প্রতিবেদন

অনলাইনে ঈদ বাজার: দিনে লেনদেন ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা

শাহিনা মনি
দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ। আর আসন্ন উৎসবকে সামনে রেখে কেনাকাটায় ব্যস্ত মানুষ। শপিংমলগুলোয় ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমে উঠেছে অনলাইন বাণিজ্য।
তীব্র গরমে মার্কেটে গিয়ে পছন্দের পণ্য কিনতে অনীহা অনেকের। এ কারণে তারা ঝুঁকছেন অনলাইন কেনাকাটায়। ঈদ সামনে রেখে তাই তুঙ্গে অনলাইন বাণিজ্য। লাখো পিসেরও বেশি পণ্য ডেলিভারি হচ্ছে প্রতিদিন। এর বাজার মূল্য ৩ থেকে ৫ কোটি টাকারও বেশি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন বাণিজ্য। ইন্টারনেটভিত্তিক এই ব্যবসা এখন জমজমাট। বাইরের প্রচ- গরম এড়াতে অনেকেই নির্ভর করছেন অনলাইন শপগুলোর দিকে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ঘরে বসে কিনছেন নিজেদের শাড়ি-গয়না থেকে শুরু করে পছন্দের সব পণ্য। ফেসবুকের পেজ খুললেই চলে আসছে নানা ধরনের পণ্যের বিবরণ। আর প্রতিটি পণ্যের দাম দেয়া রয়েছে। এ কারণে দর কষাকষিরও তেমন সুযোগ থাকছে না। পছন্দ হলেই অর্ডার দিচ্ছেন, ঘরে বসেই মিলছে পণ্য। গত বছরের তুলনায় এবার অনলাইনে বেচাকেনা দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইক্যাব) সাধারণ সম্পাদক ও আপলিঙ্ক কসমেটিকসের কর্ণধার মো. আব্দুল আজিজ স্বদেশ খবরকে বলেন, দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ইন্টারনেটের প্রতি ঝুঁকছে। যার কারণে এখন গ্রাহকরা ঘরে বসে পণ্য কিনতে আগ্রহী। দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে অনলাইন ব্যবসা। ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিবারের প্রায় সব সদস্যই অনলাইনে কেনাকাটা করেন।
অনলাইন শুরুর দিকে প্রতারণার কিছু বিষয় ছিল। এখন অ্যাসোসিয়েশন হওয়ায় যারা অনলাইনে কেনাকাটা করছেন এমন গ্রাহকরা প্রতারণার অভিযোগ করলে এই বিষয়ে তাৎণিক পদপে নেয়া হয়। যার কারণে অনেকে ভরসা পাচ্ছেন অনলাইন কেনাকাটায়। বর্তমানে প্রায় লাখেরও বেশি পরিমাণে পণ্য প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে, যার মূল্য কোটি টাকারও
বেশি বলে জানান অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা।
জানা গেছে, দেশে ই-কমার্সের আওতায় প্রায় ৯শ’ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে জেলা শহরগুলোতেও গড়ে উঠেছে অনলাইন শপ। সর্বমোট দেশে প্রায় কয়েক হাজার অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সংস্থাটির কাছে নেই। তবে দিন দিন অনলাইনের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ফ্যান পেইজের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এসব ছোট ছোট উদ্যোক্তার প্রধান মাধ্যম ফেসবুক। এর পাশাপাশি ই-কমার্সের সঙ্গে জড়াচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইক্যাব)-এর সাবেক সভাপতি রাজীব আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার সহজ হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে অনলাইন ব্যবসা। বিভিন্ন উৎসবে বেড়ে যায় অনলাইনে বেচাকেনার পরিমাণ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অতিরিক্ত গরমে অনেকেই বাসায় বসে পণ্য কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ কারণে ঈদে বাড়বে অনলাইনে ব্যবসার পরিমাণ। এই মুহূর্তে অনলাইনে প্রায় ১ লাখ পিসেরও বেশি পণ্য প্রতিদিন ডেলিভারি হচ্ছে। আশা করছি, গত বছরের তুলনায় এবার অনলাইন বাণিজ্য দেড় থেকে দুইগুণ বাড়বে।
মূলত বিভিন্ন জায়গা ঘুরে, যাচাই করে কেনাকাটার যে চল ছিল, অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পুরনো সেই ধারা এখন বদলে গেছে। জামা, কাপড়, জুতা থেকে শুরু করে টুপি, আতর, জায়নামাজ সবই এখন অনলাইন শপে কেনাবেচা হচ্ছে। এতে ক্রেতার সময় ও শারীরিক কষ্ট দু’টাই কমে যাচ্ছে।
স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঈদের শাড়ি দেখছিলেন সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকার সাংবাদিক মেহেদী হাসান। তবে তিনি সেই শাড়ি দোকানে বসে দেখছিলেন না, দেখছিলেন নিজের বাসার কম্পিউটারে। ইন্টারনেটে কাপড় কেনার একটি সাইট থেকে তারা কাপড়ের রং, ধরন ও দাম যাচাই করছিলেন।
কেন তিনি অনলাইনে কেনাকাটার কথা চিন্তা করছেন Ñ এমন প্রশ্নে মেহেদী হাসান বলেন, ব্যস্ততার কারণে শপিং করার খুব একটা সময় হয়ে ওঠে না। যানজট আর ভিড় ঠেলে মার্কেটে যেতেও ইচ্ছা করে না। তাই অনলাইনে শপিং করা সবচেয়ে সহজ। তিনি অনলাইনে যেকোনো প্রোডাক্ট কেনেন, ওয়েবসাইটগুলোতে যে ফোন নম্বর দেয়া থাকে সেখানে তাদের সাথে কথা বলে পণ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা নেন। তারপর অর্ডার দেন। আর কোনো ঝামেলা ছাড়াই তার বাসায় পৌঁছে যায় পছন্দের জিনিসটি।
বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কেনাকাটার আগ্রহ বাড়ছে মানুষের মাঝে। কর্মব্যস্ততার কারণে রাস্তার যানজট ঠেলে, দোকানে গিয়ে কেনাটাকে তাই অনেকেই এখন সময়ের অপচয় বলে মনে করছেন।
ঢাকার মাতুয়াইলে থাকেন শহীদ রাজু। তিনি এবার ঈদের কেনাকাটা করবেন অনলাইনে। আর বাসায় বসে অনলাইনে এসব পণ্য পরিবারের সবার পছন্দেই কেনা যায়। বাইরে বের হওয়ার ঝামেলা নেই। শহীদ রাজু বলেন, বাইরে প্রচ- গরম, ট্র্যাফিক জ্যাম ও মানুষের অসহ্য ভিড় Ñ সর্বোপরি ব্যাপক সময় নষ্ট।
ইন্টারনেটে এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের ওয়েবসাইটগুলোর মূল পাতায় গেলে দেখা যায়, এখানে তারা নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করেন না। অন্যদের তৈরি পোশাক, ঘড়ি, চশমা, জুতা, আতর, টুপি, জায়নামাজসহ নানা পণ্যের ছবি রয়েছে সেখানে। পাশে দাম, পণ্যের বিবরণ এবং ফোন নম্বর দেয়া থাকে। চাইলে অনলাইনেও অর্ডার দিতে পারেন আবার ফোন করেও কিনতে পারেন। অনলাইন শপ মধুরা পণ্য ডট কমের মালিক মনিরা রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে এভাবে কেনাকাটার ধারণা থাকলেও আমাদের দেশে ছিল না। তাই বাংলাদেশের পণ্য দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই আমরা এই ওয়েবসাইট চালু করি।
তিনি বলেন, এবারে ঈদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মেয়েদের সালোয়ার কামিজ আর ছেলেদের পাঞ্জাবি। এছাড়া টিশার্ট, আতর, টুপি, ও খেজুর। আর গত ঈদের চেয়ে এবার কেনাবেচা দ্বিগুণ হচ্ছে।
দেশে এখন এ ধরনের ওয়েবসাইটের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ খুলেও বেচাকেনা হচ্ছে বিভিন্ন জিনিসের। ফেসবুকে এমন একটি পেজের নাম স্টাইল ওয়ার্ল্ড কালেকশন। পেজটিতে গিয়ে দেখা যায় ১০ লাখ ৭৫০০ লাইক রয়েছে। সেখানে মেয়েদের পোশাক ছাড়াও পাওয়া যায় ছেলেদের পোশাকও।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বেসিস-এর সভাপতি ফাহিম মাশরুর জানান, অনলাইনে সবচেয়ে বড় সুবিধা ক্রেতারা পাচ্ছেন, সেটা হলো ঘরে বসে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছেন। আর অনেক েেত্র এই দাম শপিংমলের দামের থেকেও কম থাকায় ক্রেতারাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
এেেত্র ১০০০ টাকার নিচে যেসব পণ্য রয়েছে সেসব পণ্য মানুষ বেশি কিনছে বলে তিনি জানান। প্রথমে এটি রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এখন বড় বড় শহরের মানুষও ইন্টারনেটে কেনাকাটায় আগ্রহী হচ্ছেন। মাসরুর বলেন, এবারে ঈদ উপলে ইন্টারনেটে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার কেনাবেচা হচ্ছে বলে তারা হিসাব পাচ্ছেন।
অনলাইনে কেনাকাটার আরেকটি সাইট বাংলাদেশ ব্রান্ডস-এর ধানমন্ডি অফিসে গিয়ে দেখা গেল, একটি অ্যাপার্টমেন্টে দুই কামরার একটি ফ্যাটে অফিসের কাজ চলছে। সেখানে ৩ জন কর্মী কম্পিউটারের সামনে ওয়েবসাইটের দিকে নজর রাখছেন। প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখছেন তাদের ওয়েবসাইটে ক্রেতারা কোন কোন পণ্যের অর্ডার দিচ্ছেন। সেগুলোর একটা তালিকা তৈরি করছেন। অফিসের আরেকটি রুমে ক্রেতাদের অর্ডারকৃত পণ্য ডেলিভারি জন্য প্যাকেট করছেন কিছু কর্মী। কথা হয় বাংলাদেশ ব্রান্ডস-এর মালিক সাদিকা হাসানের সাথে। তিনি জানান তার মূল ক্রেতা ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরের মানুষ আর বাংলাদেশের বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
অনলাইনে কেনাকাটায় যেমন আগ্রহ বাড়ছে মানুষের তেমনি এখানে কেনাকেটা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষও রয়েছে কোনো কোনো ক্রেতার মনে। গুলশানের একটি শপিংমলে কথা হয় বেশ কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। সেখানে নাসরিন জামান নামের একজন নারী ক্রেতা বলেন, অনলাইনে তিনি একবার একটি লাল কাপড়ের অর্ডার দেন ওয়েবসাইটে দেয়া ছবি দেখে। কিন্তু কাপড়টি যখন তার বাসায় এল, তখন দেখা গেল সেটা কমলা রংয়ের। তাই তিনি মার্কেটে এসে নিজে পরখ করে কাপড় কিনতে চান।
এক রকম জিনিস চেয়ে অন্য রকম জিনিস পাওয়ার অভিযোগ যেমন শোনা যায় অনেকের কাছে, আবার বাসায় পণ্য ডেলিভারি নিয়ে বিড়ম্বনার কথাও জানান অনেকে। বনানীর বাসিন্দা সালমান আরেফিন বলেন, জিনিসটা না আসা পর্যন্ত সারাদিন বাসায় বসে অপো করতে হয়। এতে সময়ের অপচয় হয়।
অবশ্য অনেকে আবার এমনও বলেন, ঈদের সময় পরিবারের সবার সাথে কেনাকাটা করতে যাওয়ার যে মজা সেটা অনলাইনে পাওয়া যায় না।
মিরপুরের বাসিন্দা তারেক জোয়ারদার। বন্ধুদের সাথে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করতে। তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে ঘুরছি, মজা করছি, একজনের পছন্দের সাথে আরেকজন মতামত দিচ্ছি, দামাদামি করছি -এটার মজাই আলাদা।
অনলাইনে অর্ডার করলে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে বাসায়। মূল্য পরিশোধে পাওয়া যাচ্ছে ব্যাংকের সহায়তাও। অনেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই পরিশোধ করছেন মূল্য। ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে বা গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পর দাম মেটানোর সুযোগও রয়েছে। তাই ক্রেডিট কার্ডে কেনার বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে রাজধানীর ব্যস্ত অনেক নারী-পুরুষ বলছেন, প্রতারিত হওয়ার ভয় না থাকলে অনলাইনে কেনাকাটাই এখন বেশ স্বস্তিদায়ক। তাই এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং সরকারের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকলেরই এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আর তা হলেই কেবল এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাবে সহজেই।