প্রতিবেদন

ভারতের নতুন সরকারের সামনে ১০ চ্যালেঞ্জ

মো. মোস্তাফিজুর রহমান
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের নিরঙ্কুশ জয়কে দেশের জয় বলে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশকে আরো শক্তপোক্ত করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। টুইটে নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সবকা সাথ + সবকা বিকাশ + সবকা বিশ্বাস = বিজয়ী ভারত। একসাথে আমরা বেড়ে উঠব। একসাথে উন্নতি করব। একসাথে আমরা দৃঢ় ভারত গড়ে তুলব। ভারত ফের জিতল। # বিজয়ভারত।’
প্রাথমিক ভোট গণনাতে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী জোটকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে ৩৪৫টিরও বেশি আসনে এগিয়ে আছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট। এই জয় উদযাপনে ২০ হাজার নেতাকর্মীকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এতো উৎসব-উদযাপনের মধ্যেও মোদির সামনে চোখ রাঙ্গাচ্ছে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই হয়ত চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই দ্বিতীয় দফায় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বসে গেছেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় মোদিকে প্রধান যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সেগুলো হলো:

অর্থনীতি
২০০২ সালের মার্চে সমাপ্ত অর্থবছরে ভারতের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত ছিল। তারপর দ্রুত রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেড়ে যায়। এর মধ্যে তেল কিনতেই অনেক অর্থ বেরিয়ে যায়, যা দেশটির জিডিপির দুই শতাংশেরও বেশি। আর্থিক সংস্থার ঋণখেলাপি বিশেষত আইএলঅ্যান্ড এফএস যেভাবে ঋণ মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে ভারতের আর্থিক বাজারে। এসবের প্রভাব মিউচুয়াল ফান্ড ও ঋণের বাজারেও পড়ছে। ঘাটতি কমাতে নিত্যপণ্যের ওপর ভর্তুকি নিয়েও সরকারকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতিসহ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব নীতিতে পরিবর্তন আনতে চাইলে মোদি সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে।
দারিদ্র্য
চ্যালেঞ্জ আছে দারিদ্র্য দূরীকরণে। বিজেপির পিএম-কিষাণ কর্মসূচিতে দরিদ্র কৃষকদের অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার রুপি জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে ৭২ হাজার রুপি দেয়ার। যদিও এই কর্মসূচিতে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবে উভয় দলই স্বীকার করে যে, ভারত একটি গভীরভাবে দরিদ্র দেশ।

কৃষকদের ক্ষোভ
দেশটির কৃষকদের ক্ষোভ রয়েছে ব্যাপকভাবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দরিদ্র শ্রেণির ভোটের ওপর ভর করেই বড় জয় পেয়েছিলেন মোদি। এবারেও নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু তার শাসনামলেই আলু-পিঁয়াজের বাজারে ধস নামে। গত বছর কৃষকরা প্রতি কেজি পিঁয়াজ এক রুপিরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন লাখো কৃষক। দ্বিতীয় দফায় কৃষকদের এই ক্ষোভ দূর করতে না পারলে ২০২৪ এর নির্বাচনে মোদির জন্য বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

পানি সমস্যা
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি শিল্প বিস্ফোরণের ফলে দেশটিতে বিশুদ্ধ খাবার পানির গুরুতর সংকট দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে অনিরাপদ পানির কারণে প্রতি বছর ২ লাখ মানুষ মারা যায়। ২০২০ সাল নাগাদ ২১টি প্রধান শহরে ভূগর্ভস্থ পানির অভাব দেখা দেবে। দেশটির ৭৫ ভাগ বাড়িতে খাবার পানির ব্যবস্থা নেই এবং ৭০ ভাগ পানি দূষিত। নির্বাচনি ইশতেহারে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিনকে দিন এই পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা
ভারতের সার্বজনীন নীতিমালা হলো স্বাস্থ্যসেবা চাহিদাগুলো কিভাবে বাড়ানো যায়। ক্ষমতায় এসে বিজেপি সরকার আয়েশমান ভারত নামে একটি বীমাভিত্তিক পরিকল্পনা করে স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করেছিল। কংগ্রেসও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতিতে আরো অর্থ ব্যয় ও দক্ষ উপায় বের করতে হবে।

শিক্ষা ও বেকারত্ব
আগামী দশকে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের বিশাল অংশ। তারা তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ প্রশিক্ষণ পাবে না এবং সরকার চাকরির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হবে। ভারতে বেকারত্বের হার রেকর্ড ছুঁয়েছে। পরিসংখ্যান কমিশনের (এনএসসি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেকারত্বের হার ছিল গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদি। অথচ তার আমলেই বেকারত্ব রেকর্ড ছোঁয়ায় তরুণ সমাজে ক্ষোভ রয়েছে। দেশের ৬৫ শতাংশ নাগরিকের বয়সই ৩৫ এর নিচে। দ্বিতীয় দফায় বেকারত্ব দূর করা মোদির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ধর্মীয় ও বর্ণবৈষম্য
মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতজুড়ে ধর্মীয় ও দলীয় বৈষম্য যেকোনো সময়ের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। আর এবার নির্বাচনকে ঘিরে গোটা ভারত বলতে গেলে দু’ভাগ হয়ে গেছে। রাজনীতিকরা মোদির বিরুদ্ধে একজোট হয়েছেন। সারাদেশে এই হিংসাত্মক রাজনীতি এবং ধর্মীয় ও বর্ণ বৈষম্যের কারণে অনেক মানুষ মারাও গেছে। দেশকে স্থিতিশীল রাখতে হলে এই বৈষম্য মেটানো মোদির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লিঙ্গ বৈষম্য
লিঙ্গ বৈষম্য ভারতে বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি দেশটির লিঙ্গবৈষম্যের ভয়ানক চিত্র তুলে ধরেছে। আগামীতে এই আন্দোলন সরকারকে আরো চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলতে পারে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
যেকোনো সরকারপ্রধানের জন্যই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখাটা এক বড় চ্যালেঞ্জ। মোদি প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে শক্তিশালী প্রায় সব দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করেছিলেন। চীনের সাথেও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে সমস্যার মিটমাট করেছেন তিনি। কিন্তু এই ধারাটা অব্যাহত রাখাই তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধসহ অন্যান্য সমস্যাও তাকে সমাধান করতে হবে। তাছাড়া পুলওয়ামা ইস্যু নিয়ে মাস দুয়েক আগেই আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এখনও দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে আছে। এই সমস্যা কিভাবে মেটানো যায় সেটাও দেখতে হবে মোদিকে।

কাশ্মির
ভারতের রাজনীতিতে কাশ্মির সবসময়ই এক বড় ইস্যু। বলা হয়, দশকের পর দশক ধরে কাশ্মিরে হানাহানির একটাই কারণ তা হলো ক্ষমতাসীন দলগুলো কাশ্মিরকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে জয় পেতে চায়। কাশ্মিরে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে পাকিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতি থেকেই ফায়দা তুলতে চায় দলগুলো। এবারও যেমন পুলওয়ামা হামলাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের ওপর একের পর তোপ দেগেছেন মোদি। এটা নিশ্চিতভাবেই তাকে বড় জয় এনে দিয়েছে। কিন্তু কিছু দিন পরপরই যে কাশ্মির উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সন্ত্রাসবাদের প্রবেশপথ হয়ে দাঁড়ায়, এটা ভারতের ক্ষমতাসীনদের জন্য এক বড় মাথাব্যথারও কারণ। মোদি এবারের মেয়াদে কাশ্মিরকে স্থিতিশীল করতে পারেন কি না সেটাই দেখার বিষয়।