রাজনীতি

সাংগঠনিক দুর্বলতায় নতজানু বিএনপি: হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক : আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে না পেরে অবশেষে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে দলের কাউন্সিল না হওয়া, অঙ্গ সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়হীনতা দলকে চরম দুর্বলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন নির্বাসনে এবং সীমাহীন সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপিকে সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে বলে রাজনৈতিক বিশেষকরা মনে করছেন। এমনকি দলের দিকনির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রেও নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এমতাবস্থায়, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে আন্দোলন করে সরকার পরিবর্তন তো দূরের কথা, দলের দাবিদাওয়াসমূহ আদায় করা বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারের সঙ্গে সমঝোতাই এখন একমাত্র উপায় Ñ এমন চিন্তাভাবনা থেকেই সরকারের সঙ্গে অলিখিত সমঝোতা করছে বিএনপি Ñ এমনটি মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বরাবরই বলে আসছিলো, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও যাবে না তারা। কিন্তু তারা শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। পরবর্তীতে চরম পরাজয়ের পর তারা সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সেই জায়গা থেকেও ইউটার্ন করে ফিরে সংসদে গেলেন। এ থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে বিএনপির সমঝোতার কারণেই এমনটি ঘটেছে।
দৃশ্যত বিএনপির কর্মকা-, কথাবার্তা ও সরকারের নমনীয় ভূমিকায় তেমনই আভাসই ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপির ৫ সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ, পুলিশের বাধাহীন মিছিল-মানববন্ধন-সভা-সমাবেশ এবং একাধিক নেতার কারামুক্তির প্রেক্ষাপটে বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মী ও দেশের সাধারণ মানুষও মনে করছে সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে বিএনপির সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। যদিও তা স্বীকার করা হচ্ছে না বিএনপি বা সরকার পক্ষ থেকে। এটা এক ধরনের রাজনীতির কৌশল তাদের। ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর ক্ষমতাসীনরা হয়ত চাচ্ছে নির্বিঘেœ সরকার পরিচালনা করতে, আর বিএনপি চাচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সীমিত রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করতে। বিএনপি নেতাদের নামে মামলা-হুলিয়া-জেল-জুলুমের নিষ্কৃতি চান তারা। আর এই অলিখিত সমঝোতার লক্ষণ দেখা গেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে।
সূত্র জানায়, লন্ডনে সফরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতাদের জমায়েতে সেখানকার বিএনপির নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের নির্দেশে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেনি। প্রধানমন্ত্রী যেখানে আছেন সেখানে পূর্ব ঘোষিত লন্ডন বিএনপির সকল বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, দুইজন নেতাকে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা তৈরির জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই সমঝোতার পর সরকার বিএনপির প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করছে বলে রাজনৈতিক ওয়াকেবহাল মহল মনে করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আরো কয়েকজন দ্রুত মুক্তি পাবেন বলে জানা গেছে। আদালতে গেলেই এখন জামিন মিলছে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের।
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিতে সরকারের সঙ্গে কোনো দরকষাকষি বা সমঝোতা হয়নি। বিএনপি সমঝোতা করলে অনেক আগেই করতে পারতো। খালেদা জিয়া যদি সমঝোতা করতেন তাহলে উনিই প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারতো না। খালেদা জিয়া নীতির প্রশ্নে কখনও আপস করেননি। বেগম জিয়ার সেই নীতিকে সামনে রেখেই এগিয়ে চলছে বিএনপি। একইভাবে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলছেন না ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কোনো নেতা।
তবে এক্ষেত্রে যে যা-ই বলুক না কেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থতা এবং সরকারের কাছে নতজানু হওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আলামতে হতাশ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। তারা মনে করে, সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব; এমনকি কূটনৈতিকভাবেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল।