অর্থনীতি

করদাতা বাড়াতে মরিয়া সরকার

ওসমান গনি শাহীন
প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ২২ লাখের মতো মানুষ। এ বছর সংখ্যা কিছুটা বাড়বে বলে আশা করা হলেও সেটি মোট জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশও হবে কি না তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ গুণ করার সুযোগ রয়েছে। তাই সরকার করহার না বাড়িয়ে করদাতার সংখ্যা ও করের আওতা বাড়াতে চাচ্ছে। গুটিকয়েক করদাতার ওপর করের চাপ আরো না বাড়িয়ে অধিকসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। এ জন্য সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে করদাতার সংখ্যা ২২ লাখ থেকে ১ কোটিতে উন্নীত করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ১৫ মে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক, বর্তমান গভর্নর ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ইফতার অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এ লক্ষ্যের কথা জানান অর্থমন্ত্রী।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আগামী বাজেটে করের হার বাড়ানো হবে না। এবার আমরা কোনোভাবেই কোথাও কর বাড়াব না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর কমানো হবে। এবার হয়ত বেশি কমাতে পারব না, তবে আগামীতে করের হার বেশি করে কমাব। করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়াব। এজন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল নেই বিধায় বিপুল আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করা হবে।
গণমাধ্যমের সহায়তা কামনা করে তিনি বলেন, দেশের সব মানুষ যেন কর প্রদানে অনুপ্রাণিত হয় সে বিষয়টি প্রচার করবেন। আমরা কিন্তু অনেক কঠিন কাজে নামছি। করদাতার সংখ্যা ২০ লাখ, ২২ লাখ থেকে প্রথম বছরে আমরা ১ কোটিতে উন্নীত করতে চাই। এই যে করদাতা বাড়াব, কাকে বাড়াব? যারা কর প্রদানে উপযুক্ত তাদেরই করের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের ৪ কোটি মানুষ আছেন, যারা আয়কর দেয়ার উপযুক্ত। আওতা বাড়িয়ে এসব মানুষকে যদি করের আওতায় আনতে পারি তাহলে আমাদের ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত অনেক বেড়ে যাবে। আমরা সেদিকে যাচ্ছি।
মন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা অনেক আউট সোর্স করব। কারণ যে পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে লোকবল প্রয়োজন সে পরিমাণ এত অল্প সময়ে পাওয়া যাবে না। তাই আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব অফিস প্রতিটি উপজেলায় যাবে। যদি প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে একই উপজেলায় ৩ থেকে ৪টি রাজস্ব অফিস দেয়া হবে। চাহিদার ওপর অফিসের সংখ্যা নির্ভর করবে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডির হিসাবে আয়কর দেয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের কম নয়। অন্যান্য কিছু গবেষণায় এই সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি উল্লেখ করা হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যে আয়করের বাইরে থেকে যাচ্ছে তার ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেমন অর্থসংকট তৈরি হচ্ছে তেমনি বৈদেশিক সাহায্যের ওপরও নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
আয়করদাতার সংখ্যা কম হলেও প্রতি বছর বাংলাদেশে বাড়ছে বাজেটের আকার এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা। চলতি বছর আয়কর রেয়াতের কিছু সুবিধা কমে যাওয়ায় কোনো কোনো আয়করদাতাকে গুনতে হচ্ছে বেশি অর্থ। যেখানে অনেকে আয়কর দিচ্ছেন না বা বড় ব্যবসায়ীরা ফাঁকি দিচ্ছেন সেখানে মধ্যম আয়ের আয় করদাতাদের ওপর চাপ পড়ায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ। তবে সার্বিকভাবে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। গত ২ বছর ধরে রিটার্ন দাখিল ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০১৪ সালে করদাতা ছিল ১২ লাখ। মাত্র ৫ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই সংখ্যা ১ কোটিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (আন্তর্জাতিক করনীতি) কালিপদ হালদার বলেন, এনবিআরের লক্ষ্য এখন করদাতার সংখ্যা ১ কোটিতে উত্তীর্ণ করা। সামাজিক ভারসাম্য ও দায়িত্ব বজায় রাখার জন্য আয়কর দিতে হয়। করদাতাদের ভেতর আয়কর নিয়ে আগে নেতিবাচক ধারণা ছিল। কিন্তু আয়কর মেলা ও দিবস পালনের মাধ্যমে তা অনেকটা দূর হয়েছে। কর আদায়ের পরিমাণ দশ গুণ বাড়ানো গেলে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি বলেন, রিটার্ন দাখিল গত ২ বছর ধরে ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে। সক্রিয় করদাতা এখন ১৫ লাখ, যখন তা ১ কোটি হবে তখন দেশের আরও বেশি উন্নয়ন হবে। কর অনুপাত ১২ শতাংশে নিয়ে যেতে পারলে অর্থনীতি মজবুত হবে।