কলাম

অনলাইন শপিং ভালো উদ্যোগ: তবে সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে

এম নিজাম উদ্দিন
সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আর প্রযুক্তি সহায়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে গত কয়েক বছরে দেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আমাদের জীবনযাপনের ধারায় ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন নিয়ে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সামাজিকতা, উৎসব বা বিনোদন Ñ কোনোটিই আর আগের মতো নেই। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ আর ইউটিউব Ñ আমাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছে দ্রুত। আগের মতো এই পরিবর্তন আর শুধু উচ্চবিত্ত আর উচ্চ-মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, একেবারে নিম্নবিত্তদের মধ্যে না এলেও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশ এখন জীবনযাত্রায় বেশ ডিজিটাল!
এত দ্রুত পরিবর্তন হওয়া ভালো না খারাপ Ñ তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবীর অন্য যেকোনো সমাজের মতো আমাদের এখানেও এই পরিবর্তন ঘটছে, আর দিন দিন এই পরিবর্তনের গতি বাড়বে বৈ কমবে না।
পরিবর্তনের এ ধারায় কর্মব্যস্ত মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে অনলাইন কেনাকাটা। আর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ঘরে বসে কেনাকাটা করার সহজ এ পদ্ধতিটি।
রাজধানী ঢাকার মাতুয়াইলে অবস্থিত শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫ম শ্রেণির ছাত্র মীর মো. ইশতিয়াক উদ্দিন রাফিনও তার পছন্দনীয় জিনিস কেনাকাটা করে বাসায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। কর্মব্যস্ত গৃহিণীরা তো তাদের যাবতীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে বাজার-সদাই পর্যন্ত করে থাকেন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে। তবে বিপত্তি ঘটে তখনই যখন স্কুলছাত্র ইশতিয়াত উদ্দিন রাফিন অনলাইনে দেখা সুন্দর জামার অর্ডার দিয়ে ডেলিভারি পায় পুরাতন ও নিম্নমানের জামা; যার সাথে অর্ডারকৃত জামাটির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন শপিংয়ের ভালো উদ্যোগটিকেও টেকসই করতে হলে প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সরকারের যথাযথ নজরদারির। এর প্রধান কারণ দেশে অনলাইন শপিং যতটা না শহরের মানুষের কাছে আকর্ষণীয়, তারচেয়ে বেশি টানে গ্রামগঞ্জের মানুষদের। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত হলেও বাস্তব। বাংলাদেশে যেকোনো বড় শহরে বড় মার্কেটের সংখ্যা অনেক। শহরের নাগরিকদের নাগালের মধ্যেই বেশিরভাগ জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে থানা বা ইউনিয়ন সদরে অনেক পণ্য কিনতে পাওয়া যায় না। কিন্তু এসব এলাকায় প্রচুর ক্রেতা আছেন, তাদের ক্রয়মতাও আছে (দেশে প্রতি বছর বিদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স আসে, আর সেগুলোর বেশিরভাগ গ্রাম আর ছোট শহরে যায়)। গ্রামীণ এই বাজার দেশে অনলাইন শপিংয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হতে পারে। এখনই দেখা যাচ্ছে, দেশে অনলাইন শপিংয়ের ৫০ শতাংশের বেশি অর্ডার আসে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে থেকে।
অনলাইন কেনাকাটা প্রসারের েেত্র প্রথম বাধা পণ্য পরিবহন। পণ্য উৎপাদন করা হোক বা আমদানি Ñ সবকিছুই মূলত ঢাকাতেই হয়। অনলাইনে কোনো পণ্যের অর্ডার হলে ঢাকায় তা দিনে দিনে বা পরের দিন পৌঁছে দেয়া হয়। কিন্তু ঢাকার বাইরে থেকে অর্ডার দিলে ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে ৭ থেকে ১০ দিন লেগে যায়। এর প্রধান কারণ আমাদের দেশে এখনো ই-কমার্সভিত্তিক লজিস্টিকস বা পরিবহন কোম্পানি গড়ে ওঠেনি, যারা সারাদেশের যেকোনো স্থানে প্রোডাক্ট দ্রুত সময়ে পৌঁছে দিতে পারে। ব্যক্তি উদ্যোগে সারাদেশে এ রকম লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি করা কঠিন, ব্যয়বহুল ও সময়সাপে। এই সমস্যার একটি সহজ সমাধান হচ্ছে দেশের ডাকঘরগুলোকে কাজে লাগানো। সারাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১০ হাজারের বেশি ডাকঘর আছে। ই-মেইল আর হোয়াটসঅ্যাপের যুগে এসব ডাকঘরের অবকাঠামো আর জনবল এখন অনেকটাই অব্যবহৃত। এগুলোকে যদি দ্রুত অনলাইন কেনাকাটার সরবরাহব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত করা যায়, তাহলে ডাকঘরগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, অন্যদিকে দেশের যেকোনো জায়গায় দুই-তিন দিনে খুব কম খরচে পণ্য পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ই-কমার্স বাজারের আকার বছরে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার ক্রেতা অনলাইনে পণ্যের অর্ডার দেন। ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ বছরে একবার হলেও অনলাইনে পণ্য অর্ডার করেন।
সারাদেশে অনলাইন শপিং ছড়িয়ে দেয়ার আরও একটি বড় বাধা হচ্ছে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য। বাংলাদেশে শহর আর গ্রামে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের খরচ ও সহজলভ্যতার মধ্যে এখনও ‘আকাশ-পাতাল’ বৈষম্য। আমরা যারা বড় শহরে থাকি, তারা খুব কম খরচে ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করি, সেটি কম্পিউটারে হোক বা ওয়াই-ফাই দিয়ে মোবাইল ফোনে। কিন্তু বড় শহরের বাইরে কার্যত কোনো ব্রডব্যান্ড সেবা নেই! যদিও সরকার এ বিষয়ে বর্তমানে নজরদারি বাড়িয়েছে। প্রতিনিয়তই মফস্বল শহরে সহজলভ্য হচ্ছে ব্রডব্যান্ড সেবা। সমস্যা হচ্ছে মোবাইল ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীদের খরচ হয় ‘ডেটা’তে, যত বেশি ওয়েবসাইট দেখা তত বেশি খরচ। দেশে টুজি বা থ্রিজি নেটওয়ার্কের ডেটা খরচ এতটাই বেশি যে ডেটা খরচের ভয়ে অনেক মানুষের হাতে স্মার্টফোন থাকলেও তারা ইন্টারনেট নিয়মিত ব্যবহার করেন না! অনলাইন কেনাকাটার সাইট বা অ্যাপে যেহেতু পণ্যের অনেক ছবি থাকে, তাই এগুলো দেখতে অনেক ডেটা খরচ হয়।
অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব। গত কয়েক বছরে হাজার হাজার উদ্যোক্তা অনলাইন শপিং বা ই-কমার্স ব্যবসায় প্রবেশ করেছেন। যেকোনো ব্যবসার মতো এখানেও ‘ভালো-মন্দ’ দুই ধরনের লোকই আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ফেসবুকে তাদের পেজ খুলে ব্যবসার নামে কাস্টমারদের প্রতারিত করছে। এদের সংখ্যা সীমিত হলেও ক্রেতারা একবার যদি প্রতারিত হন বা তাদের পরিচিত কেউ একবার খারাপ অভিজ্ঞতা পায়, তাহলে তারা অনলাইন কেনাকাটার ওপর থেকেই সামগ্রিকভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলে। মূল সমস্যাটা হচ্ছে যেহেতু ফেসবুকে যে কেউ একটি পেজ খুলেই বিক্রি শুরু করতে পারে (অনেকের কোনো অফিস বা ঠিকানাও থাকে না), সেহেতু এসব ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায়ীর কারও কাছে কোনো জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা নেই। গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে আমাদের উত্তরণ হতে হবে।
দেশে এখন অনেক ই-কমার্স কোম্পানি আছে, যারা সব আইনকানুন মেনে ব্যবসা করছে, তাদের নিজস্ব অফিস আছে, ট্রেড লাইসেন্স আছে। গ্রাহকদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনার সুবিধা হচ্ছে এদের সবার ‘রিটার্ন’ আর ‘রিফান্ড’ পলিসি আছে। কোনো সমস্যা হলে আইনগতভাবে সেটার সমাধান করতে তারা বাধ্য। তাদের খুঁজে পাওয়ার উপায় রয়েছে। ক্রেতার সমস্যা সমাধান না করতে পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘ভোক্তা অধিকার’ অধিদপ্তরে তিগ্রস্ত কাস্টমার অভিযোগ জানাতে পারে খুব সহজেই। আর অপরাধ প্রমাণ হলে সেই ই-কমার্স কোম্পানি তিপূরণ দিতে বাধ্য। আশা করা যায়, দেশে অনলাইন শপিং যত জনপ্রিয় হবে, আস্তে আস্তে ক্রেতারাও সচেতন হবেন এবং এই ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’র সমস্যা ক্রমেই দূর হয়ে যাবে।
এই লেখা যখন লিখছি, ঠিক তখনই নজরে পড়লো অনলাইন ব্যবসার নামে প্রতারণার দায়ে গত ২২ মে ৭ তরুণকে আটক করেছে র‌্যাব। পরের দিন ২৩ মে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানিয়েছে, ফটোশপের মাধ্যমে মানহীন পণ্যকে আকর্ষণীয় করে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ, এক পণ্যের পরিবর্তে অন্য পণ্য, এমনকি কখনও আলু-পটল, পিঁয়াজভর্তি প্যাকেট সরবরাহ করতো এই চক্রটি। এছাড়াও অগ্রিম টাকা নিয়ে কোনো পণ্য সরবরাহ না করাসহ নানা উপায়ে অনলাইন শপিংয়ের নামে প্রতারণা করে আসছিল একটি চক্র। নতুন এ কৌশল ব্যবহার করে চক্রের সদস্যরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।
র‌্যাব জানায়, গত কয়েক বছরে ফেসবুক বা অনলাইন সাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশে ই-শপিং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়েই প্রতারণার ফাঁদ পাতে চক্রটি। ক্রেতারা কোনো পণ্য অর্ডার করলে, কখনো-কখনো মূল্য পরিশোধ করতে বলা হতো। কিন্তু নির্ধারিত পণ্যের পরিবর্তে সাবান, ভিমবার, আলু, পিঁয়াজ, পটোল প্যাকেট করে পাঠিয়ে দিত তারা। কখনো কোনো পণ্য না পাঠিয়েই কিছু অর্থ আদায় করে পণ্য পাঠিয়েছে বলে দাবি করত। গ্রাহক পণ্য পায়নি দাবি করলে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসে খোঁজ নিতে বলত এবং পণ্য না পৌঁছানোর জন্য সেসব কুরিয়ার সার্ভিসকে দায়ী করত এই চক্রটি।
র‌্যাব জানায়, শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের অনলাইনে দেয়া পণ্যসামগ্রীর ছবি নিজেদের পণ্য হিসেবে নিজেদের ফেসবুক পেজে দিত। তবে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতারণার কৌশল হিসেবে ওই সব পণ্যের দাম দেয়া হতো নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু ক্রেতার হাতে যেত অনেক নিম্নমানের পণ্য আবার কখনও ফাঁকা প্যাকেটও পাঠানো হতো ক্রেতার ঠিকানায়।

শেষ কথা: দেশে বর্তমানে ই-কমার্স বাজারের আকার বছরে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার ক্রেতা অনলাইনে পণ্যের অর্ডার দেন। ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ বছরে একবার হলেও অনলাইনে অর্ডার করেন। ভারতে অনলাইন গ্রাহকের এই সংখ্যা ১০ কোটি, চীনে প্রায় ৪০ কোটি। যেখানে ভারতে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত, বাংলাদেশে এখনও জনসংখ্যার ১ শতাংশের কম অনলাইন শপিং করেন। ভারত বা চীনে ই-কমার্স বা অনলাইন শপিংয়ের এই ব্যাপক বিস্তার শুধু উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় চলে এসেছে। নিঃসন্দেহে আমাদের দেশেও এটি শুরু হয়েছে। কিন্তু কত দ্রুত এটি বিস্তৃত, ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, তা নির্ভর করবে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কিভাবে এটির বিস্তারে প্রয়োজনীয় পদপেগুলো দ্রুত এবং সঠিকভাবে নিতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও নজরদারিই পারে এ খাতের ভালো উদ্যোক্তাদের সামনে এগিয়ে নিতে এবং প্রতারক চক্রের হাত থেকে গ্রাহক হয়রানি রোধ করতে।