প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন-অগ্রগতির অভূতপূর্ব ছোঁয়া

সাবিনা ইয়াছমিন
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এদেশে অনেকবারই অনেক দল ক্ষমতায় এসেছে। তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি অন্য কোনো দল ও সরকার। কেবল প্রতিশ্রুতি দেয়া আর রক্ষা নয়, উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণে, যাকে বলে উন্নয়নের ‘ভিশন’ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করেছে অনন্য এক উদাহরণ। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার ২০৪১-কে লক্ষ্য ধরে এগিয়ে চলেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ যখন তার রূপকল্প ২০৪১ সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি ও প্রকাশ করে তখন অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনি ইশতেহার সাজায় প্রথাগত, গৎবাঁধা মুখস্ত কথামালার দলিল হিসেবে। দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল সড়কপথ, রেলপথ, বিমানপথ ও জলপথ যোগাযোগের েেত্র একটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি (রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১) সামনে রেখে তা বাস্তবায়নের ল্েয কাজ করছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় থাকায় সরকারের গৃহীত অনেক উন্নয়ন প্রকল্পই ইতোমেধ্যে আলোর মুখ দেখেছে এবং বড় বড় অনেক প্রকল্পই দৃশ্যমান হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের সুফলও দেশবাসী পেতে শুরু করেছে।
সড়কপথ, রেলপথ ও বিমানপথের সাফল্য ও অর্জনগুলো সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, নিজস্ব অর্থায়নে দেশের বৃহত্তম পদ্মা বহুমুখী সেতুর কথা। এরই মধ্যে এ সেতুর ৬২ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ মে দৃশ্যমান হয়েছে সেতুটির দুই কিলোমিটার। এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে তা দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিনের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক পদ্মাসেতু দণি বঙ্গের মানুষের জীবনধারাই শুধু পাল্টাবে না, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করবে।
জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক ৪ হাজার ৩৩১ কিলোমিটার সড়ক মজবুতকরণসহ ৫ হাজার ১৭১ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্ত এবং ৪ হাজার ৮৬৯ কিলোমিটার মহাসড়ক কার্পেটিং ও সিলকোট, ১ হাজার ৮৯২ কিলোমিটার ডিবিএসটি এবং ৮ হাজার ১৫৮ কিলোমিটার ওভারলে করা হয়েছে। ৪১৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা মহানগরীর যানজট সমস্যা নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) হতে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে, যার স্টেশন থাকবে ১৬টি এবং প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন সমতা থাকবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ৭০৩ দশমিক ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে র‌্যাম্পসহ প্রায় ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ৯৩৫ দশমিক ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে গাজীপুর হতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত মোট ২০ কিলোমিটার বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।
এছাড়া নির্বাচনি ইশতেহার অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে রয়েছে, চীন সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি প্রকল্পও সরকার সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে। গত ১০ বছরে ৩৩০ হাজার ১৫ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ, ৯১টি স্টেশন বিল্ডিং, ২৪৮ হাজার ৫০ কিলোমিটার মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, নতুন ৭৯টি রেলস্টেশন নির্মাণ এবং ২৯৫টি রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। রেলওয়ের পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ৩০ বছর মেয়াদি একটি মাস্টার প্ল্যান অনুমোদিত হয়েছে। ৪৩০টি যাত্রীবাহী কোচ পুনর্বাসন শেষে রেলওয়ের বহরে সংযুক্ত করা হয়েছে। লালমনিরহাট হতে বুড়িমারি, কালুখালী থেকে ভাটিয়াপাড়া ও পাঁচুরিয়া থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত বন্দর রেল সেকশন পুনঃচালু করা হয়েছে।
এছাড়াও স্থানীয় সরকারের আওতায় ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫২ হাজার ২৮০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ৭৫ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ৩১ হাজার ৬৩৭ মিটার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ এবং ৩ লাখ ১ হাজার ৩৪১ মিটার কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ১০টি নতুন বিমান ক্রয় করা হয়েছে এবং আরও ৫টি কেনার চুক্তি হয়েছে।
আগামীদিনের ল্য ও পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ১৬ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯ হাজার ২৪ কিলোমিটার বিস্তৃত ঢাকা পূর্ব-পশ্চিম এলিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণ করা হবে। ঢাকাকে ঘিরে একটি এলিভেটেড রিংরোড এবং ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণেরও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং এক্সপ্রেস রেলওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে যাতে চট্টগ্রামে পৌঁছানো যায় সেজন্য বুলেট ট্রেন (দ্রুতগামী ট্রেন) চালু করা হবে। ক্রমে বুলেট ট্রেন সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা এবং কলকাতা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে।
রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকে উন্নত করা হবে। শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করা হবে সুপিরিয়র বিমান অবতরণে সম দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর। বাগেরহাটে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। ইতোমধ্যে ‘নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার সর্বাত্মক পদপে গ্রহণ করা হবে। আগামীতে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন ধারা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে এটাকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করা হবে।
কেবল সড়ক উন্নয়নই নয়, নিরাপদ সড়কের জন্য লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ট্রাফিকব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ফিটনেসবিহীন গাড়িকে পারমিট না দেয়া, চালকদের লাইসেন্স প্রদানে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ, সড়ক ও মহাসড়কগুলোকে ক্রমে সিসিটিভি-র আওতায় আনা এবং জনসাধারণকে সচেতন করার প্রকল্পও সরকার হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিমান পরিবহনকে আরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। স্বল্প খরচে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের েেত্র রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার জনপরিবহন সমস্যার সমাধান ও যানজটমুক্ত করার ল্েয পাতাল রেল, মেট্রোরেল অথবা সার্কুলার রেলপথ এবং রাজধানীতে নাব্য ও প্রশস্ত নৌপথ নির্মাণেরও চেষ্টা চলছে।
এছাড়া সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে উন্নত করে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। সীমান্তবর্তী ভারতের ৭টি রাজ্য এবং নেপাল ও ভুটান যাতে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে সে ল্েয কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। উপরন্তু ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক জোটের যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নৌপথ ও বন্দর উন্নয়নেও সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। একসময় বাংলাদেশের যোগাযোগের ৮৫ শতাংশ হতো নৌপথে। দেশে সর্বমোট প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে, যার মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটার পরিবহন কাজে ব্যবহার করা হয়, তাও শুষ্ক মৌসুমে অর্ধেকে নেমে আসে। অভ্যন্তরীণ নৌপথের পুনরুদ্ধার ও সর্বোচ্চ ব্যবহার আবশ্যক। ইতোমধ্যে ২০০৯-১৫ সময়ে খনন করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নৌপথ। সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩টি নৌপথে খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ২৭০ কিলোমিটার নৌপথ এবং প্রায় ৩ হাজার একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। মোংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথ খনন করে সুন্দরবন রার্থে নৌ-সংযোগ চালু করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে লাভ হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মোংলা বন্দরে ১১ দশমিক ৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল।
চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর দুটিকে আধুনিকায়ন এবং পটুয়াখালীতে পায়রা সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা হচ্ছে। ব্যাপক খননের পরিকল্পনা নিয়ে আগামীতে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের সাথে অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর সংযোগ স্থাপন করার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি সুগম করা হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাণিজ্যকে সহজতর করার ল্েয ভারতের সঙ্গে নৌপথ বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে একে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে বন্দরের সমতা ৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ঢাকার চারপাশের ৪টি নদী এবং খালগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত করে খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদীতীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এদিকে গত ২৫ মে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে ৮টি সেতু ফাইওভার ও আন্ডারপাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব নতুন স্থাপনা ব্যবহারের জন্য খুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন হওয়া প্রকল্পগুলোকে দেশবাসীর জন্য ঈদ উপহার বলে মন্তব্য করেন। বলেন, ৩টি সেতু, সড়ক, আন্ডারপাস ও ওভার ব্রিজসহ যা কিছু উদ্বোধন করলাম তা দেশবাসীর জন্য ঈদ উপহার। এসব উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে।
২৫ মে সকালে দীর্ঘ প্রতীার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্বিতীয় মেঘনা সেতু এবং দ্বিতীয় গোমতী সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান।
কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা, গোমতী সেতু নির্মাণ প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো. নুরুজ্জামান জানান, নবনির্মিত কাঁচপুর ব্রিজ ইতোমধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। নতুন দু’টি সেতু চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিশেষ করে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা কিছুটা হলেও আরামদায়ক হবে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ১৬ মার্চ শীতল্যা নদীর ওপর দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতুর উদ্বোধন করেন। নুরুজ্জামান জানান, জাপানি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওবায়সি করপোরেশন, শিমঝু করপোরেশন, জেএফএফ করপোরেশন ও আইএইচআই ইনফ্রা সিস্টেমস কোম্পানি লিমিটেড ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতীর সঙ্গে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতুর কাজ শুরু করে।
জানা গেছে, এই ৩টি সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের জাইকা ৬ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পে প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনায় ১ হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে এবং ২০১৯ সালের জুনে কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে।
৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৪শ’ মিটার দীর্ঘ নতুন কাঁচপুর সেতু নির্মাণকাজ ২০১৭ সালে শেষ হয়। নতুন কাঁচপুর সেতু পুরাতনটির চেয়ে প্রস্থে ২ মিটার বেশি। কর্তৃপ ইতোমধ্যেই পুরনো সেতুর সংস্কার কাজ শুরু করেছে।
নুরুজ্জামান বলেন, যথাক্রমে ১ হাজার ৭৫০ কোটি ও ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ৯৩০ মিটার মেঘনা ও ১ হাজার ৪১০ মিটার গোমতী সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। জনসাধারণের ঈদযাত্রার সুবিধার্থে ৩১ মে কাঁচপুর সেতুর পূর্বাংশের ওভারপাসও খুলে দেয়া হবে।
দ্বিতীয় মেঘনা সেতু এবং দ্বিতীয় গোমতী সেতু ছাড়াও কোনাবাড়ি ও চন্দ্রা ফাইওভার, কালিয়াকৈর, দেওহাটা, মির্জাপুর ও ঘারিন্দা আন্ডারপাস এবং কাড্ডা-১, সাসেক সংযোগ সড়ক প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়কে বিমাইল সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ নামের আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন করেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গোমতী নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সেতু, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সেতু খুলে দেয়ায় এই মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ। আসন্ন ঈদ যাত্রাও হবে স্বস্তিদায়ক। একইভাবে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের যাত্রা নির্বিঘœ করবে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুটি ফাইওভার ও চারটি আন্ডারপাস। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ ২৬টি জেলার ৯০টি রুটের বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল নির্বিঘœ করতে ২০১৩ সালে দুই লেনের এই মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পে দুটি সার্ভিস লেন, ২৯টি নতুন ব্রিজ, চারটি ফাইওভার ও ১৪টি আন্ডারপাস সংযুক্ত রয়েছে। মহাসড়কে ধেরুয়া এলাকার ফাইওভার ও সেতুগুলোর কাজ শেষে গত বছর খুলে দেয়া হয়।
এদিকে পঞ্চগড়-ঢাকা রেলপথে যুক্ত হলো স্বল্প বিরতির পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। দেশের দীর্ঘতম রেল রুটে দ্রুতগতির আধুনিক সুবিধাসংবলিত এই ট্রেন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক খন্দকার শহিদুল ইসলাম বলেন, ২৫ মে সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ট্রেনটি উদ্বোধন করেন। এসময় পঞ্চগড় প্রান্তে স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনসহ রেল ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে রেলপথমন্ত্রী পঞ্চগড় এক্সপ্রেসে করেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
ঢাকা-পঞ্চগড় রেলপথে প্রথমবারের মতো দ্রুতগতির পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ৫৯৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে ১০ ঘণ্টায়। ট্রেনটি প্রতিদিন দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গিয়ে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছবে। আবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে পরদিন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে এটি পঞ্চগড়ে পৌঁছবে। যাত্রাপথে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পার্বতীপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনটি থামবে।

শেষ কথা
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ঈদের আগে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক এসব প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্যে কেবল দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের চিত্রেরই প্রমাণ মিললো না, এর মাধ্যমে দেশবাসীকে বর্তমান সরকার আরও বড় স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি তা বাস্তবায়িত করার দৃঢ় প্রত্যয় নতুন করে ঘোষণা করলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে দেয়া ইশতেহারের স্বপ্নও যে সামনে সত্য হবে Ñ তা বর্তমান বাস্তবতা দেখেই দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পারছেন।