প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর : বিনিয়োগ ও সহযোগিতার মুকুটে যুক্ত হবে নতুন পালক

বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধু জাপান সরকারের সহায়তা পেয়েছিলেন। সেই সহায়তার ধারা আজও অব্যাহত রেখেছে দেশটির সরকার। বন্ধুত্বপূর্ণ এ সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় টানা তৃতীয়বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৯ মে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাচ্ছেন। এরই মধ্যে সফরের খুঁটিনাটি সব চূড়ান্ত হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের সঙ্গে দ্বিপাকি বৈঠক করবেন। এছাড়া তিনি আগামী ৩০-৩১ মে টোকিওতে ফিউচার এশিয়া সম্মেলনে অংশ নেবেন। জাপানের সবচেয়ে বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিকেই প্রতি বছরের মতো এবারও টোকিওতে ফিউচার অব এশিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এ ইভেন্টে অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া এই সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বড় ধরনের (২২ হাজার কোটি টাকার) একটি ঋণ চুক্তি হতে পারে।
শেখ হাসিনাকে বরণ করতে
অপো করছে জাপান
এদিকে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপান সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত হিরোয়াসু ঝুমি। জাপান সফরের প্রাক্কালে ২০ মে সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাাৎকালে জাপানি রাষ্ট্রদূত এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, জাপান বাংলাদেশের পরীতি বন্ধু। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আগামী ৫ বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে আরও এগিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেয়ার জন্য জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ও জাপানের জনগণ ভীষণ আগ্রহে অপো করছে। শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের আড়াই বিলিয়ন ডলারের (২২ হাজার কোটি টাকার) উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি স্বারিত হতে যাচ্ছে বলেও জানান জাপানি রাষ্ট্রদূত।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ৭ জাপানি নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে জাপান। ওই সতর্কতা এখনও বহাল রয়েছে। ২৯ মে’র সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের মধ্যে টোকিওতে দ্বিপীয় বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চায় বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৬ সালের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু জাপান এখনও ভ্রমণ সতর্কতা বিষয়টি বজায় রেখেছে। ওই সময়ে অনেক পশ্চিমা দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করলেও তারা পর্যায়ক্রমে তা উঠিয়ে নিয়েছে।
বাংলাদেশি এই কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলায় ৫০ জনেরও বেশি নিহত হলেও ওই দেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা দেয়নি জাপান। কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়ে তারা এখনও উদ্বিগ্ন। ফলে বাংলাদেশের প থেকে দ্বিপীয় বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করা হবে।

কানেক্টিভিটি
বিগ-বি প্ল্যানের আওতায় জাপান মাতারবাড়িতে একটি সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করছে। এখানে কিভাবে একটি শিল্পাঞ্চল তৈরি করা যায় সেটি নিয়েও আলোচনা করবে দু’দেশ।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ওই অঞ্চলে টোকিও প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে এবং আমরা সেখানে যোগাযোগের যাবতীয় সুবিধাসহ একটি শিল্পাঞ্চল তৈরি করতে চাই। শুধু জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাবও আমরা দিয়েছি। সেটি মাতারবাড়ির কাছে কোনো জায়গায় স্থাপিত হতে পারে।’

ওডিএ সহযোগিতা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ ও জাপান ৪০তম ওডিএ প্যাকেজের জন্য আলোচনা করছে। এই প্যাকেজের আওতায় জাপান বাংলাদেশকে ২২০ কোটি ডলার সহায়তা দেবে, যা মাতারবাড়ি বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ব্যবহার হবে। এছাড়া ম্যাস র‌্যাপিড ট্রান্সপোর্ট-এর একটি অংশ বাস্তবায়নে এখান থেকে অর্থ ব্যয় করা হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যদি সবকিছু ঠিক থাকে তবে আমরা আশা করছি আগামী ২৯ মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের সঙ্গে বৈঠকের পর আমরা এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বারে সমর্থ হবো। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করবেন। সরকারপ্রধান পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও সংকট সমাধানে জাপানের আরও সক্রিয় সহযোগিতা চাওয়া ছাড়াও টোকিও সম্মেলনে এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন তিনি।
এখানে উল্লেখ করা যায়, ২৮ মে একসঙ্গে ৩ দেশ সফরে বের হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮-৯ দিনের এ সফর শুরু হবে জাপান দিয়ে। মধ্যখানে সৌদি আরব আর সমাপ্তি ঘটবে ফিনল্যান্ড সফরের মধ্য দিয়ে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রধানমন্ত্রীর টোকিও এবং মক্কা সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে হেলসিঙ্কি সফরের বিষয়ের কর্মসূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। একান্ত সরকারি সফরটিতে দ্বিপীয় উপাদান যুক্ত করতে কাজ করছে ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ফিনল্যান্ড সফরে দ্বিপীয় কর্মসূচি মুখ্য নয়। রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান যেকোনো দেশ সফরে গেলে হোস্ট কান্ট্রির বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা-সাাৎ তথা ভাবের আদান-প্রদান হয়। হেলসিঙ্কিতেও সেটি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপান সফর শেষে ৩০ মে টোকিও থেকে সরাসরি সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩১ মে মক্কায় অনুষ্ঠেয় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ১৪তম ওআইসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ওই সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। সম্মেলন ছাড়াও শেখ হাসিনার পবিত্র ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন জাপান সফরের সময় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার দ্বিপীয় সহযোগিতা চুক্তি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বড় বড় প্রকল্প বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণে জাপানি বিনিয়োগ রয়েছে। আগামী ৫ বছর জাপানের প থেকে ধারাবাহিকভাবে এদেশে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের েেত্র জাপান সবসময় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৮ মে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। ২৯ মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের সঙ্গে দ্বিপীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে দ্বিপীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে জাপানের অতিরিক্ত আড়াই বিলিয়ন ডলার বা ২২ হাজার কোটি টাকা দেয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা সই হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিপীয় ওই বৈঠক ছাড়াও টোকিওতে আগামী ৩০ মে অনুষ্ঠেয় ২ দিনব্যাপী ‘ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনের সমাপনীতে অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এছাড়া সরকারপ্রধান পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপানের আরও সক্রিয় সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফরের সময় উচ্চ পর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও সঙ্গে থাকছেন। এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিমের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীরা জাপান সফর করবেন। দুদেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগ কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়েও এবারের সফরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপরে চেয়ারম্যান (বিডা) কাজী এম আমিনুল ইসলাম স্বদেশ খবরকে বলেন, জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জাপান বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, জাপান-বাংলাদেশ ডায়লগে বিনিয়োগ ও সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হবে।
জানা গেছে, হলি আর্টিজানের দুর্ঘটনার পর সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে সন্তুষ্ট জাপান সরকার। তারই প্রমাণ দিয়ে তারা ঈদের আগেই জাপানি অর্থায়নে কাঁচপুর, মেঘনা, গোমতী সেতুর কাজ শেষ করে সেতুগুলো যান চলাচলের জন্য খুলেও দিয়েছেন। সেতু ৩টি উদ্বোধনের পর ঢাকা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট অনেকাংশে নিরসন হয়েছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান থেকে সরাসরি ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে সৌদি আরব সফর করবেন। ৩১ মে মক্কায় অনুষ্ঠিতব্য ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি। সৌদি আরব থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফিনল্যান্ড সফরে যাওয়ার আলোচনা চলছে। সে েেত্র ঈদের পর তিনি দেশে ফিরবেন।