প্রতিবেদন

ভেজাল পণ্যের বিক্রি বন্ধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সময়ের দাবি

সাদেক মাহাবুব চৌধুরী
ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত দৃশ্যত অনেকটাই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে অবিলম্বে অপসারণ করে দ্রুত তা ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়ার এক সপ্তাহ না যেতেই অপ্রকাশিত আরও ৯৩টি পণ্যের মান প্রকাশ করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। মোট ৪০৬টি পণ্যের মধ্যে ৩১৩টির পরীার ফল প্রকাশ করলেও বাকি ৯৩টির প্রকাশ না করার পরিপ্রেেিত ২৩ মে এমন আদেশ দেন আদালত। আগামী ১৬ জুন আদালত প্রতিবেদন দেখে পরবর্তী নির্দেশনা দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রিটের পে ২৩ মে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপরে পে আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম আর বিএসটিআই’র পে ছিলেন আইনজীবী এম আর হাসান এবং রাষ্ট্রপে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। শুনানিকালে কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) পরে নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদের একটি আবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। আবেদনে বলা হয়, ৪০৬টি পণ্য থেকে ৩১৩টির পরীার ফলাফল গত ২ মে প্রকাশ করে বিএসটিআই। কিন্তু এখনও তারা অবশিষ্ট ৯৩টি পণ্যের মান নিয়ে করা পরীার ফল প্রকাশ করেনি। তাই এই ফল প্রকাশ করার জন্য আদালতে হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এরপর অপ্রকাশিত ৯৩ পণ্য পরীার ফল আদালতে দাখিলের সময় বেঁধে দেয় আদালত।
এর আগে গত ১২ মে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীায় প্রমাণিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে দ্রুত প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদপ্তরকে এ নির্দেশ পালন করে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলে আদালত। পাশাপাশি পণ্যগুলোর বিষয়ে যথাযথ আইন অনুসারে তা নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ভেজাল পণ্যের মানোন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত তা উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু আদালতের সে আদেশ সঠিকভাবে প্রতিপালন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপরে চেয়ারম্যানকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করে হাইকোর্ট।
ভেজাল পণ্যের বিক্রি বন্ধে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে রহস্যজনক আচরণ করছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ ও বিএসটিআই। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ ও বিএসটিআই। অথচ আদালতের নির্দেশনার সুস্পষ্ট বাস্তবায়নই দেখতে চায় মানুষ, এটাই এখন সময়ের দাবি।
হাইকোর্ট বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে অবিলম্বে অপসারণ করে দ্রুত ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেও ওই পণ্যগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কার্যত অবহেলাই দেখিয়ে চলছেন।
সচেতন ভোক্তারা বলেন, চিহ্নিত ৫২টি ভেজাল পণ্যের বাইরেও হয়ত আরও কয়েক শ’ ভেজাল খাদ্য পণ্য আছে, যা আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে। সেগুলোকেও যথাযথ প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করে বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, খাদ্য মানের এই পরীক্ষা শুধু রোজার মাসে নয়, সারা বছরই এ অভিযান থাকা উচিত।
খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে এই দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের হলেও জনস্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টি হস্তক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে হাইকোর্ট। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে আরও বলেছে, খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া এ সমস্যা উত্তরণের জন্য প্রতিটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ দরকার।
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হূমায়ুন জানান, বিএসটিআই রোজার আগে বাজার থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫২টি নিম্নমানের পণ্য চিহ্নিত করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিএসটিআই কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে এবং অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। এরপর এসব খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার, জব্দ, উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে ৮ মে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটি (সিসিএস) পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এই রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে মানহীন খাদ্যপণ্যের তালিকা দেখে বিচারক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো কোম্পানি দেখি বাদ নাই।’ এসব পণ্যের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জানাতে আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দু’জন কর্মকর্তাকে তলব করে। কর্মকর্তারা হাজির হওয়ার পর রুলসহ আদেশ দেয় হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের আদেশের পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যৌথভাবে বাজার মনিটরিং করার চেষ্টা করছে। খুচরা বাজারে নিষিদ্ধ ৫২টি পণ্য পাওয়া গেলে তারা ব্যবসায়ীদের সতর্ক করছে। যদিও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ৫২টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বাজারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো তাদের ভেজাল পণ্যগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে এখনও গছিয়ে দিয়ে আসছে ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা তা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর কোম্পানিগুলো আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে বাজারে খাদ্যপণ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে র‌্যাব-পুলিশ এবং বিএসটিআই ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি টিম। এতে করেও বাংলাদেশ খাদ্যপণ্যে ভেজালমুক্ত হতে পারছে না। অনেকে বলছেন, ভেজালকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করলে হয়ত খাদ্যপণ্য ভেজালমুক্ত হবে। তবে শাস্তিটা নিশ্চিত করা জরুরি এবং দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মানুষ ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য খেতে চায়। তাই তারা মনে করে, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করতে আদালতের নির্দেশনার দ্রুত বাস্তবায়ন করা, যা এখন সময়ের দাবি।