রাজনীতি

দ্বিমুখী রাজনীতি: বিএনপিতে ‘ভাঙনের সুর!’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে দ্বিমুখী রাজনীতি করে আসছে বিএনপি। এ নীতি সারাদেশের সাধারণ মানুষ এমনকি বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীই পছন্দ করছেন না।
গেল কিছুদিনের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে বিএনপির দ্বিমুখী রাজনীতি স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়। বিএনপি শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনেও না যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু অজানা কারণে শেষ মুহূর্তে গেছে। আবার সংসদে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েও শেষ মুহূর্তে অদৃশ্য কারণে দলের নির্বাচিত ৬ জনের ৫ জন সংসদে গেলেন এবং দলের মহাসচিব সংসদে গেলেন না। বিএনপির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিএনপি আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না; অথচ বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে Ñ এসবই দলের পরস্পরবিরোধী আচরণ, যা মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না।
এ বিষয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান সাপ্তাহিক স্বদেশ খবরকে বলেন, রাজনীতিতে দ্বিমুখিতা বলতে কিছু নেই। সাধারণ মানুষের কাছে যা দ্বিমুখী আচরণ বলে মনে হচ্ছে, তা রাজনীতিতে কৌশল হিসেবে সিদ্ধ। রাজনীতিতে সময় ও সুযোগ বুঝে বিভিন্ন পদপে নিতে হয়। সেই পদপে অনেক সময় সফল হয়, অনেক সময় হয়ত ব্যর্থও হয়। তাই বলে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তোলা সঠিক হবে না।
জানা গেছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের ছেড়ে দেয়া বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। দল থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, ওই নির্বাচনে অংশ নেবেন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২১ মে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বগুড়া জেলা বিএনপি ও দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে লন্ডন থেকে স্কাইপে যুক্ত হয়ে এমন সিদ্ধান্ত দেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন ২২ মে খালেদা জিয়ার পে বগুড়া জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে খালেদা জিয়ার নামে মনোনয়ন ফরম ক্রয় করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জি এম সিরাজ। খালেদা জিয়া ছাড়াও জি এম সিরাজ, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবর রহমানসহ অন্য ৩ জনের মনোনয়ন ফরম তোলা হয়।
এরপর মনোনয়ন ফরমে স্বারের জন্য বর্তমানে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাাৎ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। কিন্তু খালেদা জিয়া মনোনয়ন ফরমে স্বার না দিয়ে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করবেন না।
অন্যদিকে, এর আগে গত ১৫ মে চিকিৎসার জন্য সস্ত্রীক থাইল্যান্ডে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। থাইল্যান্ড যাওয়ার আগেই তিনি বগুড়া-৬ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে জি এম সিরাজের মনোনয়ন ফরমে স্বার করে যান। একইসঙ্গে জাতীয় সংসদে সংরতি নারী আসনে বিএনপিদলীয় কোটায় প্রাপ্ত মহিলা সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন দিয়ে যান।
বিএনপি সূত্র জানায়, এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই। অথচ এখনও দলটি বগুড়া-৬ আসনে মনোনয়ন দেয়ার নাটক করে যাচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনে গেলে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে, লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দেশে ফিরতে পারবেন, নির্বাচন ন্যূনতম সুষ্ঠু ও নিরপে হলে মতায়ও আসতে পারে বিএনপি Ñ নেতাকর্মীদের এমন স্বপ্ন দেখানো শুরু করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে। এই স্বপ্ন দেখিয়ে বিএনপিকে একটি অসম প্রতিযোগিতার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে সম হন দলের বড় একটি অংশ। অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে পুরনো মিত্র ২০ দলীয় জোট ছেড়ে হঠাৎ সখ্য গড়ে ওঠা বিপরীত আদর্শের ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটকে সম্পূর্ণ উপো করে বিএনপি মেতে থাকে ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্টে।
সূত্র জানায়, দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর গভীর সংকটে পড়া বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না Ñ এমন ঘোষণাই দিয়ে আসছিল। কিন্তু বিএনপির একটি অংশ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নেতারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বোঝাতে সম হয়, নির্বাচনে অংশ নিলে তারা নিশ্চিত বিজয় অর্জন করবে। এমনকি খালেদা জিয়াকে আবারও প্রধানমন্ত্রী বানানো এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন তারা। তাদের পরামর্শে প্রলুব্ধ হয়ে হঠাৎ করেই নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিএনপি হাইকমান্ড। একটি অংশ তখনও নির্বাচনে না যাওয়ার প্রশ্নে অটল থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পে অবস্থান নেয়। এমনকি তারা এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে বৈধতা দেয়া হবে Ñ এমন যুক্তিও তুলে ধরেন। কিন্তু তাদের কোনো যুক্তি ও পরামর্শই শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেও বিএনপি নেতাদের বড় একটি অংশ বিরোধিতা করেছেন নির্বাচনে না যেতে। তাদের বক্তব্য ছিল, বিএনপি নির্বাচনে যাওয়া মানে সরকারকে বৈধতা দেয়া। তখন এই অংশটি পরামর্শ দিয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্ট গঠন না করে ২০ দলীয় জোটকে শক্তিশালী করার জন্য। নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলনে যাওয়ার জন্য। যে দাবিটি গত কয়েক বছর ধরে করে আসছিল দলটি। কিন্তু বিএনপি মহাসচিবসহ আরেকটি অংশ দলের নীতিগত কর্মসূচির বিপরীতে সম্পূর্ণ ইউ টার্ন নিয়ে নির্বাচনের পে জোরালো অবস্থান নেন। দলের ঘরোয়া একটি কর্মসূচিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ঘোষণা দেন শেখ হাসিনার সরকারকে হঠাতে প্রয়োজনে শয়তানের সঙ্গেও ঐক্য করার। কিন্তু সঙ্গত কারণেই ঐক্যের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি বিএনপি। নির্বাচনে গিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয় ঘটে বিএনপির। এ পরিস্থিতিতে ভোট ডাকাতির অভিযোগে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। কিন্তু এ প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিতে পারেনি দলটি। সর্বশেষ খবর হচ্ছে দলের অন্য একটি প সবকিছু বাদ দিয়ে এখন বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। আর দু’পরে এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে বিএনপিতে এখন শোনা যাচ্ছে ‘ভাঙনের সুর’।