প্রতিবেদন

তরল দুধেও ভয়ংকর ক্ষতিকর রাসায়নিক

সাদেক মাহাবুব চৌধুরী
সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার লোকের মধ্যে কম-বেশি ভেজাল লক্ষ্য করা যায়। খাদ্যপণ্যের মধ্যেও ভেজাল পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইদানীং সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর খাদ্যপণ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযান পরিচালনাকালে দেখা যায়, অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ন্যায় বাজারে প্রচলিত তরল দুধের মধ্যেও ভেজাল পাওয়া যায়। যে দুধকে বলা হয়ে থাকে আইডিয়াল ফুড, সেই দুধেই এখন ভেজাল!
বাজারের ৯৬ তরল দুধের নমুনা পরীা করে ৯৩টিতেই সীসাসহ মানবদেহের জন্য তিকর উপাদান পেয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ। এছাড়া ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে করা পরীা নিয়ে তৈরি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপরে আরেকটি প্রতিবেদনের সারসংেেপ বলা হয়েছে।
১. কাঁচা তরল দুধের ৯৬ নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার মধ্যে অনুজৈবিক বিশ্লেষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯৩ নমুনাতে টিপিসি ও তিকর মাত্রায় কলিফর্ম বিদ্যমান এবং একটি নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া গেছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫ নমুনাতে সীসা, ৩টিতে আফলাটক্সিন, ১০টিতে টেট্রাসাইকিন, ১টিতে সিপ্রোফক্সাসিন এবং ৯টিতে পেস্টিসাইড (এ্যান্ডোসালফান) তিকর মাত্রায় পাওয়া যায়।
২. প্যাকেটজাত তরল দুধের ৩১ নমুনার (দেশি ২১ এবং আমদানি করা ১০) মধ্যে ১৭ দেশি দুধের নমুনাতে টিপিসি ও কলিফর্ম কাউন্ট, ১৪টিতে মোল্ডস এবং আমদানি করা তরল দুধের একটি নমুনাতে কাউন্ট তিকর মাত্রায় কলিফর্ম বিদ্যমান। রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশি দুধের একটি নমুনাতে আফলাটক্সিন, ৬টিতে টেট্রাসাইকিন এবং আমদানি দুধের ৩টিতে টেট্রাসাইকিন তিকর মাত্রায় রয়েছে। ৩. দইয়ের ৩৩ নমুনার ১৭টিতে টিপিসি, ৬টিতে পলিফর্ম কাউন্ট, ১৭টিতে ইস্ট/মোল্ড এবং ১টিতে সীসা তিকর মাত্রায় বিদ্যমান।
৪. পশুখাদ্যের ৩০টির মধ্যে ১৬টিতে ক্রোমিয়াম, ৪টিতে আফলাটক্সিন, ২২ নমুনায় টেট্রাসাইকিন, ২৬টিতে এনরোফক্সাসিন, ৩০টিতে সিফরোফক্সাসিন এবং ২টিতে পেস্টিসাইড (এন্ডসালফান) তিকর মাত্রায় পাওয়া গেছে।
ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, দেশে পুষ্টির অন্যতম প্রধান জোগানদার হিসেবে বিবেচিত গরুর দুধ বা দুগ্ধজাত খাদ্যে এবার মিলেছে শরীরের জন্য তিকর নানা উপাদান। তবে প্রতিবেদনে কোন কোন কোম্পানির দুধে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে তা সুনির্দিষ্ট না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট।
তরল দুধ দৈনন্দিন জীবনে খুব প্রয়োজনীয়, বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই এর ভোক্তা। তরল দুধে যদি রাসায়নিক উপাদান থাকে তাহলে দুগ্ধজাত খাদ্যে ওই সব রাসায়নিক প্রবেশ করতেই পারে। এগুলো খেলে শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

নিরাপদ দুধ চিনবেন যেভাবে
দুধ নিয়ে সবার কমন প্রশ্ন হলো খামারের টাটকা দুধ না দোকানের প্যাকেটজাত দুধ নাকি টেট্রাপ্যাকের দুধ, কোনটা শরীরের জন্য বেশি নিরাপদ?

অপাস্তুরিত দুধ
খামার থেকে নিয়ে আসা দুধ অপাস্তুরিত থাকে। এই দুধে কোনো রাসায়নিক থাকে না। দুধওয়ালারা এই দুধ আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এই দুধ অর্গানিক বা ইনঅর্গানিক দু’ধরনের হতে পারে। গবাদি পশুকে যে খাবার খাওয়ানো হয়, তাতে যদি কোনো ধরনের রাসায়নিক যোগ না করে বরং ঘাস, লতাপাতা খাওয়ানো হয়, সে গরু থেকে পাওয়া দুধকে অর্গানিক বা জৈব দুধ বলে। প্রাকৃতিক উপায়ে লালনপালন করা ওই সব খামারে গরু বা মহিষকে দুধের জন্য হরমোন বা ওষুধের ইনজেকশন দেয়া হয় না। অন্যদিকে বেশি দুধ পাওয়ার আশায় যেসব গরুকে ইনজেকশন দেয়া বা ওষুধ খাওয়ানো হয়, তাদের দুধ ইনঅর্গানিক বা অজৈব।

অপাস্তুরিত দুধ কেন তিকর
গ্রামের খামার থেকে যে দুধ সংগ্রহ করা হয়, তাতে পুষ্টিগুণ বেশি থাকে ঠিক, তবে বেশিরভাগ খামারের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন থাকায় সেখান থেকে সংগৃহীত দুধে তিকর উপাদান থাকতে পারে, যা শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

প্যাকেটজাত দুধ
প্যাকেটজাত দুধ পাস্তুরিত হয়ে থাকে। কারণ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দুধ গরম করে ও পরে ঠা-া করে প্যাকেটে ভরা হয়। এ ধরনের দুধ তিন প্রকার হয়, টোনড (পানি, গুঁড়ো দুধ মেশানো), ডাবল টোনড (ফ্যাট কমিয়ে অন্য উপাদান বাড়ানো) ও পূর্ণ ননীযুক্ত ফুলক্রিম মিল্ক। তিন ধরনের দুধে তাই পুষ্টিগুণ আলাদা থাকে।

টেট্রাপ্যাক দুধ
অতি উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করে দুধকে জীবাণুমুক্ত রাখতে টেট্রা প্যাকেটে ভরে বাজারে ছাড়া হয়। এসব প্যাকেটে ছয় স্তরে দুধ সংররিত থাকে। আর তাই খামারের দুধ বা প্যাকেটজাত দুধের তুলনায় এই দুধ বেশিদিন অত থাকে।
এর ফলে বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে তিন উপায়ে বাজারে তরল দুধ পাওয়া যায়, তারমধ্যে টেট্রাপ্যাকের দুধ বেশি নিরাপদ। খামারের দুধে যেমন বিভিন্ন জীবাণু থাকতে পারে, তেমনি প্লাস্টিকের প্যাকেটে থাকা দুধে ওই প্যাকেট থেকে রাসায়নিক দুধে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা করেন গবেষকরা। কেউ কেউ পাস্তুরিত দুধে কিছুটা পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার কথা বললেও যে উপায়ে টেট্রাপ্যাকে দুধ সংরণ করা হয়, তা শরীরের জন্য, বিশেষ করে উঠতি বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা।