রাজনীতি

নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সংসদে যোগদানের পরও খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ!: বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

বিশেষ প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না, পরে শেষ মুহূর্তে অজানা কারণে বিএনপি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল Ñ ‘আপনার একটি ভোট খালেদা জিয়ার মুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে’। তবে ভোটারদের মধ্যে এই স্লোগান তেমন প্রভাব ফেলেনি। তাইতো এবার বিএনপির ভোট বিপ্লবের বিপরীতে উল্টো ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নেমে আসে দলের এমপি সংখ্যা! ভোটে এমন ভরাডুবির পর বিএনপি বায়না ধরে, তারা শপথ নেবেন না, সংসদেও যাবেন না।
তবে সময় গড়াতেই পূর্বের মতো শেষ মুহূর্তে রহস্যজনক কারণে তারা শপথ নেন, সংসদেও যান। বিএনপির এমন অবস্থান বদলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি অত্যাসন্ন। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়েছেন এবং সংসদে গেছেন। তবে দিন যত গড়াচ্ছে, এমন অনুমান মিথ্যে হতে চলেছে। এ কারণে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরাও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নাখোশ।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুটি সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপিসহ অনেকেই ভেবেছিলেন খুবই অল্প সময়ের জন্য খালেদা জিয়া কারাগারে গেছেন এবং জামিনে বের হয়ে আসবেন। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি। আর এতে হতাশ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী। নানা কারণে হতাশ তারা – নির্বাচনে আশাতীত পরাজয়, খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ, অজানা কারণে দলের নির্বাচিতরা সরকারের সাথে সংসদে। সব মিলিয়ে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন বেশ অন্ধকারে। তারা দলের কর্মকা-ে বেশ অখুশি ও হতাশ।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে সংসদে যোগদানের কারণে সাধারণ মানুষের ন্যায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরাও আশা করেছিলো খালেদা জিয়ার মুক্তি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সময় যতই গড়াচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। নেতাকর্মীরা আশা করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি খালেদা জিয়া এখান থেকেই মুক্তি পাবেন। কিন্তু সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে জানা গেল, শিগগিরই হাসপাতাল থেকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে খালেদা জিয়াকে স্থানান্তর করা হবে।
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে সরকার ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে কথাবার্তা এখনও চলছে। তবে তার মুক্তি নিয়ে দু’পক্ষই শর্ত আরোপ করছে। সব মিলিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মুক্তি মিলবে কি অথবা মিললে কতদূর – এমন প্রশ্ন এখন সর্বমহলে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৬ মামলার মধ্যে সাজা হয়েছে দুটিতে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত ৫ বছর কারাদ- দেয়ার পর হাইকোর্টে সাজা বেড়ে হয় ১০ বছর। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে ৭ বছর কারাদ- দিয়েছে নিম্ন আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তার আইনজীবীরা। বাকি ৩৪ মামলার মধ্যে গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ ১৩টি মামলা বিচারাধীন। আর হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে ২১ মামলা। বর্তমানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানি এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ান জারি রয়েছে। সর্বশেষ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে ৮ জনকে হত্যার মামলায় বেগম জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ বহাল রাখে আপিল বিভাগ।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, বেগম জিয়ার মুক্তি পেতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলনে যাবে বিএনপি। এজন্যই দল গোছানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৪০টি জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারেক রহমান। দল গোছানোর পাশাপাশি মায়ের মুক্তি আন্দোলন নিয়েও কথা বলছেন তিনি। আগামী ৩ মাসের মধ্যেই দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলো গুছিয়ে তুলতে চান তারেক রহমান। বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে। ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটিও শিগগিরই দেয়া হবে। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও কাজ চলছে। কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল, ড্যাব ও এ্যাবের আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে। মহিলা দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অসম্পূর্ণ কমিটিও দেয়া হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দল গুছিয়েই আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে যাবো। তার নেতৃত্বেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় করবো।
সূত্রমতে, সরকার বলছে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশ চলে যেতে হবে। সেখানে তিনি শারীরিক চিকিৎসা করাতে পারবেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো কথাবার্তা বলতে পারবেন না। সেইসঙ্গে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংসদেও যেতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সরকার তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার বর্তমান শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত অবস্থা বিবেচনায় বেগম জিয়াকে জামিনে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। মুক্তি পেয়ে তিনি যেখানে খুশি চিকিৎসা নিতে পারবেন। সুস্থ হয়ে রাজনৈতিক কর্মকা-েও যুক্ত হতে পারবেন।
বিএনপি নেতারা দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি দাবি করলেও প্যারোল চাওয়ার বিষয়ে কিছুই বলছেন না। প্যারোলে মুক্তি চাওয়ার আবেদন একান্তই বেগম জিয়ার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলেও দলটির শীর্ষ স্থানীয় অনেক নেতাই জানিয়েছেন।
এমন আলোচনার মধ্যেই গণমাধ্যমে খবর এসেছে, খালেদা জিয়ার জন্য কেরানীগঞ্জ নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার প্রস্তুত করা হয়েছে। ৩ বছর আগে চালু হওয়া এই কারাগারের ভেতর নারী বন্দিদের জন্য নির্মিত ৩টি ভবনের ১টিতে তাকে রাখা হবে। এই একতলা ভবনের একটি কক্ষে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে থাকবেন খালেদা জিয়া। তবে ঠিক কবে নাগাদ তাকে এই কারাগারে স্থানান্তর করা হতে পারে, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি বলে জানিয়েছেন কারা কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে প্রায় ৩০০ নারী বন্দির জন্য কারা কর্তৃপক্ষ একটি কম্পাউন্ড তৈরি করেছে। সেখানে দুটি চারতলা ভবন আর একটি একতলা ভবন রয়েছে। একতলা ভবনটি কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে। সেখানে ডিভিশনপ্রাপ্ত ভিভিআইপি বন্দিদের রাখা হবে। এই ভবনের একটি সেলেই থাকবেন খালেদা জিয়া।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষ হলে খালেদা জিয়াকে আর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে নেয়া হবে না, তাকে কেরানীগঞ্জে নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হবে Ñ এ নিয়ে ১৩ মে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। মন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই খালেদা জিয়াকে কবে নাগাদ কেরানীগঞ্জে নেয়া হচ্ছে, এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়।
খালেদা জিয়াকে স্থানান্তরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে নবনির্মিত ২ নম্বর ভবনে অস্থায়ী এজলাস বসানো হয়েছে। ১৪ মে এ এজলাসে বসে ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ সৈয়দ দিলজার হোসেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাটকো দুর্নীতির মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি আবার পিছিয়ে ১৯ জুলাই নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এখন থেকে এই এজলাসে খালেদা জিয়ার মামলার বিচার হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনও হতে পারে আগামী ১৯ জুলাই আদালতে হাজিরার যে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, সেদিনও খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে স্থানান্তর করা হতে পারে। সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ অবস্থান থেকে বুঝা যাচ্ছে সহসা খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনাটি ক্ষীণ।