প্রতিবেদন

ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘশুমারি: বাঘ বেড়েছে সুন্দরবনে

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বন্যপ্রাণিদের অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের বাসিন্দা, বাংলার রাজা বাঘ বা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পৃথিবীর বাঘ প্রজাতির মধ্যে যে ৪টি উপপ্রজাতি বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের এই রাজা বাঘ। সাম্প্রতিক এক জরিপে পাওয়া তথ্য মতে জানা গেছে, সুন্দরবনে বৃদ্ধি পেয়েছে বাঘের সংখ্যা।
বেঙ্গল টাইগার কনসার্ভেশন অ্যাক্টিভিটি (বিটিসিএ) প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এক বাঘশুমারি কার্যক্রম (দ্বিতীয় পর্যায়) শেষে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ বন বিভাগ। ‘সেকেন্ড ফেইস স্ট্যাটাস অব টাইগার ইন বাংলাদেশ সুন্দরবন্স-২০১৮’ শিরোনামের একটি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২১ মে বন বিভাগের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা যায়, ২০১৫ সালের জরিপ মোতাবেক সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। তবে সম্প্রতি ক্যামেরা ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে সুন্দরবনে ১১৪টি বাঘের অস্তিত্ব চিহ্নিত হয়েছে। সে হিসাবে ৩ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ৮ শতাংশ।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে টঝঅওউ ইঅএঐ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা কার্যক্রম শুরু করা হয়।
১ ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে ১৪ মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত সাতীরা রেঞ্জের ১২০৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দুইটি সেশনে ২৫৩ গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে এই জরিপ করা হয়। পুনরায় ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল ২০১৮ পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে খুলনা রেঞ্জের ১৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি সেশনে ৯৬টি ক্যামেরা বসিয়ে তৃতীয় ধাপের জরিপ কাজ চলে। একইভাবে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ থেকে ১০ মে ২০১৮ পর্যন্ত শরণখোলা রেঞ্জের ২৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দুইটি সেশনে ১৮৭ গ্রীডে ক্যামেরা বসিয়ে চতুর্থ ধাপের জরিপ পরিচালিত হয়। এভাবে মোট ৪টি ধাপে ৩টি ব্লকে ১৬৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে ২৪৯ দিন ধরে পরিচালিত ওই জরিপে ৬৩টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ, ৪টি জুভেনাইল বাঘ (১২-১৪ মাস বয়সী) এবং ৫টি বাঘের বাচ্চার (০-১২ মাস বয়সী) সর্বমোট ২৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। যেহেতু সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের বিচরণত্রে ৪৪৬৪ বর্গকিলোমিটার, সেক্ষেত্রে বাঘ গবেষণা ও জরিপে সর্বাধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি ঝঊঈজ মডেলে প্রাপ্ত এই তথ্য বিশ্লেষণ হয়। তাতে দেখা যায়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬ থেকে বেড়ে ১১৪তে পৌঁছেছে।
এর আগে ২০১৫ সালে টঝঅওউ ইঅএঐ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব চিহ্নিত হয়েছিল। ৩ বছরের ব্যবধানে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১১৪টি হওয়ায় সুন্দরবনে বাঘ গড়ে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের বন অধিদপ্তরের সঙ্গে চলতি বাঘ শুমারিতে অংশ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াইল্ড টিম’ এবং ‘স্মিথসোনিয়ান কনসার্ভেশন ইনস্টিটিউট’। গবেষণায় সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ।
সূত্র জানায়, এবারের বাঘ জরিপ কার্যক্রমে প্রাপ্ত তথ্য আরো নিশ্চিত হতে জরিপের একটি খসড়া ডরষফষরভব ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ওহফরধ -তে পাঠানো হয়। পরে বাংলাদেশের তৈরি বাঘ শুমারি বিষয়ক জরিপ প্রতিবেদনটি সঠিক বলে মতামত দেয় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।
বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষজ্ঞদের মতামত
২০১৫ সাল থেকে বন বিভাগ বাঘ গণনার েেত্র ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করে। টঝঅওউ ইঅএঐ (ইউএসএইড বাঘ) প্রকল্পের আওতায় এবারের গবেষণায়ও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিটি কতটা নির্ভরযোগ্য, এমন প্রশ্নের ভিত্তিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘বাঘ গণনার েেত্র যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তারমধ্যে ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিই সবচেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক। তাছাড়া সুন্দরবনের যেসব এলাকায় বাঘ বাস করে সেখান থেকে সঠিক তথ্য বের করতে পায়ের ছাপের চেয়ে ক্যামেরা ট্যাপিংই সবচেয়ে কার্যকর।’
বাঘ বৃদ্ধির বিষয়ে ড. খান বলেন, বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, তারচেয়ে যুক্তিযুক্ত কথা হচ্ছে বাঘ কমে যায়নি। সুন্দরবনের বাস্তবতার পরিপ্রেেিত এটা বেশ আশার কথা। যদিও এটা ঠিক যে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি মানে একেবারে ১০৬টিই বা ১১৪টি মানে একেবারে ১১৪টিই Ñ বিষয়টি এমন নয়। তবে ক্যামেরা ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে উঠে আসা এ সংখ্যাটি মোটামুটি বাস্তব সংখ্যার কাছাকাছি।
গত শতকের নব্বই দশক পর্যন্ত বাঘ কেবল সুন্দরবনের বাওয়ালী বা বনজীবীদের আতঙ্কের কারণ ছিল। কিন্তু চলতি শতকের শুরুর দিকেই বন উজাড়, চোরা শিকারের ফলে হরিণ কমে যাওয়া, নতুন এলাকার খোঁজ বা খাদ্যসংকটের ফলে প্রায়ই লোকালয়ে হানা দেয় বাঘ। বাঘের আক্রমণে বেশ কয়েকজন নিহত হবার পাশাপাশি গৃহপালিত পশু হত্যায় তিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে শুরু হয় বাঘের বৈরিতা। ফলে চোরা শিকারি, বাওয়ালী-বনজীবীরা ছাড়াও লোকালয়ের মানুষ বাঘ হত্যা করতে শুরু করে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১০টি বাঘ। বাকি ২৫টির মধ্যে ১৪টি বাঘ পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় লোকজন, ১০টি নিহত হয়েছে শিকারিদের হাতে এবং একটি বাঘ নিহত হয়েছে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে।