প্রতিবেদন

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ১ বছরের অর্জন ও একটি মূল্যায়ন

শাহিনা মনি
গেল ১২ মে পূর্ণ হলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ১ বছর। ২০১৮ সালের ১১ মে রাত ২টা ১৪ মিনিটে স্যাটেলাইটটি যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করে মহাকাশ প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্পেস এড়। সেই হিসাবে ১২ মে হলো বর্ষপূর্তি।
বাংলাদেশের এই প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর দেশব্যাপী ই-এডুকেশন, ই-লার্নিং, টেলি-মেডিসিনসহ আরও নানা সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। এসবের কতটা পূরণ হয়েছে গত ১ বছরে? বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে টেলিযোগাযোগ স্থাপন, নিরবচ্ছিন্ন সম্প্রচার সেবা নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক বা ট্রান্সমিশন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন ব্যাহত না হয়। তাছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনগুলোকে এই স্যাটেলাইটের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। তবে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎক্ষেপণের ১ বছরেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আয় করা সম্ভব হয়নি। সেই সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকায় শহরের মতো সুবিধা দিতে ই-এডুকেশন, ই-লার্নিং, টেলি-মেডিসিন অর্থাৎ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এখনও সম্ভব হয়নি। ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) সুবিধা বাণিজ্যিকভাবে চালু করাও এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, যার আওতায় সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল নিয়ে গ্রাহকদের ১২৫টি চ্যানেল সম্প্রচারের কথা ছিল।
স্যাটেলাইটটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড-বিসিএসসিএল বলছে, এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কার্যক্রম জুড়ে রয়েছে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাফ ফুটবল গেমসের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার এবং স্যাটেলাইটটির ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করে বিটিভিসহ কয়েকটি বেসরকারি চ্যানেলের কিছু অনুষ্ঠানের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার। এ অবস্থায় স্যাটেলাইটটি থেকে যেমন সুবিধা ও মুনাফা পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল সেগুলো কবে নাগাদ পাওয়া যাবে সেটা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য জানাতে পারছেন কর্মকর্তারা।
অবশ্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছেন, এই স্যাটেলাইট থেকে আয় করা অবশ্যই সম্ভব। তবে এজন্য সময় লাগবে। আমরা শিগগিরই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সম্প্রচার শুরু করবো। এখন কোনো আয় না থাকলেও এটা আয়ের পথ তৈরি করেছে। স্যাটেলাইটটির যে মেয়াদ, তার মধ্যে এর নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ ব্যয়ের পুরোটা তুলে নেয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদী।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।
উৎক্ষেপণের সময় থেকে স্যাটেলাইটটির মেয়াদকাল ১৫ বছর বলা হলেও এখন তা আরও ৩ বছর বাড়িয়ে ১৮ বছরে সম্প্রসারিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এই মেয়াদের আগেই খরচ তুলে নেয়া, সেই সঙ্গে মুনাফা করার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্যাটেলাইটটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড-বিসিএসসিএল চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. শাহজাহান মাহমুদ।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ নভেম্বর দেশের প্রথম এই কৃত্রিম উপগ্রহের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে প্রায় ছয় মাস স্যাটেলাইটটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণে ছিল ফ্রান্সের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস।

যে কারণে স্যাটেলাইট
থেকে আয় করা যায়নি
স্যাটেলাইটটি তৈরির সময় এর যে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল সেখানে বলা হয়েছিল যে এই স্যাটেলাইট প্রথম কয়েক বছরের মাথায় খরচ উঠিয়ে মুনাফা করবে। তবে তখন বাজারে স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইডথের যে দাম ও সরবরাহ ছিল, সেটা এখন একদমই বদলে গেছে বলে জানান বিসিএসসিএল-এর চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। তিনি বলেন, এখন অনেক দেশ স্যাটেলাইট তুলেছে, সরবরাহ অনেক বেড়ে গেছে। যার জন্য শুরুতে ব্যান্ডউইডথের যে দাম ছিল সেটা এখন আর নেই। তাই প্রথমে আমরা যেটা ভেবেছিলাম যে ৫-৭ বছরে খরচটা তুলে আনতে পারবো, সেটা আর হচ্ছে না। তবে আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো যদি আমাদের স্যাটেলাইট থেকে ব্যান্ডউইডথ কেনে, তাহলে সেটা সম্ভব হবে। আর সামনে প্রত্যন্ত এলাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলি মেডিসিন সেবা দেয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ১৯ মে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ থেকে ব্যান্ডউইডথ ব্যবহারের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্জনে সরকার তাদেরকে ৩ মাস ফ্রিতে ব্যান্ডউইডথ ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এরপর তারা ব্যান্ডউইডথ কিনতে রাজি হলে সরকার আয় করতে শুরু করবে।
তিনি জানান, দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো বিদেশি স্যাটেলাইটের ব্যান্ডউইডথ সার্ভিস নিতে যে খরচ করতো সেটা আমাদের স্যাটেলাইটে হবে না। তাছাড়া বিদেশে টাকা পাঠানোর ঝামেলাও তাদের পোহাতে হবে না। আমাদের সিগনাল অনেক শক্তিশালী, সেটা যাচাই করতে তারা ৩ মাস ফ্রি চালানোর সুযোগও পাবেন। সব দিক বিবেচনায় তাদের লাভই বেশি। এছাড়া বিভিন্ন সেবায় লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকার রাজস্ব বাড়তে থাকবে বলেও জানান তিনি।
শাহজাহান মাহমুদ আশা প্রকাশ করে বলেন, বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ থাকায় দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেদের ব্যান্ডউইডথে নির্ভরশীল হতে আগ্রহী হবে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোকে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. শাহজাহান বলেন, ১৯ মে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন থেকে দেশের সবগুলো টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে।
উল্লেখ্য, টিভি চ্যানেলগুলো আগে যে দামে ব্যান্ডউইডথ কিনত এখন সেই দামই দেবে। প্রতি মেগাহার্ডজ ২ হাজার ডলার করেই পরিশোধ করবে তারা। প্রতিটি টিভি চ্যানেলের ৪ থেকে ৬ মেগাহার্ডজ লাগে। তাদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ হাজার ডলার করে পাওয়া যাবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে ব্যান্ডউইডথ
কেনার আগ্রহ দেশ ও দেশের বাইরেও
দেশের বিভিন্ন ব্যাংক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ থেকে ব্যান্ডউইডথ কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড। এর কারণ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। এতে সাইবার হামলার ঝুঁকি কম থাকে। সেই সঙ্গে যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা পাওয়া সম্ভব, যেটা ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
বিসিএসসিএল-এর চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ব্যাংকগুলো তাদের বিভিন্ন শাখা অফিসে যোগাযোগ করতে বা এটিএম যন্ত্রগুলো পরিচালনা করতে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে। এই সময় ব্যাংকের জরুরি তথ্য হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই আশঙ্কা আর থাকবে না।
এদিকে ফিলিপিন্স, নেপালের মতো কয়েকটি দেশকে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেষ্টা চলছে বলেও জানান ড. শাহজাহান।
স্যাটেলাইট থেকে দেয়া হবে ডিটিএইচ সেবা
পরিকল্পনা মোতাবেক দেশের প্রত্যন্ত ৪০টি দ্বীপে ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) সুবিধা পুরোপুরি চালু করার আশ্বাসও দিয়েছেন বিসিএসসিএল চেয়ারম্যান। প্রাথমিকভাবে তারা পরীক্ষামূলকভাবে ডিটিএইচ অর্থাৎ বর্তমানে ক্যাবল টিভির যে সংযোগ আছে সেটির মান উন্নয়ন করার সুবিধা দেবেন যেন তারা কোনো ঝঞ্ঝাট ছাড়াই সেবা নিশ্চিত করতে পারে। ট্রিপল প্লে – অর্থাৎ ডিশ, ইন্টারনেট ও কলিং Ñ এ ৩টি সেবা একসাথে ডিটিএইচ-এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে।
শাহজাহান মাহমুদ বলেন, যেসব এলাকায় ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল নেয়া যায় না বলে টেলিফোন সার্ভিস বা ব্যান্ডউইডথ দেয়া সম্ভব হয় না এমন ৪০টি দ্বীপে সেবা দিতে আমরা একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছি, যার আওতায় আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে ওই দ্বীপগুলোকে আমরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করবো, যেন ওই সব এলাকায় এই স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইডথের মাধ্যমে টেলিফোন সার্ভিস, থ্রিজি সার্ভিস, ই-এডুকেশন, ই-লার্নিং, টেলি-মেডিসিন এমনকি ব্যাংকিং সার্ভিস দেয়া সম্ভব হয়।

সাইবার নিরাপত্তায়ও বঙ্গবন্ধু
স্যাটেলাইট ব্যবহারের উদ্যোগ
বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশে সাইবার নিরাপত্তায়ও কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্যাটেলাইটকে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে স্যাটেলাইটের ব্যান্ডউইডথ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেসরকারি একটি ব্যাংক এরই মধ্যে তার সবগুলো শাখা ও এটিএম বুথকে এই স্যাটেলাইটের ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করে চালানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা প্রস্তাবও দিয়েছে স্যাটেলাইট কোম্পানির কাছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএসসিএল) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ।

শেষ কথা
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের ফলে বাংলাদেশ অনন্য এক নতুন উচ্চতায় চলে গেছে। পাশাপাশি দেশে স্পেস সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে তো এটা নিয়ে পড়ার কথা আমাদের ভাবনাতেই ছিল না। এখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন গাজীপুরের দায়িত্ব নিয়েছে আমাদের ছেলে-মেয়েরাই। এটা অবশ্যই আশার কথা। পাশাপাশি আমরা দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কথা ভাবছি। সেটা করতে হলে অবশ্যই প্রথমটির বাণিজ্যিক যাত্রা সফল হতে হবে। সেক্ষেত্রে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। এর সুবিধার দিকগুলো সম্পর্কে অধিক হারে প্রচারণা চালাতে হবে। এখানে একটু বেশি মনোযোগ দরকার। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার সঙ্গে মর্যাদার আসনে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা আর বিদেশি অর্থায়ন ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যদিও শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট উড়াতে সর্বমোট খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।