প্রতিবেদন

বাংলাদেশিদের জন্য ফের উন্মুক্ত হচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে মালয়েশিয়া গমনকে নিরুৎসাহিত করার অংশ হিসেবে বৈধভাবে আবারও বাংলাদেশি কর্মী নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মানবসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর বৈঠকে পাওয়া গেছে এ আশ্বাস। আগামী ৩০ ও ৩১ মে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
গত ১৪ মে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তানশ্রি দাতো সেরি উতামা মহিউদ্দিন ইয়াসিন এবং মানবসম্পদমন্ত্রী তান কুলাসেগারানের সঙ্গে তাদের কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় আলাদা বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ।
বৈঠকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার শিগগিরই উন্মুক্ত হবে বলে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। এছাড়া বৈঠকে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে অর্থবহ আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে স্থগিত থাকা শ্রমবাজারকে উন্মুক্ত করা প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী তান কুলাসেগারান বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তার সরকার সবসময় ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। শিগগিরই বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে উভয় পক্ষই মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বিদেশি কর্মীদের হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হওয়াসহ নানা সমস্যা দ্রুত সমাধানের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।
উল্লেখ্য, দেশের জনশক্তি রপ্তানির ৮০ শতাংশ যায় মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় শ্রমবাজার। কিন্তু সৌদিতে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, আরব আমিরাতে সীমাবদ্ধতা, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে অনিয়মসহ নানা কারণে জনশক্তি রপ্তানি কমে এসেছে। এরপর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে নতুন কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। এতে অন্তত ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়া চালু করতে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) একাধিকবার বৈঠক করলেও সংকটের সুরাহা হয়নি। অভিযোগ তদন্তে মালয়েশিয়া সরকারের গঠিত স্বাধীন কমিটি এরই মধ্যে একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে উচ্চ আদালত ৬ মাসের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছিলো মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। এখন মন্ত্রণালয় সময় বাড়ানোর আবেদন করবে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, গত বছর একতরফা ও অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিযোগ ওঠে বাংলাদেশের ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে। এই ১০ এজেন্সি সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পায়। এর সঙ্গে জড়িত দুই দেশের সরকারি-বেসরকারি লোকজন। এই চক্রের বিরুদ্ধে সরকারি খরচের অতিরিক্ত ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি কর্মীকে ভিসা দেয়নি মালয়েশিয়া। তবে এর আগে ভিসা পাওয়া কর্মীরা সেপ্টেম্বরের পরও মালয়েশিয়া গেছেন। সব মিলিয়ে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন। আর গত বছরের প্রথম ৩ মাসে যেখানে কর্মী গেছেন ৩৮ হাজার ৮৬৫ জন, এ বছরের প্রথম ৩ মাসে সেখানে গেছেন মাত্র ৫৫ জন। অথচ গত বছর প্রতি মাসে গড়ে কর্মী গেছেন প্রায় ১৫ হাজার। এ হিসাবে বাজার চালু থাকলে গত ৮ মাসে নতুন করে ১ লাখের বেশি কর্মী চাকরি পেতেন বলে মনে করেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সবার জন্য সমান সুযোগ চায় জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। অতীতের মতো ‘কোনো ব্যক্তিবিশেষের নিয়ন্ত্রণে’ যেন এই বাজার না যায় Ñ এমন দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ১২ মে বায়রার পক্ষ থেকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত সুপারিশ জমা দেয়া হয়।
বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বন্ধ বাজার খুলতে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদের মালয়েশিয়া সফরকে স্বাগত জানানো হয়। সেই সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় এই বাজারটি খুলতে ৫টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশও করেন তারা। প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বায়রার সব সদস্যের জন্য উন্মুক্ত রাখাসহ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অভিবাসন প্রক্রিয়াটি যেন বায়রা পরিচালনা করতে পারে Ñ সে ব্যবস্থা করা। কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতিষ্ঠান যেন এটি পরিচালনা করতে না পারে, সে ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এছাড়া মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল চেকআপের জন্য বায়রা ও বিএমইটির পক্ষ থেকে মেডিকেল সেন্টার নির্বাচন করে দেয়ারও সুপারিশ করা হয়।
অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বায়রা, বিএমইটি ও মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয় প্রস্তাবে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় অভিবাসন পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির সঙ্গে বায়রা প্রতিনিধিকেও রাখার সুপারিশ করা হয়।
এ বিষয়ে বায়রা সভাপতি বেনজীর আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানিতে সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগের পাশে বায়রা অতীতেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমরা একে অন্যের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজারটি যেন খুব শিগগিরই উন্মুক্ত হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।