০১৯ সালের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করে পথ বের করার চেষ্টা করতে হবে। ২০০১ সালের অবস্থা এবং এখনকার অবস্থা কি একই? রাশিয়ার বিপ্লব ১৯১৭ সালে হয়েছিল, এখন কি সেই রাশিয়া আছে? শুধু নেগেটিভ চিন্তা করে এগুনো যাবে না। পজিটিভ চিন্তা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করে সামনে এগুতে হবে Ñ এটা দলটির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে।
বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত আছে, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এরই অংশ হিসেবে উপজেলাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে অংশ নিয়েছেন Ñ এমন প্রায় দুই শতাধিক তৃণমূল নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওই নেতা বলেন, শপথ সংক্রান্ত বিষয়ে যেহেতু দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে, সেহেতু পরবর্তী যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আগাম মন্তব্য করা থেকে দল সবাইকে বিরত থাকতে বলেছে।

শেষ কথা
যদিও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত ও বিএনপির তৃণমূল নেতারা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিরোধিতা করে ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেয়ার কথা বলছেন। তাদের অনেকেই মনে করেন, ড. কামাল হোসেন ও ঐক্যফ্রন্টের কিছু নেতা তারেক রহমান এবং কারাবন্দি নেতা খালেদা জিয়াকে ভুল বুঝিয়ে সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার অংশ হিসেবে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রভাবিত করেছে।
বিএনপির তৃণমূল নেতারা আরো মনে করে, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের ওপর ভর করে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও তারা খালেদা জিয়া বা বিএনপির রাজনৈতিক সুবিধার কথা চিন্তা না করে সরকারের সুবিধার জন্য সরকারের পরোক্ষ নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ডুবিয়েছে। তাই বিএনপির উচিত এখনই ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট থেকে বের হয়ে এসে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা।