রাজনীতি

সংস্কারপন্থিদের নবগঠিত জামায়াত কি গণমানুষের হৃদয়ে স্থান পাবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার ঘোষণায় বেশ সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নানা সমালোচনা আর অভিযোগ তুলে জামায়াতের কর্মকা-কে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলায় দলটি কিছুটা বিব্রত হলেও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা উদ্বেগ দেখাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা; বরং দলে ভাঙন ঠেকানো তথা নিজেদের জনশক্তিকে ধরে রাখতে সাংগঠনিক তৎপরতা আরও জোরদার করেছে। নতুন নতুন কর্মপদ্ধতিতে চলছে দলীয় কর্মকা-। একই সঙ্গে দল নিষিদ্ধ হওয়াসহ যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় জামায়াতের পক্ষ থেকেও নতুন দল গঠনের উদ্যোগ অব্যাহত আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জামায়াত থেকে বাদ পড়া এবং জামায়াত মনোভাবাপন্নরা একটি নতুন প্লাটফর্ম গঠন করে তারা নাম দিয়েছেন ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’। তারা শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগকে একটি রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে চান। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের জামায়াত থেকে পদত্যাগ জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। জামায়াতের এই সংস্কারপন্থি নেতা বর্তমানে লন্ডন অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি গত জানুয়ারিতে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। এরপর জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগর জামায়াতের সদস্য মজিবুর রহমান মনজুকে। তিনি জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। তিনিও জামায়াতে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জামায়াতে আরো কিছু সংস্কারপন্থি থাকলেও এখন তারা চুপচাপ আছেন। তবে তাদের সংখ্যা কম। আর ওই দুই সংস্কারপন্থি লিখিতভাবে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার অন্যতম ছিলো মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু তাদের কোনো সংস্কার প্রস্তাবই জামায়াত গ্রহণ করেনি, যদিও জামায়াতের সাংগঠনিক সংস্কারের জন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তবে সেই কমিটি কিছু করেছে কিনা তা জানা যায়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা দ-িত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশকেই ফাঁসির দ- দেয়া হয়েছে এবং তা কার্যকর হয়েছে। আর আদালতের নির্দেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলেও তাদের কেউ পাস করতে পারেননি। সর্বশেষ জামায়াত থেকে কিছু সদস্যের বের হয়ে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের চেষ্টাকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। তারা দেখতে চাইছেন এর উদ্দেশ্য কী? আর এটা আদৌ কোনো সফল প্রচেষ্টা হবে কিনা। সংস্কারপন্থিদের নবগঠিত জামায়াত কি নতুন বার্তা নিয়ে গণমানুষের হৃদয়ে স্থান পাবে কিনা।
সূত্রমতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকা-ে সংস্কার আনতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল একটি গ্রুপ। এরই ধারাবাহিকতায় দলের সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে সম্প্রতি জামায়াত নেতাদের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। একপর্যায়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দল ত্যাগ করেন জামায়াতের প্রভাবশালী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এর পরদিনই সংস্কার তৎপরতার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতের সাবেক মজলিসে শূরা সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। এরপর থেকেই সংস্থারপন্থিরা নতুন একটি দল গঠন করছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সারাদেশের নেতাকর্মীদের সতর্ক বার্তা দেয় জামায়াতের হাইকমান্ড। একই সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে নতুন একটি দল গড়ার উদ্যোগের কথাও ঘোষণা দেয়া হয়। এসব গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে ২৭ এপ্রিল ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ স্লোগানে একটি নতুন রাজনৈতিক ‘প্লাটফর্মের’ ঘোষণা দেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। এ প্লাটফর্ম থেকে খুব তাড়াতাড়ি একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নতুন এ উদ্যোগের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা মঞ্জু বলেন, আমরা কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করব না। আমরা যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি, তা হবে ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য উন্মুক্ত একটি প্ল্যাটফর্ম। আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা সংগঠনের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি ঠিক করব। আজ থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।
জামায়াতের বাইরে গিয়ে জামায়াতপন্থিদের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কোনো নেতা বা জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ফেনী জেলা জামায়াতের আমীর একেএম শামসুদ্দিন বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা কোনো রকম চিন্তিত নই। এর কোনো প্রভাব আমাদের দলে পড়বে না। দলে এ নিয়ে কোনো সাড়াশব্দ নেই। আর যারা এটা করেছেন তারা এখন আর আমাদের দলের কেউ না। তাদের নিয়ে আমাদের কথা বলার প্রয়োজন নেই।’
জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক নেতা মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন দল গঠনের আশঙ্কায় জামায়াতের হাইকমান্ডে বেশ উদ্বেগ থাকলেও ২৭ এপ্রিলের পর তা কমেছে। কারণ জামায়াতের কেন্দ্রীয়, মহানগর বা জেলা পর্যায়ের বড় কোনো নেতা মঞ্জুর নেতৃত্বের দলে এখন পর্যন্ত যোগ দেয়নি। তবে ওই দলে যাতে জামায়াতের কেউ না যায় সে ব্যাপারে আগে থেকেই দলটি বেশ সতর্ক রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দলের দাওয়াতি ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মকা-সহ পেশাজীবী সংগঠনগুলোর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা সারাদেশে সফর করছেন। এসব তৎপরতায় দলীয় জনশক্তি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং এখন পর্যন্ত জামায়াতে ভাঙনের কোনো আশঙ্কা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশের’ সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্র জানায়, ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ মানুষকে নতুন কিছু উপহার দিতে সক্ষম হবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এ দল গুণগত পরিবর্তন এনে গণমানুষের কল্যাণে কাজ করার সর্বাত্ম প্রচেষ্টা চালাতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন তারা।