প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

যথাযোগ্য মর্যাদায় ৩৯তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত : শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কারণে উন্নত দেশের পথে বাংলাদেশ

তারেক জোয়ারদার : ১৭ মে ১৯৮১ – দিনটি ছিল রোববার। ছিল বৃষ্টিঝরা দিন। ৩৮ বছর আগের সেই দিনটিতে ভোর থেকেই ঝরছিল আকাশ চিরে মেঘভাঙা বৃষ্টি। বৃষ্টি মাথায় লাখো মানুষের কলকোলাহলে মুখরিত বিমানবন্দরের চত্বরে বিমান থেকে নেমে দাঁড়ালেন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালো রাতে বাবা-মা-ভাই হারা একটি মেয়ে – নাম যার শেখ হাসিনা। এক চোখে তার কান্নার জল, আরেক চোখে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তুমুল করতালি আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্যে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘আমি নেতা নই। সাধারণ মেয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী। বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য প্রয়োজন হলে এই সংগ্রামে পিতার মতো আমিও জীবনদান করতে প্রস্তুত।’ জটিল-কুটিল-সংঘাতময় বাংলাদেশের জনগণ তখন বঙ্গবন্ধুর শূন্য স্থানে পরম নির্ভরতা আর ভালোবাসায় শেখ হাসিনাকে বসালেন নেতৃত্বের আসনে। আর শুরু হলো এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম।
দীর্ঘ নির্বাসন থেকে শত বাধার প্রাচীর ভেঙে শেখ হাসিনা এমন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন, যেখানে বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের জাঁতাকলে ঘাতকদের বিচার বন্ধ। ১৫ আগস্টের ঘাতকরা পুরস্কৃত আর শাসনমতার গদিতে সমাসীন, জাতীয় পতাকাশোভিত সরকারি গাড়িতে বসে স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালন, দেশের ইতিহাস বিকৃত, লালবাতি গণতন্ত্রের ঘরে, স্বাধীনতার স্বপ শক্তিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডামাঢোল, জাতি সুনেতৃত্বশূন্য, অর্থনীতি প্রায় বিধ্বস্ত। এমন জরাজীর্ণ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন আবেগময়ী, সংবেদনশীল, দেশপ্রেমী অকুতোভয় শেখ হাসিনা, যার অপোয় ছিলেন বারো কোটি বাঙালি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, যার মনের কোণে তখনও গ্রামের সরলতা আর হৃদয়ে শ্যামল বাংলাদেশ, তিনি কি আর বসে থাকতে পারেন সেনাকুঞ্জের শাসকদের মতো আয়েশী ভঙ্গিতে আরাম কেদারায়? দেশে ফিরেই তাই তিনি নেমে পড়েন তার আসল কাজে Ñ রাষ্ট্রকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত থেকে বাঁচাতে, দেশকে উন্নয়নশীল-উন্নত দেশে পরিণত করার লড়াইয়ে।
দেশের মাটিতে পা রেখে যে অঙ্গীকার শেখ হাসিনা করেছিলেন, তিনি তা একে একে রা করে চলেছেন। তার ৩৮ বছরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিকড় প্রোথিত হয়েছে সাধারণ জনমানুষের হৃদয়ের গভীরে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিও অল্প সময়ে অর্জন করে নিয়েছে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশে।
দল ও দেশ পরিচালনায় শেখ হাসিনার অর্জন অনেক। এমনকি আন্তর্জাতিক পরিম-লেও শেখ হাসিনার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। নিচে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরা হলো:
এক
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে যেটি সামনে চলে আসে, তা হলো মহাকাশে বাংলাদেশের অবস্থান। ১ বছর আগেই ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে নিজেদের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফলভাবে উৎপেণ করে বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শেখ হাসিনার এই অর্জন বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল মাইলফলক হয়েই থাকবে না, একসময় যারা আমাদের তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অবজ্ঞা করেছিল, তাদের প্রতিও এটি জবাব হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া তার দিকনির্দেশনায় বেশ কয়টি েেত্র অপ্রত্যাশিত বিশ্বজয় ধরা দিয়েছে। এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী জামদানির বুননপদ্ধতি, বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং সর্বশেষে বিশ্ব নির্বস্তুক ঐতিহ্যের তালিকায় বাংলাদেশের শীতলপাটির বয়নপদ্ধতি। এর অনেক আগে তো একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য আদায় করেছেন জাতিসংঘের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এতসব অনন্য অসাধারণ অর্জন সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতিকে দিয়েছে কয়েক ধাপ এগিয়ে।
দুই
খাদ্যের পর বিদ্যুৎ উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের প্রথম দিকে যেখানে মাত্র ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হতো ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, সেখানে বর্তমানে ১১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১৬,০০০ মেগাওয়াটের বেশি। ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪,০০০ মেগাওয়াট। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনা করেছিলেন মতায় আরোহণের সময়, তিনি তা পূরণ করে দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্বের ভিশন আর সৎ সাহস আর দৃঢ়তা থাকলে অবশ্যই উন্নয়নের দিশা পাওয়া যায়।
তিন
বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী ছিল যে মঙ্গা, আশ্বিন-কার্তিকের ভয়াবহ খাদ্যসংকট, তা এখন জাদুঘরে। খাদ্যে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে অর্জন করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এটা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের বেশকিছু সাহসী সিদ্ধান্তের কারণে। যেমন বিশ্বে মোড়লি স্থানে অবস্থানকারী দাতাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে সারের দাম কমানো, ভর্তুকি দেয়া, গ্রামে গ্রামে কৃষির জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সরকারি প্রণোদনার কারণে কৃষিতে নতুন নতুন উদ্ভাবন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ, অভাবী জনপদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৃষিেেত্র মজুরি বৃদ্ধি, কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া ইত্যাদি।
চার
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নেয়ার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিল সেই খুনিদের নিয়মিত আদালতে বিচারের মাধমে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন তিনি। বিদেশে পলাতক সাজাপ্রাপ্ত অন্য খুনিদেরও দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। ’৭১-পরবর্তী পশ্চিমাদের অবহেলা আর অবজ্ঞার বুলি ‘বাংলাদেশ ইজ এ বটমলেস বাসকেট’ আজ বহির্বিশ্বে দৃষ্টান্ত গড়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নজরকাড়া উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকার কারণে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। আইনের শাসন, মানবসম্পদের দতা বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন, নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, জঙ্গিদের নির্মূল করা, নারীর মতায়ন, ইন্টারনেটসহ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন, সমুদ্রজয়ের মাধ্যমে বিশাল সীমানা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, যুগোপযোগী শিানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা অর্জন, উচ্চশিায় নারীদের ভর্তির হার প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীতকরণ, মেয়ে শিার্থীদের মাসিক উপবৃত্তি, শিাবর্ষের প্রথমদিনেই ৩৬ কোটি পাঠ্যবই বিতরণ, মাদ্রাসাসহ সব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা, কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি, এমডিজি সাফল্য বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা আজ নজর কেড়েছে সমালোচকদেরও। এত দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারেনি বিশ্বের অন্য কোনো দেশ। ফলে পুরো বিশ্বই আজ বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
পাঁচ
মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা থাকলে প্রত্যাশা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করবে।
ছয়
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি সর্বজনগ্রাহ্য যুগোপযোগী শিানীতি পেয়েছে, যার বাস্তবায়ন দেশে অসাম্প্রদায়িক শিাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে সর্বপ্রথম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিার পথ সুগম করেছে। ফলে শিাব্যবস্থায় ব্যাপক সংখ্যাগত ও গুণগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা অর্জন, উচ্চশিায় নারীদের ভর্তির হার প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীতকরণ, মেয়ে শিার্থীদের মাসিক উপবৃত্তি প্রদান, শতাধিক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের মাধ্যমে উচ্চশিার ব্যাপক সম্প্রসারণ Ñ এসব তারই যোগ্য নেতৃত্বের ফসল। শিাবর্ষের প্রথমদিনেই প্রায় ৩৬ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে সারাদেশে পৌঁছে দিয়ে বিরল নজির সৃষ্টি একমাত্র বাংলাদেশের পে সম্ভব হয়েছে তারই দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে।
সাত
শেখ হাসিনার আপসহীন মনোভাব ও নির্দেশনার ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পে-স্কেলে আমূল পরিবর্তন এনে ইনসেন্টিভ প্রদান, রাজনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রত্যেক সেক্টরে তথ্য ও প্রযুক্তির ছোঁয়া, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ, সবই তার সাহসী পদপে। তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে মতাসীন হয়েও মতায় নির্মোহ। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব পরিম-লে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আট
২০১৭ সালে তিনি তার সততার জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন বিশ্বে তৃতীয় স্থানে অবস্থানকারী সৎ নেতা হিসেবে। মিয়ানমার থেকে ১০ লাধিক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মায়ের মমতা দিয়ে আশ্রয় দেয়ায় বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়ে আখ্যা পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও সহযোগিতা আদায় করেছেন।
তার হাত ধরেই বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থার বিস্ময়কর ও ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে Ñ এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রচুর সম্ভাবনাময় এ দেশটি আগামী ১২ বছরে ২৮তম বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে পারে যদি বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিযোগিতার সমতা বৃদ্ধি করা যায়, বাংলাদেশের পর্যাপ্ত ব্র্যান্ডিং করা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে সুপ্ত সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং সর্বোপরি জনগণের মধ্যে স্বস্তির আবহ বজায় রাখা যায়।
তাই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন সঠিক মাস্টারপ্ল্যান এবং সরকারের ধারাবাহিকতা, যাতে বর্তমান বিশ্বের প্রোপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ল্েয জ্ঞাননির্ভর প্রশাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। একটি নিম্ন আয়ের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে প্রয়োজন উন্নয়ন-উপযোগী নেতৃত্ব। বাংলাদেশে এ রকম নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। ফলে উন্নয়নের মহাসড়কে চলার গতি বেড়েছে, বাড়তে থাকবে ততদিন, যতদিন তিনি থাকবেন সরকার ও দলের নেতৃত্বে।

‘মানুষের মর্যাদা ুণœ হয়, দেশের ভাবমূর্তি ুণœ হয় ৩৮ বছরে এমন কাজ করিনি’
নিজের ৩৮তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে গত ১৭ মে সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, পঁচাত্তরের পর দল পরিচালনার এত বড় দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে Ñ এটা কখনও আমি ভাবিনি, চাইওনি। এটা চিন্তাতেও ছিল না।
শুভেচ্ছা জানাতে আসা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, মূলত দেশের জন্য কাজ করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে দেশে ফিরেছিলাম। এজন্যই দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছি। কেননা গণতান্ত্রিক ধারা ছাড়া দেশের আর্থসামাজিক উন্নতি সম্ভব নয়।
এ সময় তিনি আরও বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এই দেশটা যেন আবারও স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের হাতে না যায়, কেউ যেন দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি থাকতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা বারবার চেয়েছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে, তারা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ কিন্তু আওয়ামী লীগের মতোই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আজ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এক নম্বর রাজনৈতিক দল। এই দল মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে। সেই আস্থা ও বিশ্বাস আমরা দেখতে পেয়েছি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে। নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে প্রথমবার ভোটার হওয়া তরুণরা সবাই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের আস্থা, বিশ্বাস ও সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এর কারণ হলো আমরা যে মতায় থেকে মানুষের জন্য কাজ করেছি, মানুষের জন্য প্ল্যান করেছি, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য যে কাজগুলো করেছি, সেটা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে। এটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করা। নইলে মতায় থাকলে সাধারণত মানুষের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। কিন্তু আমরা মতায় এসে মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি বলেই মানুষের ভোট আমরা পেয়েছি। জনপ্রিয়তা ও সমর্থন দুটোই বেড়েছে।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে যখন ফিরেছিলাম (১৯৮১ সালের ১৭ মে), সেদিন আকাশ মেঘেঢাকা ছিল। প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। ফাইটটি বাংলার মাটি ছুঁয়েছে, ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ওই সময় ঝড়-বৃষ্টি উপো করে হাজার হাজার মানুষ এসেছিল। এয়ারপোর্ট থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত এত মানুষের ঢল যে এইটুকু পথ আসতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগে গিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার নির্মম ঘটনার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে, জুলাই মাসের ৩০ তারিখে ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে আমি জার্মানিতে গিয়েছিলাম। রেহানা পরীার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কলেজে গেলাম। সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম, কামাল, জামাল, রাসেল। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় শুনলাম, আমাদের কেউ নেই, আমরা নিঃস্ব। আমাদের দেশে আসতে দেয়া হলো না।
দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই ফিরে এসেছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে আসব। আমি জানি না কী করব, কোথায় থাকব, কই যাব। অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি। তবু সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আসতেই হবে।
বঙ্গবন্ধুই আমার রাজনৈতিক আদর্শ ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতির কাজ করে যেতাম আব্বার আদর্শ নিয়ে। তিনি দেশের জন্য কাজ করেছেন। বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। আমরা কখনও টানা দুই বছরও আব্বাকে জেলের বাইরে পাইনি। এ নিয়ে আমাদের কোন হা-হুতাশ ছিল না। আমার মা খুব চিন্তাশীল ছিলেন, তিনি বাসাও দেখতেন, বাইরেও দেখতেন। সাংসারিক কোনো ঝামেলা তিনি আব্বাকে দিতে চাইতেন না। আমাদের দাদা-দাদি, চাচারা পারস্পরিক সহযোগিতা করতেন। কাজেই এমন একটি পরিবেশ থেকে আমরা উঠে এসেছি, যে মাথাতেই ছিল দেশের জন্য কিছু একটা করে যেতে হবে।
দেশে ফেরার পরের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পর থেকেই পদে পদে বাধা। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না, তারাই তখন মতায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ১৯টি ক্যু হয়েছিল। এক সামরিক শাসকের মৃত্যুর পর আরেক সামরিক শাসক এলো। আমরা আওয়ামী লীগ কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য একটার পর একটা সংগ্রাম করেই গেছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক ধারা আর ব্যবস্থা ছাড়া দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব না।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় ছাড়াও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তা সত্ত্বেও দলকে টিকিয়ে রাখতে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ঠিক যেভাবে গড়ে উঠেছিল, ঠিক সেভাবেই আজ বাংলাদেশের এক নম্বর পলিটিক্যাল পার্টি। যেভাবে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস আমরা অর্জন করেছি তা আমরা দেখতে পাই এবারের নির্বাচনে। আজ বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে।