কলাম

ভূরাজনৈতিক অর্থনীতি ও বাংলাদেশ

চিররঞ্জন সরকার
চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ, ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর পঞ্চমবারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা, ভেনিজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে ২০১৯ সালের প্রথম ৪ মাসে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট নতুন মোড় নিয়েছে। ফলে বছরের শুরুতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যে গতি ছিল, বছরের শেষে গিয়ে তা শ্লথ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০১৯ সালের শেষে বিশ্ব কোন দিকে মোড় নিতে পারে, এ নিয়ে নানা ধরনের পর্যালোচনা চলছে।
অগ্রসরমান বিশ্ব অর্থনীতির গতি হ্রাস: আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, ২০১৮ সালে বিশ্বে ৩ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৯ সাল শেষে এটি ২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে যেতে পারে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর থেকে ইউরোপের অর্থনীতির নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। যদিও বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপানের প্রবৃদ্ধি সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে তা ১ শতাংশ ছাড়াবে না।
২০১৮ সালে তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গত ১০ বছরে সর্বনিম্ন। ২০১৯ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ নেমে যেতে পারে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যসংঘাত ২০১৯ সালে পূর্ণ রূপ নেয়, তবে এ হার আরও নিচে নেমে যেতে পারে। তাছাড়া তুরস্ক, দণি আফ্রিকা, আর্জেন্টিনার মতো দেশেও ২০১৮ সালের প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ধারা পুরোপুরি মন্দায় রূপ নিতে পারে। এছাড়া নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় জিডিপির তুলনায় সরকারের ঋণ গত ৪ বছরে ৩০ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। সুতরাং ২০১৯ সালে ঋণের জন্য দেয়া সুদ পরিশোধে খরচ বৃদ্ধির চাপ বাড়বে।
একাধিক্রমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও সুদ পরিশোধে খরচ বৃদ্ধির চাপ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক খাতের সমস্যাগুলো গভীরতর করে তুলবে এবং অতিদারিদ্র্য বিলোপ করার ল্য বাধাগ্রস্ত করবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশগুলোর অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে সাধারণ মানুষের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। অবশ্য ২০১৯ সালে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থে বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির েেত্র অনেকটাই চাপমুক্ত থাকবে।
যদিও আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০১৮ সালের ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার হবে, তবুও শতকরা হিসাবে এই ঋণের সুদ জিডিপিতে বড় প্রভাব ফেলবে না।
সংরণবাদ ও তার প্রভাব : নিশ্চিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংরণবাদী ধারা দেখা যাচ্ছে তা ২০১৯-এ আরও প্রকট হবে, যার মূল অনুঘটক হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্রেক্সিটের প্রভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি। ২০১৮ সালজুড়েই যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ছোট-বড় সব অর্থনীতির জন্যই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও বছর শেষে এই দুই পরে সুর নরম হয়েছে, তবুও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না। চিন্তার বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যসংঘাত শুধু এ দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলবে না, একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তা সারাবিশ্বে প্রভাব ফেলবে। তাতে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আরও একবার সর্বনাশা মন্দার শিকার হবে। আর শুধু চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সংঘাতই নয়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এর ফলে বিভিন্ন দেশ তাদের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্বিপীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হবে, যা হবে দীর্ঘ ও ব্যয়সাপে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপের হুমকির মুখে কানাডা, মেক্সিকো, জাপান ও দণি কোরিয়া একটি নিষ্পত্তিতে পৌঁছতে পারে; যা মার্কিন হুমকিকে কমিয়ে আনবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হলে বাণিজ্য অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে। বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সাময়িক সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে তৈরী পোশাকশিল্পে আমাদের রপ্তানি বাড়তে পারে। কিছু কিছু কাঁচামাল, যেমন তুলার দাম কমায় বংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই বাণিজ্যযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা বিশ্বব্যাপী মন্দা সৃষ্টি করলে আর সব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংরণবাদী ধারারই আরেকটি প্রকাশ হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসা (ব্রেক্সিট), যা নিয়ে ২০১৮ সালজুড়েই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল; যা কাটেনি নতুন বছরেও। সে অনিশ্চয়তা কতটা কাটানো সম্ভব হবে চলতি বছর আর শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পরিণতি ইউরোপ বা বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও দ্বিধা আছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অনিশ্চয়তায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে ব্রেক্সিট ইস্যুটি। কেননা শেষ পর্যন্ত কিসের ভিত্তিতে কোন চুক্তিতে ব্রেক্সিট কার্যকর করা হবে, তা পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাজ্য বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এই দেশের যেকোনো অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দেবে, সেটাই স্বাভাবিক। ব্রেক্সিট এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতেতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ফলে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই অর্থবছরের প্রথম ভাগে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ১৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে এই প্রবৃদ্ধি কমেছে ২০ দশমিক ৭ থেকে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
তাছাড়া ব্রেক্সিট-পরবর্তী অভিবাসন সংক্রান্ত কড়াকড়ি আরোপ হলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিরা কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের হাত ধরে বিশ্বের অন্য বড় বড় অর্থনীতির দেশ সংরণবাদী হয়ে উঠতে পারে এ বছর। এর প্রভাব কমানো না গেলে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। গত কয়েক দশকে দেশগুলো রপ্তানি শুল্ক কমিয়ে এনেছিল, ব্যবসার ব্যয়ও ছিল কম। কিন্তু বাজার আগের চেয়ে সংরণশীল হয়ে ওঠায় শুল্কের হার বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে ব্যবসার ব্যয়ও। একইভাবে অতি সংরণবাদ প্রবণতা বাংলাদেশের অর্থনীতেতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়াবে। বিশেষ করে যেসব দেশ বা অঞ্চলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত/কোটামুক্ত সুবিধা পেত, সেসব দেশে এ সুবিধা লোপ বা হ্রাস পেলে রপ্তানির েেত্র সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
অবশ্য এখনই তৎপর হয়ে বাংলাদেশ যদি দ্বিপীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে জোর দেয়, তবে এ ধরনের ঝুঁঁকি এড়ানো সম্ভব। এ প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে, বাংলাদেশ অনুন্নত দেশের কাতার থেকে বের হয়ে এলেই বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত/কোটামুক্ত সুবিধাই আপনাআপনি রহিত হয়ে যাবে, তাই এই সংরণবাদী প্রবণতা না থাকলেও বাংলদেশকে এখনই দ্বিপীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে জোর দেয়া উচিত।
পরিশেষে, যদিও সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, তবুও মনে রাখা ভালো যে, বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ইতালিতে ক্রমবর্ধমান ঋণের মাত্রা এবং ব্যাংকিং খাতের মন্দাবস্থা, বিপর্যস্ত আর্থিক বাজার ও বিপজ্জনকভাবে সুদহার রোমের জন্য বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে। সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ক্রমবর্ধমান সরবরাহের ওপর নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট পগুলোর। সৌদি আরব ও রাশিয়া বাজারে ইরানি তেল রপ্তানির প্রভাবে তেলের মূল্য পতন হতে পারে। তবে ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বন্ধে মার্কিন সিদ্ধান্ত তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইরাক ও লিবিয়ায় তেল উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানির সমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে।
২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ৩টি এলএনজি রপ্তানিকারকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অবস্থান করে নেবে, তখন বিশ্বব্যাপী তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কামানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলে দামের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে
পারে।