প্রতিবেদন

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১ উৎস চিহ্নিত: প্রতিরোধে দুদকের ২৫ সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা তৃতীয়বার এবং মোট চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনার সরকার দুর্নীতি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে। সরকারের এ ঘোষণার পর থেকে দুর্নীতি নির্মূলে দুদক তাদের কার্যক্রমের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ব্যক্তির ব্যক্তিগত দুর্নীতির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধেও কাজ শুরু করে দুদক।
এরই অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক টিম। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করেছে তারা। প্রতিবেদনটি এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদনটি তুলে দেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে প্রতিবেদনটি তুলে দেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্নীতির উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রত্যন্ত এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে চিকিৎসকদের অনাগ্রহ; সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণার্থী বাছাইয়ে নীতিমালা অগ্রাহ্য; একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকায় স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলা; উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি চালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ না হলেও যন্ত্রপাতি সরবরাহ; যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও মেরামত ব্যয়ের নামে অর্থ আত্মসাৎ; প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য; সরকারি ওষুধ রোগীদের না দিয়ে বিক্রি করে দেয়া; নিম্নমানের ও অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি।
প্রাতিষ্ঠানিক এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক কিছু সুপারিশও জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি হাসপাতালের উন্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার; ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তকরণ; বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি গ্রহণ ও এগুলো ব্যবহারে দক্ষ জনবল নিয়োগ; হাসপাতালগুলোতে সরকারনির্ধারিত ওষুধ এবং রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত পরীক্ষার মূল্য তালিকা জনসমক্ষে প্রদর্শন; দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর নজরদারি; যেসব হাসপাতাল-কিনিকে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান নেই, সেগুলোসহ অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া; বেসরকারি হাসপাতাল-কিনিকের অনুমোদনে পর্যাপ্ত স্থায়ী চিকিৎসক, কর্মচারী সংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা; স্বাস্থ্য বিষয়ক জনশিক্ষা কার্যক্রমে জেলা-উপজেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য নির্বাহী দপ্তরকে অবহিতকরণ; বিল-ভাউচার ইত্যাদি সিভিল সার্জনসহ কমপক্ষে দু’জন কর্মকর্তার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই; নকল ওষুধ তৈরি বন্ধে সার্ভেইলেন্স টিম গঠন; চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বদলি নীতিমালা প্রণয়ন এবং একই কর্মস্থলে ৩ বছর পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি; হাসপাতালের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম অটোমেশনের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান নিশ্চিত করা; চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন লেখায় পরিচ্ছন্নতা; নীতিমালার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস ফি সুনির্দিষ্টকরণ; ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তরফে দেয়া উপঢৌকনের বিনিময়ে সেই প্রতিষ্ঠানের ওষুধ গ্রহণে নির্দেশনা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া; চিকিৎসকের প্রাত্যহিক রোগী দেখার সংখ্যা নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়ন; রোগীর স্বাস্থ্যবীমা চালু করা; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর-এ দুই ভাগে রূপান্তর করা; সরকারি চিকিৎসকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসি, বেসরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে মহাপরিচালক (স্বাস্থ্য) ও পিএসসির প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ; প্রেসক্রিপশনে ওষুধের ব্র্যান্ড (প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া নাম) নাম না লিখে জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা; চিকিৎসকদের শিক্ষানবীসকাল দু’বছর করা এবং এর মধ্যে গ্রামে ১ বছর বাধ্যতামূলক করা; ৩ মাস অন্তর চিকিৎসকদের নৈতিকতামূলক প্রশিক্ষণ; প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিষিদ্ধ করা; ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধের দোকান পরিচালনা নিষিদ্ধ করা; হাসপাতালে হটলাইন রাখা; ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনকালে সরকারি বরাদ্দের অতিরিক্ত আপ্যায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা প্রভৃতি।
প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুর্নীতিকে ‘না’ বলানোই দুদকের লক্ষ্য। দুর্নীতি দমনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক বেশি সহায়ক হবে এই প্রতিবেদন।
তিনি বলেন, ডাক্তারদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের কোনো নীতিমালা নেই। এর অবৈধ সুবিধা নিতে সংঘবদ্ধ একটি দল তৈরি হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছে। এজন্য নতুন নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকমিশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সেই সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার জন্য সিসি ক্যামেরা দেখে ব্যবস্থা নেবে দুদক।
দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, বিভিন্ন প্রকার দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা দুদকের দায়িত্ব। ফলে ২০০৮ থেকে দুদক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দমনের কাজ শুরু করে। ২০১৭ সালে ২৫টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও রয়েছে। এরই মধ্যে ভূমি, শিক্ষা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সড়ক বিভাগসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনগুলো সাদরে গ্রহণ করেছে। সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক কর্তৃক যেসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে ওই সব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে দুদক।