প্রতিবেদন

ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গা: সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজেদের ভিটে-মাটি ছেড়ে আসা প্রায় ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার ঠিকানা এখন কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি আশ্রয় ক্যাম্প। শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের কেবল আশ্রয়ই দেয়নি তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে নেয় নানা উদ্যোগ। আরও একটু ভালো রাখতে বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনীর সহায়তায় ভাসানচরে গড়ে তুলেছে স্বতন্ত্র আরেকটি ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
তবে এ প্রক্রিয়া শুরু আগে প্রায় প্রতিদিনই ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে রোহিঙ্গা আটকের খবর। মূলত শরণার্থী শিবির থেকে কাজের সন্ধানে ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হলেও রোহিঙ্গাদের পালানো রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনুপাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কম। রোহিঙ্গাদের ভাষা, চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ স্থানীয়দের সঙ্গে অনেক মিল। যার কারণে রোহিঙ্গারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে ক্যাম্প ত্যাগ করছে।
আটক রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, এনজিও কর্তৃপরে দেয়া সহায়তায় ভরণ-পোষণের চাহিদা না মেটার কারণে তারা কাজের সন্ধানে ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অনেকে জানিয়েছে, তাদের আত্মীয়স্বজন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের হালিশহর, পাথরঘাটা, বাকলিয়া, কক্সবাজার, রামু এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। মূলত এসব আত্মীয়ের সহায়তা নিয়ে তারা বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও গার্মেন্টসে চাকরির চেষ্টা করবে। কাজের খোঁজ ছাড়াও শরণার্থী শিবিরের মানবেতর জীবনযাপন থেকে মুক্তি পেতে এবং সচ্ছলতার আশায় স্থানীয় দালাল চক্রের সহযোগিতায় বিদেশ পাড়ি দেয়ার ইচ্ছায়ও অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছে। ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া অনেকেই আবার আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়ে ইয়াবা পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া ঠেকাতে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের একাধিক পয়েন্টে বসানো হয়েছে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির চেকপোস্ট। কিন্তু এসব চেকপোস্টে দায়িত্বরতদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ক্যাম্পগুলোর চারপাশে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া অথবা স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, চেকপোস্ট পার হতে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানোসহ তাদের নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে কিভাবে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা চেকপোস্ট অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে তা এক বিস্ময়। তারা জানান, উখিয়ার ফলিয়াপাড়া সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভোরে রোহিঙ্গারা কাজের সন্ধানে বের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া বেশ কিছু রোহিঙ্গাকে আটক করে উখিয়া থানা পুলিশ। তারা জানায়, হাতে কোনো কাজ না থাকায় অল্প টাকায় বিদেশ যাওয়ার আশায় ক্যাম্প ছেড়েছিল। কিছুদিন আগে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের মরিচা চেকপোস্টে ধরা পড়ে উখিয়ার বালুখালি রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারী ওজি উল্লাহ। তখন আটকের পর উখিয়া থানায় আনা হলে সে সাংবাদিকদের জানায়, প্রচ- গরমে ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে পলিথিনের ছাউনিতে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাসা ভাড়া নিয়ে আপাতত থাকার জন্য কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছি।
গত কয়েক দিনে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৭১ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে গত ১৪ মে রাতে উখিয়ার উপকূলীয় জালিয়া পালং ইউনিয়নের লম্বরিপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে উখিয়া থানা পুলিশ। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকার খিলতে থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২৩ রোহিঙ্গাকে আটক করে। খিলতে থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান তখন জানিয়েছিলেন, একটি দালালচক্রের মাধ্যমে ক্যাম্প ছেড়ে রাজধানীতে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা। আটক রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবীর চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তাই তাদের ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া অথবা সীমানাপ্রাচীর দেয়া প্রয়োজন। এটা করা হলে এলাকার শ্রমবাজার রার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ ছাড়া ইয়াবা পাচারও অনেক কমবে।
কক্সবাজার জেলা পরিষদ সদস্য ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর চৌধুরী বলেন, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর এতগুলো চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা যেভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে তা উদ্বেগজনক। আমার মতো মানুষকে পাঁচ থেকে সাতবার পরিচয়পত্র দেখিয়ে কক্সবাজার যেতে হচ্ছে। তাহলে রোহিঙ্গারা কিভাবে এসব চেকপোস্ট পার হচ্ছে তা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। তারা এভাবে ছড়িয়ে পড়লে যেকোনো সময় বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মূল সড়কে পুলিশের ৭টি চেকপোস্ট রয়েছে। তারপরও রোহিঙ্গারা কিভাবে এসব চেকপোস্ট পার হতে পারছে তা খতিয়ে দেখা হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে রাখাইন রাজ্যে সীমান্ত ফাঁড়িতে হামলার মধ্য দিয়ে আরসার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের অধিকারকে সামনে রেখেই তাদের আবির্ভাব। মিয়ানমার সরকার তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে আরসাকে উৎখাত করতে রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু করে। এক পর্যায়ে গ্রামের পর গ্রামে আগুন লাগিয়ে বাস্তুহারা করা হয় রোহিঙ্গাদের। ফলশ্রুতিতে জীবন বাঁচাতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞের পর সবমিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসে।