কলাম

চাঁদ কি হবে মানুষের নতুন ঠিকানা?

সুধীর সাহা
জলবায়ু সমস্যা (যা অনেকাংশেই ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলে পরিচিত) নিয়ে সারাবিশ্ব ভবিষ্যতে চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে Ñ আজকের বিজ্ঞান এটুকুই আগাম আভাস দিচ্ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ যদি আগামীকাল সমুদ্র জলরাশিকে সমুদ্রসীমার ওপরে তুলে আনে, তবে মানুষ-জীবজন্তু আর গাছপালা তাদের ঠিকানা খুঁজতে ন্যূনতম মাটি খুঁজে না-ও পেতে পারে। আজ যে শিশু কিংবা যুবা মনের আনন্দে খালি জায়গাটুকুতে পিকনিক করে বেড়াচ্ছে, তাদের জীবদ্দশাতেই সেই শুকনো জায়গাটুকু সি-লেভেল বা সমুদ্রস্তর অতিক্রান্ত পানির গহ্বরে পড়ে যেতে পারে। সমুদ্রের গহ্বরে লুকিয়ে যেতে পারে আজকের অধিকাংশ জনপদ। শুধু এটুকুই নয়, বিলিয়ন মানুষের বসবাসের বড় অংশ যদি চলে যায় সমুদ্রের গর্ভে, তাহলে জেগে থাকা অল্প জায়গাজুড়ে এত মানুষের ভর কেমন করে সইবে সেই সময়ের ছোট্ট ধরণী? এটুকুই শেষ নয়। বসবাসের অযোগ্য হতে পারে জেগে থাকা অংশটিও। ভয়াবহ গরমে টিকতে পারাটা সহ্যসীমার বাইরে চলে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা সেই ১৯৯৮ সাল থেকেই ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর ভয়াবহতার কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু তখন তাদের কণ্ঠে ছিল ধীরগতি। যথাযথভাবে তা পৌঁছেনি মানবসমাজের কাছে। হালকা করে দেখেছে সবাই। কিন্তু আজ যখন দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৮ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত দ্বিগুণ হয়েছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং, তখন ভ্রƒ কুঁচকে তাকিয়েছে কেউ কেউ। ২০১৭ সালের মে মাসে অ্যান্টার্কটিকার ১১ মাইলব্যাপী একটি বরফচাঁই মাত্র ৬ দিনে ভেঙে গিয়েছিল। তারপর বরফ গলা বেড়েই চলেছে। একদিকে বরফ গলে সমুদ্রের জলসীমা বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে বরফ গলে যাওয়ায় ঠা-া প্রকৃতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এছাড়াও বরফ গলে সমুদ্রের জলরাশি নতুন নতুন ভূমি দখল করে নিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর এই ভয়াবহতা কোনো সাধারণ ভয়ের বিষয় নয়, এটি নীরবে খেতে এসেছে বিশ্ব জনপদকে Ñ এমনটাই বলেছিলেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হানসেন ২০১৬ সালে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামী এবং এশিয়ার বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে অনেক বিজ্ঞানীর মুখ থেকে। অনেকেরই ধারণা, এখনো টিকে থাকা মায়ামী এবং বাংলাদেশ আগামী শতকে হারিয়ে যেতে পারে সমুদ্রের গর্ভে। পুরোটা না হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অনেক বেশিমাত্রায়। মাত্র এক শ’ বছর পরই বাংলাদেশের বুকে ঘটে যেতে পারে এমন ভয়াবহ ঘটনাটি। আমরা বর্তমান সময়ে বেঁচে থাকা মানুষ হয়ত সরাসরি এর ভুক্তভোগী না-ও হতে পারি। কিন্তু আগামী প্রজন্মে আসছে যে শিশু, সেই শিশুরা তাদের জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারে বাংলাদেশের এই ভয়াবহ রূপ। জাতিসংঘের অধীনে জলবায়ুর এই পরিবর্তন নিয়ে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। সম্প্রতি একটি রিপোর্ট এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে যে, আমরা পৃথিবীর মানুষ যেভাবে চলছি সেভাবেই যদি চলতে থাকি, তাহলে আগামী একশ’ বছরে পৃথিবীর উষ্ণতা ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আজকের দিনে পৃথিবীর যেখানে যখন যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে, একশ’ বছর পর সেখানে যোগ হবে আরো ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কেউ কেউ এই উষ্ণতা ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইতিহাস বলে, ২৫২ মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীতে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে তখন পৃথিবীর ৯৭ ভাগ জীবন মৃত্যুবরণ করেছিল। বর্তমানে আমরা পৃথিবীর মানুষ শতকরা ১০ ভাগ অধিক হারে কার্বন নিঃসরণ করছি। তাইতো স্টিফেন হকিং, এলটন মাস্কের মতো বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহ এবং চাঁদসহ অন্যান্য গ্রহে আগামী ৪০ থেকে এক শ’ বছরের মধ্যে বিকল্প বসবাসের জায়গা খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে অন্য একদল বিজ্ঞানী মত প্রকাশ করেছেন যে, এ মিশন কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন করে এখনও বাঁচার পথ খোলা আছে। এই দুই দলের কাছ থেকে যে পরামর্শই আসুক না কেন, বিষয়টি যে গভীরভাবে চিন্তাযুক্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সভ্যতার আদি থেকেই মানুষের চন্দ্র বিজয়ের ইচ্ছে প্রকাশ পেয়েছে বহু মাত্রায়। কবির কথাতেও উঠে এসেছে Ñ ‘অভিলাসী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় …পাক সামান্য ঠাঁই।’ মহাকাশ বিজ্ঞানের সাফল্যে মানুষ চাঁদে পা ফেলেছে সেও বহুদিন হলো।
পৃথিবী যখন মানুষকে নিরাপদে ধারণ করতে অম হবে, তখন চাঁদে গিয়ে মানুষ আশ্রয় পাবে Ñ এমন ধারণা থেকেই চাঁদ দখলের পরিকল্পনা চলছে তাদের মধ্যে। তবে চাঁদে ঘর বাঁধার স্বপ্ন যাদের, তাদের পকেটের দিকে তাকাতে হবে সবার আগে। পরাশক্তি যদি চাঁদ দখল নিয়ে নেয় এবং তারা যদি গবেষণা করে এ জায়গায় যেতে পারে যে, চাঁদে বসবাস নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ বিদ্যমান, তবে শুরু হয়ে যাবে চাঁদে যাওয়ার হিড়িক। এখনই হয়ত এর প্রয়োজনীয়তা পৃথিবীর মানুষ অনুধাবন করছে না। কেননা বিজ্ঞানীদের মতে, কমপে আরো একশ বছর মানুষ এখানে নিরাপদে আছে। তবে কি একশ বছর পর চাঁদ, মঙ্গল কিংবা অন্য কোনো গ্রহ হবে মানুষের বসবাসের নতুন ঠিকানা?
আমরা পৃথিবীর মানুষ বিশ্বাস করি, একসময় এ পৃথিবীতেও ছিল ডাইনোসরের বসবাস। জলবায়ুর কঠিন বাস্তবতায় তারা একদিন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। জলবায়ুর আর এক কঠিন বাস্তবতায় কি একদিন অন্য গ্রহ থেকে মানুষ বুঝবে যে, একদিন এই পৃথিবীতেও মানুষের অস্তিত্ব ছিল? তাই কি পরাশক্তি আর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এত হইচই চাঁদকে নিয়ে? চাঁদ কি একদিন পানি, ফসল আর সম্পদ দিয়ে সাহায্য করবে পৃথিবীর মানুষকে? চাঁদ কি হবে আগামী শতাব্দীর মানুষের বসবাসের ঠিকানা? পৃথিবীর তাবৎ মানুষ ইতোমধ্যেই চাঁদে যাওয়ার পথ খোঁজা শুরু করে দিয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর সম্পদশালী মানুষই কি একদিন শুধু চাঁদে যেতে পারবে, নাকি সেই সময়ে বেঁচে থাকা পৃথিবীর সব মানুষই যেতে পারবে? নাকি পৃথিবীর মানুষ জলবায়ু সমস্যার সমাধান করে পৃথিবীকেই তাদের বসবাসের উপযোগী করে তুলবে আগামী শতাব্দীগুলোতে? সামনের দিনগুলোই হয়ত এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
তবে শক্তিশালী দেশগুলোর ভাব দেখে মনে হয়, তারা পৃথিবীর জলবায়ু সমস্যা সমাধানে ততটা মনোযোগী নয়, যতটা তাদের হওয়ার কথা। উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থেই হয়ত তারা এর উন্নতিকল্পে তেমন মনোযোগী নয়। অন্যদিকে তাদের কাছে হয়ত চাঁদ বিকল্প বসবাসের জায়গা হতে পারে এমন বিশ্বাস এনে দিচ্ছে। পরিস্থিতি যদি তেমনই হয়, তবে অনুন্নত দেশ এবং পৃথিবীর গরিব মানুষের সামনে শতাব্দীর পর এক নতুন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে যাবে। দারিদ্র্যের জন্য তখন চাঁদে যাওয়া হতে পারে আকাশকুসুম কল্পনার বস্তু।
সর্বশেষ খবরটি দিয়েই শেষ করতে চাচ্ছি আজকের লেখাটা। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও মার্কিন শপিং পোর্টাল আমাজনডটকম-এর মালিক জেফ বেজোস একই সঙ্গে মহাকাশ সংস্থা ব্লু ওরিজিন-এরও প্রধান। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ২০২৪ সালের মধ্যেই তার সংস্থা চাঁদে মানুষ পাঠাবে। ৬ দশমিক ৫ মেট্রিক টন ওজনের মহাকাশ যান ‘ব্লু মুন’ অনায়াসেই চাঁদে অবতরণ করতে পারবে বলে তিনি জানান। তিনি দাবি করেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণার সরঞ্জাম ছাড়াও এই যানে করে মানুষ চাঁদে পাড়ি দিতে পারবে।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা